kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

দেশের কাগজশিল্প বাঁচাতে আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



 দেশের কাগজশিল্প বাঁচাতে আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর দাবি

কাগজ উৎপাদনে দেশ অনেক আগেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও নানা অজুহাতে আমদানি থেমে নেই। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে দেশে অবাধে প্রবেশ করছে আমদানি করা কাগজ। রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত আমদানি করা কাগজ, বোর্ড, বস্ত্রসহ নানা পণ্য খোলাবাজারে দেদার বিক্রি হওয়ায় টিকতে পারছে না দেশি শিল্প। ৭০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা শিল্প খাতটির উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে লোকসান গুনছেন উদ্যোক্তারা।

বিজ্ঞাপন

১০৬টির মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৭৯টির বেশি কাগজ মিল।

এমন প্রেক্ষাপটে কাগজ আমদানির ওপর শুল্ক বাড়ানোর দাবি উঠেছে। বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে আশঙ্কা করা হয়েছে, বন্ডের অপব্যবহার বন্ধ ও কাগজ আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো না হলে দেশীয় কাগজশিল্প অল্প কিছুদিনের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাবে।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, কিছু স্বার্থান্বেষী আমদানিকারক এবং মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান দেশীয় মিল থেকে কাগজ সংগ্রহ না করে রেয়াতি শুল্কে কাগজ আমদানির পাঁয়তারা করছে। এই অপতৎপরতার একমাত্র উদ্দেশ্য অমিত সম্ভাবনাময় দেশীয় কাগজশিল্প ধ্বংস করা। যেখানে দেশীয় মিলকে উৎপাদিত কাগজ বাজারজাত করতে ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর দিতে হয়, সেখানে রেয়াতি শুল্কে কাগজ আমদানির অনুমতি দিলে স্থানীয় ও আমদানি করা কাগজের মধ্যে বিপুল বৈষম্য সৃষ্টি হবে। এ পরিস্থিতিতে রেয়াতি শুল্কে কাগজ আমদানির প্রস্তাব বিবেচনা না করার আহ্বান জানিয়েছে পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশের ১০৬টি কাগজ মিলে ৩১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ছয় হাজার ১১২ কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে। এ অবস্থায় দেশীয় কাগজশিল্পকে প্রায় বিনা শুল্কে আমদানি করা বিদেশি কাগজের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে ঠেলে দেওয়াটা এ শিল্পের জন্য হুমকি।

বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) মহাসচিব ও মাগুরা পেপার মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন বলেন, ‘সব ধরনের কাগজ তৈরির সক্ষমতা আমাদের আছে। অতএব বাংলাদেশে এ মুহূর্তে কোনো ধরনের কাগজ আমদানির প্রয়োজন নেই। বরং বাংলাদেশ থেকে ৪০টির বেশি দেশে কাগজ রপ্তানি হচ্ছে। যেখানে রপ্তানি করার যোগ্যতা রাখে বাংলাদেশ, সেখানে আমদানি করা যথার্থ নয়। তাই দেশীয় শিল্পের বিকাশে আমদানি শুল্ক দুই-তিন গুণ বাড়ানো উচিত। ’

ভারতসহ বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে এই শিল্পোদ্যোক্তা বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশে আমদানি কাগজ থাকলেও খুব উচ্চ শুল্ক দিয়ে তা আমদানি করতে হয়। আমাদের দেশেও একই নীতি গ্রহণ করা না গেলে দেশীয় কাগজশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। ’

কাগজশিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, গত শতাব্দীর আশির দশকে দেশীয় কাগজশিল্পের বিকাশ শুরু হলেও নব্বইয়ের দশকে বড় বড় শিল্প গ্রুপ এ খাতে বিনিয়োগ করায় কাগজশিল্প স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। আমদানিনির্ভর খাতটি রপ্তানিতেও পা বাড়ায়। দেশের ১০৬টি কাগজ মিল স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে ৪০টির বেশি দেশে কাগজ রপ্তানি করছে। মিলগুলোয় প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছে ১৫ লাখ মানুষ। আর পরোক্ষভাবে এই খাতে সম্পৃক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। এ শিল্পে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৭০ হাজার কোটি টাকা। সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্বও পায় এ শিল্প থেকে।

চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন

দেশের কাগজ মিলগুলো অফসেট, নিউজপ্রিন্ট, লেখা ও ছাপার কাগজ, প্যাকেজিং পেপার, ডুপ্লেক্স বোর্ড, মিডিয়া পেপার, লাইনার, স্টিকার পেপার, সিকিউরিটি পেপার ও বিভিন্ন গ্রেডের টিস্যু পেপার উৎপাদন করে। তবে উৎপাদিত পণ্যের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লেখা ও ছাপার কাগজ, যা শিক্ষার অন্যতম উপকরণ। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে প্রায় দেড় থেকে দুই গুণ বেশি পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে কাগজ মিলগুলোর। দেশে বিভিন্ন ধরনের কাগজের চাহিদা প্রায় ৯ লাখ টন। বিপরীতে দেশীয় কাগজ মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১৬ লাখ মেট্রিক টন। কাগজ মিলগুলোর মধ্যে ২০ থেকে ৩০টি মিল বড়। বাকিগুলো ছোট কারখানা। দেশের পেপার মার্কেটের আকার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার। মোট বাজারের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লেখা ও ছাপার কাগজ পণ্য। অবশিষ্ট ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ অন্যান্য পণ্য।

বিপিএমএর তথ্য মতে, দেশের পেপার শিল্প খাতে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যার সঙ্গে ৩০০ উপশিল্প তথা সহায়ক শিল্প, যেমন—মুদ্রণ, প্রকাশনা, কালি প্রস্তুত, ডেকোরেশন, প্যাকেজিং ও বাঁধাই শিল্প জড়িত।

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার

দেশীয় কাগজশিল্প উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে দেশে অবাধে প্রবেশ করছে আমদানি করা কাগজ। প্রায় বিনা শুল্কে আমদানি এসব কাগজ খোলাবাজারে দেদার বিক্রি হওয়ায় দেশীয় কাগজশিল্প মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। আমদানি করা কোটেড পেপার, গ্রাফিক পেপার, ডুপ্লেক্স বোর্ড, আর্ট কার্ড, মিডিয়া পেপার, সেলফ অ্যাডহেসিভ পেপারে রাজধানীর বাজার সয়লাব। যাদের সহায়তায় এসব কাগজ বিক্রি হচ্ছে, তাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে অব্যাহত রাখা হচ্ছে এ বাণিজ্য। কাগজ আমদানির বেশির ভাগ বন্ড আবার ভুয়া। অসাধু কর্মকর্তাদের ছত্রচ্ছায়ায় কাগজ আমদানিকারকরা এত শক্তিশালী যে কয়েক দিন আগে পুরান ঢাকায় কাগজের মার্কেটে অভিযান চালাতে গেলে কাস্টমস কর্মকর্তাদের তাঁদের হাতে নাজেহাল হতে হয়।

দেশীয় কাগজশিল্প বাঁচাতে আমদানি করা কাগজের ওপর শুল্ক বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিপিএমএর বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘বিগত দিনে পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহারের জন্য দেশি কাগজ মিলগুলো গুণগত মানসম্পন্ন কাগজ সরবরাহ করে এসেছে। কাগজশিল্প বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প খাত। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কাগজশিল্প আমদানি বিকল্প, রপ্তানিমুখী ও পরিবেশবান্ধব শিল্প খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তাই রেয়াতি সুবিধায় কাগজ আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে আত্মঘাতী। ডলারসংকটের এই সময়ে যেখানে আমদানি নিরুৎসাহ করা হচ্ছে, সেখানে আমদানির ওপর আরো শুল্ক আরোপ প্রয়োজন, আরো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ’

তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্প ও এর সহযোগী অন্যান্য শিল্পে বিনা শুল্কে বন্ড সুবিধার নামে কাঁচামাল হিসেবে কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সরকারের দেওয়া বন্ড সুবিধা ব্যবহার করে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী কারখানায় ব্যবহারের কথা বলে কাগজ ও কাগজজাতীয় পণ্য আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে সরকার প্রতিবছর বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে দেশি কাগজশিল্প অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে লোকসানে ধ্বংস হয়ে যাবে। দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাবে। অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সবেক চেয়াম্যান আবদুল মজিদ বলেন, ‘তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বিনা শুল্কে আমদানি করা কাগজজাতীয় পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করে এরই মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। এর সঙ্গে বিনা শুল্কে পাঠ্যপুস্তকের জন্য ব্যবহৃত কাগজ আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে আর্থিক ক্ষতি আরো বাড়বে। দেশীয় কাগজশিল্প লোকসানে পড়ে শেষ হয়ে যাবে। ’ 

বাজেট প্রস্তাব

দেশীয় কাগজ মিলগুলোতে বর্তমানে আমদানি বিকল্প পণ্য সেলস কপি পেপার উৎপাদন হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ধরে আমদানি করে দেশের চাহিদা মেটানো হতো। দেশের বাজারে থার্মাল পেপারের প্রচুর চাহিদা থাকায় এবং বর্তমান সরকারের উদার শিল্পনীতির সুযোগে আমদানি করা এই পণ্য বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হচ্ছে। আমদানি করা সেলফ কপি পেপারের চেয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান আরো ভালো। এ ছাড়া দেশে উন্নতমানের কাগজ তৈরি হওয়ায় আমদানিনির্ভরতা কমছে এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে। বাজেটে কাগজশিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কাঁচামালের রাসায়নিক আমদানি পর্যায়ে শুল্কহার হ্রাসের প্রস্তাব এবং আমদানি করা ফিনিশড পণ্যের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপের দাবি করেছেন বিপিএমএর নেতারা। এ ছাড়া পরিবেশ সহায়ক শিল্পকে উৎসাহ দিতে মাইক্রো ক্যাপসুলের আমদানি পর্যায়ে কাস্টম ডিউটি (সিডি) ২৫ শতাংশ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।

 



সাতদিনের সেরা