kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

মূল্যস্ফীতির তুলনায় ভাতা বাড়ছে না

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের অবস্থা

সজীব হোম রায়   

২৫ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মূল্যস্ফীতির তুলনায় ভাতা বাড়ছে না

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষকে রক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আওতা বাড়ানো দরকার। সেই সঙ্গে নগদ সহায়তা দেওয়ার কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে এখনো এমন প্রস্তাব নেই। প্রতিবন্ধী ভাতা ছাড়া অন্য কোনো ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে না বাজেটে।

বিজ্ঞাপন

ফলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ছে নামমাত্র।

ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ। ফলে বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ। নিত্যপণ্যের দামে লাগাম টানা যাচ্ছে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির নীরব ঘাতক। এর চাপ অব্যাহত থাকলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ে। আর মধ্যবিত্তরা জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খায়। দেশের মূল্যস্ফীতির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হিসাব প্রকাশ করে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে তিন মাস ধরে টানা ৬ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬.২৯ শতাংশ। মার্চে ৬.২৪ শতাংশ ও ফেব্রুয়ারিতে ৬.১৭ শতাংশ। গত দুই বছরে এমন মূল্যস্ফীতি আর ওঠেনি। এর আগে ২০২০ সালের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি উঠেছিল ৬.৪৪ শতাংশে।

গত মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে ৬.১৫ শতাংশ হারে। ফেব্রুয়ারি মাসেও মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬.০৩ শতাংশ।

এর অর্থ, দিনে আয় করে দিনে চলা মানুষ বাজার থেকে আগের মতো পণ্য ও সেবা কিনতে পারছে না। কারণ মজুরি বা বেতন বাড়লেও মূল্যস্ফীতি তা খেয়ে ফেলছে। করোনা ও অন্যান্য কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অনেক মানুষের আয়ও কমে গেছে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ বেড়ে গেছে।

বিবিএসের ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ২২ থেকে ২৪ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। করোনা মহামারিতে আরো দুই থেকে তিন কোটি মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকলে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা আরো বাড়বে।

দরিদ্র বাড়লেও ভাতা বাড়ছে না

আগামী বাজেটে প্রতিবন্ধী ভাতা বাদে অন্য কোনো ভাতা বাড়ানো হচ্ছে না। প্রতিবন্ধী ভাতাও বাড়ছে মাত্র ১০০ টাকা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা ২০ লাখ আট হাজারজন। গত অর্থবছরের থেকে এই সংখ্যা দুই লাখ বেশি। এদের জনপ্রতি ভাতার পরিমাণ ৭৫০ টাকা। এ খাতে ব্যয়ের জন্য চলতি বাজেটে এক হাজার ৮২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আগামী বাজেটে অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের মাসিক ভাতা ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে নতুন করে যুক্ত করা হচ্ছে না কোনো উপকারভোগী।

অর্থ বিভাগের তথ্যানুযায়ী, দেশে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় ১২৩টি কর্মসূচি আছে। এগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে ২৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ছাড়াও বয়স্ক ভাতা, স্বামী নিগৃহীতা, বিধবা, দরিদ্র মায়ের মাতৃত্বকালীন ভাতা, শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও সম্মানী ভাতা, হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ভাতা রয়েছে। এদের কারো ক্ষেত্রেই নতুন বাজেটে ভাতা বাড়ছে না। তিন অর্থবছর ধরে উপকারভোগীরা মাসে ৫০০ টাকা হারে ভাতা পাচ্ছে।

নতুন বাজেটে যে তালিকা ধরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা বিতরণ করা হবে তাও দেওয়া হবে পুরনো তালিকা দিয়ে। ওই তালিকায় ধনীরা ঢুকে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। খোদ সরকারের সংস্থাই তা বলছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের (এনএসএসএস) মধ্যবর্তী উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৬ শতাংশ ভাতাভোগী যোগ্য না হয়েও ভাতা নিচ্ছে। সঠিক লোকের কাছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সহায়তা পৌঁছাতে পারলে বাড়তি ব্যয় ছাড়াই ২৬ লাখ পরিবারের এক কোটি সাত লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচ থেকে তুলে আনা সম্ভব।

নতুন বাজেটে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে অর্থ বিভাগ। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে এক লাখ সাত হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে নতুন বাজেটে দুই হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, অত্যধিক মূল্যস্ফীতির জন্য প্রকৃত আয় কমছে। মানুষ আগের জীবনযাত্রা ধরে রাখতে পারছে না। তাই কভিডকালের মতো আবারও এককালীন অর্থ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। ৫০০ টাকা দিয়ে এখন আর এক মাস চলে না। তাই ভাতা বাড়াতে হবে।

 



সাতদিনের সেরা