kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

লালবাগের হাম্মামখানা

৩০০ বছরের পুরনো রূপ ফিরছে

রিদওয়ান আক্রাম   

১ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



৩০০ বছরের পুরনো রূপ ফিরছে

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লার হাম্মামখানা ভবনটির সংস্কারকাজ করছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। সম্প্রতি তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

১৬৮০-৮৮ সময়কালের কোনো এক দুপুর। সূর্য মধ্য গগনে। আওরঙ্গাবাদ দুর্গের (লালবাগ কেল্লা) ভেতরে ভাপসা গরমে বেশ হাঁপিয়ে উঠেছেন বাংলার মোগল সুবাদার (গভর্নর) শায়েস্তা খাঁ। ভাবলেন, গোসলটা সেরে নিলে হয়তো একটু স্বস্তি পাবেন।

বিজ্ঞাপন

নিজের তাঁবু থেকে বের হয়ে পা বাড়ালেন হাম্মামখানার দিকে। বাইরে প্রখর রোদ হলেও হাম্মামের মোটা দেয়াল ভেদ করে গরম প্রবেশ করতে পারেনি।  

বাড়তি পোশাক ঝেড়ে ফেলে সুবাদার হাজির হলেন ‘স্টিম বাথের’ জন্য। হাম্মামের ছোট ছোট চুল্লিতে গরম পানি এরই মধ্যে ফুটতে শুরু করেছে। বাষ্পে ভরে গেছে কক্ষ।

শরীর থেকে বেশ খানিকটা ঘাম ঝরিয়ে সুবাদার ধীরে ধীরে নামলেন ঠাণ্ডা পানির চৌবাচ্চায়। বুক সমান ঠাণ্ডা পানিতে শরীরটা শীতল করে উঠে গেলেন হাম্মামখানার মূল বেদিতে। সুবাদার বেদির টাইলসের মেঝেতে বসতেই খানসামা নিয়ে এলো নানা রকম সুগন্ধি তেল। শুরু হলো মালিশ। আরামে শায়েস্তা খাঁর চোখ বুজে আসে।

ওপরের এই বর্ণনাটুকু নেহাতই কাল্পনিক, কিন্তু পুরোপুরি ইতিহাসভিত্তিক। কারণ মোগল আমলে এভাবেই লালবাগ কেল্লার হাম্মামখানাটি ব্যবহার করা হতো। প্রায় সাড়ে তিন শ বছর পর এই হাম্মামখানার সংস্কার, সংরক্ষণের কাজ হাতে নিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

হাম্মামখানা কী ও কেন

সহজ করে বলতে গেলে হাম্মামখানা হচ্ছে ‘গোসলখানা’। ইসলামপ্রধান দেশগুলোতে হাম্মামের ধারণার জন্ম হয়েছিল। সেখানে সাধারণত পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক পৃথক স্থানে দলবদ্ধভাবে গোসলের ব্যবস্থা থাকত। ‘হাম্মাম’ শব্দটি ফারসি, যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘তাপ’। আরব দেশগুলোতে সাধারণভাবে হাম্মাম শব্দটি ‘গোসলখানা’ অর্থেই ব্যবহৃত হতো। তুরস্কে সাধারণ মানুষের জন্য নির্ধারিত গোসলের স্থানকেও হাম্মাম বলা হতো। মধ্যপ্রাচ্যে হাম্মামখানাগুলো ধর্মীয় উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পাশাপাশি ছিল সামাজিক, সাংস্কৃতিক জীবনের অঙ্গ। তুর্কিদের মাধ্যমে হাম্মামের ধারণাটি মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপে যায়। বলা হয়, মধ্যযুগের বাংলায়ও হাম্মামখানার সংযোজন ঘটে তুর্কিদের হাত ধরেই। মোগলদের সময় এটি আরো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রকল্প

২০১৯ সালে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ‘ইউএস অ্যাম্বাসাডরস ফান্ড ফর কালচারাল প্রিজারভেশন-স্মল গ্র্যান্টস কম্পিটিশন ২০০০’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এতে অংশ নেয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। অধিদপ্তর গবেষণার মাধ্যমে লালবাগ কেল্লার হাম্মাম ভবনের সংস্কার, সংরক্ষণসহ উন্নয়নকাজের প্রস্তাব দেয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি—এই তিন বিষয়কে সামনে রেখে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রকল্পটি গৃহীত হয়।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রতন চন্দ্র পণ্ডিত কালের কণ্ঠকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থায়নে এক লাখ ৮৫ হাজার ডলারের এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দুজন জাতীয় ও একজন আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োজিত রয়েছেন। এঁরা হলেন—বাংলাদেশ এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপত্য বিভাগের ডিন অধ্যাপক আবু সাঈদ এম আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ টি এম জে নিলান কোরে।

প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত থ্রিডি আর্কিটেকচার ডকুমেন্টেশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে গ্লোবাল সার্ভে কনসালট্যান্ট নামের একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। ২০২১ সালের ২৪ মার্চ লালবাগ কেল্লায় প্রকল্পের কাজটির উদ্বোধন হয়।

যা যা কাজ হয়েছে

গবেষণা ও ডকুমেন্টেশনের প্রথম কাজ হিসেবে লালবাগ কেল্লার পুরনো নকশা, আলোকচিত্র, সংরক্ষণ প্রতিবেদন এবং রেফারেন্স গ্রন্থ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করা হয়। থ্রিডি আর্কিটেকচার ডকুমেন্টেশন প্রকল্পের আওতায় হাম্মাম ভবনের মোট তিনবার ডকুমেন্টেশন করার কথা। প্রথমটি সংস্কারের পূর্বে, দ্বিতীয়টি সংস্কারকালীন এবং শেষে সংস্কার-পরবর্তী।

হাম্মাম ভবনের দোতলার মেঝেতে কিছু ফাটল দেখা দেওয়ায় ১০-১২ বছর ধরে সেখানে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। সেসব ফাটলের ব্যাপ্তি, গভীরতাসহ সার্বিক অবস্থা বোঝার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায়, ফাটলগুলো মূলত দোতলার মেঝের টাইলসের। একতলার ছাদে কোনো ফাটল ধরেনি।

এ ছাড়া হাম্মামখানার কিছু নির্মাণ উপকরণের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই পরীক্ষায় কী কী উপাদানে স্থাপনাটি তৈরি করা হয়েছে, তা জানা যাবে। হাম্মামে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পর্কেও অনুসন্ধান করা হয়েছে গবেষণাকাজটিতে। পাশাপাশি চুল্লির পথ, পানি সরবরাহ, নিষ্কাশন পথসহ অন্যান্য ব্যবস্থাও উন্মোচিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞের কথা

কেন হাম্মামখানাটির এ ধরনের সংস্কারকাজের প্রয়োজন হলো—এই প্রশ্নের উত্তরে প্রকল্পটির পরামর্শক অধ্যাপক আবু সাঈদ এম আহমেদ বলেন, ‘হাম্মাম ভবনটিতে মোগল আমলের পর ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সময়কালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে। ফলে ভবনটির স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য ও উপাদানের পরিবর্তন হয়েছে। সেসব অনুসন্ধান করার জন্য আমরা হাম্মাম ভবনের প্লাস্টার ফেলে দিয়েছি। এটা করতে গিয়ে ভবনটি সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য পাচ্ছি। যেমন হাম্মামের গোসল করার অংশটি এর দ্বিতীয় তলার ভবনটির আগে তৈরি করা হয়েছে। মোগলদের ব্যবহৃত দ্বিতীয় তলার দুটি মূল সিঁড়ি এত দিন ব্যবহার করা হয়নি। এগুলো এত দিন দেয়াল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। আমরা সেগুলো ভেঙে বের করেছি। তারপর হাম্মামের গোসলখানায় প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করা জন্য ছাদে পাঁচটি ফুটো ছিল। সেগুলো এত দিন ধরে বন্ধ করা ছিল। আমরা সেগুলো আবার উন্মুক্ত করেছি। হাম্মামখানার দ্বিতীয় তলার চারদিক পর্দা দিয়ে ঢাকা ছিল। সেগুলোকেও আমরা তুলে দিয়েছি। এখন দিল্লি, আগ্রার মোগল স্থাপনাগুলো যেভাবে দেখা যায়, ঠিক সেভাবেই দর্শনার্থীরা ঢাকার এই স্থাপনাটি দেখতে পারবে। আমরা ভবনটি যথাসম্ভব আদিরূপে নিয়ে আসার একটা চেষ্টা করছি। ’

প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ টি এম জে নিলান কোর বলেন, ‘প্রকল্পের ডকুমেন্টেশন অংশটি আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে। হাম্মামখানায় জাদুঘর স্থাপন করা হবে কি না এ ব্যাপারে অধিদপ্তরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে যদি এখানে জাদুঘর স্থাপন করা হয়, তবে বেশির ভাগ দর্শনার্থী শুধু জাদুঘরে প্রদর্শিত প্রত্নসম্পদ দেখবে। সে ক্ষেত্রে হাম্মামখানার স্থাপত্যশৈলী তাদের দৃষ্টিগোচর হবে না। ’

 



সাতদিনের সেরা