kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

চার ট্রাস্টিকে পুলিশে সোপর্দ করলেন হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চার ট্রাস্টিকে পুলিশে সোপর্দ করলেন হাইকোর্ট

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাতের মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চার সদস্যকে গতকাল পুলিশে সোপর্দ করেন হাইকোর্ট। রাত সাড়ে ১০টার দিকে হাইকোর্টের লিখিত আদেশ এলে ১১টা ৫ মিনিটে তাঁদের শাহবাগ থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। ছবি : কালের কণ্ঠ

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের মামলায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ট্রাস্টির জামিন নামঞ্জুর করে পুলিশে দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগাম জামিনের আবেদন সরাসরি খারিজ করে গতকাল রবিবার এই আদেশ দেন বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের বেঞ্চ।

এই চার ট্রাস্টি হলেন রেহানা রহমান, এম এ কাশেম, মোহাম্মদ শাহজাহান ও বেনজীর আহমেদ।

হাইকোর্ট আদেশে বলেন, জামিন আবেদনকারী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ৩০৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় আবেদনকারী অভিযুক্তরা আগাম জামিন পেতে পারেন না। এ ছাড়া আগাম জামিন পাওয়ার মতো যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য কারণ তাঁরা আদালতকে দেখাতে পারেননি। যে কারণে আগাম জামিনের আবেদন  খারিজ করে তাঁদের পুলিশে সোপর্দ করা হলো। একই সঙ্গে শাহবাগ থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হলো, হেফাজতে পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যেন আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়।

আদালতে আসামি রেহানা রহমান ও এম এ কাশেমের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি, মোহাম্মদ শাহজাহানের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ফিদা এম কামাল। আর বেনজীর আহমেদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী এ এফ হাসান আরিফ। তাঁদের সহযোগিতা করেন আইনজীবী মিজান সাঈদ।

রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ ও এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। আর দুদকের পক্ষে শুনানি করেন মো. খুরশীদ আলম খান। এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাত সাড়ে ১০টার দিকে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে হাইকোর্টের লিখিত আদেশ বের হলে ১১টা ৫ মিনিটে আসামিদের শাহবাগ থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এর আগে আসামিদের আদালতকক্ষে পুলিশ প্রহরায় রাখা হয়। ’ তিনি আরো বলেন, ‘রাতে শাহবাগ থানার কাস্টডিতেই রাখা হবে তাঁদের। সকালে হয়তো বিচারিক আদালতে হাজির করা হবে। ’

এর আগে শুনানিতে আইনজীবী মিজান সাঈদ জামিন আবেদনকারীদের পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যাবসায়িক পরিচয় তুলে ধরে আগাম জামিন চান।

শুনানির এক পর্যায়ে আদালত বলেন, বর্তমানকালে অর্থপাচার ও দুর্নীতি হত্যার চেয়েও বিপজ্জনক অপরাধ। হত্যা একটি পরিবারকে ধ্বংস করে মাত্র, অর্থপাচার বা দুর্নীতি দেশ-সমাজকে ধ্বংস করে।

জামিনের বিরোধিতা করে দুদকের আইনজীবী শুনানিতে বলেন, বিশ্বিবিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাশ কাটিয়ে, টেন্ডার (দরপত্র) না করে অতিরিক্ত দাম দিয়ে জমি কিনেছেন। একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে তাঁরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন। এ ছাড়া জামিন আবেদনে কোথাও তাঁরা বলেননি, দুদক তাঁদের হয়রানি করছে বা করতে পারে। জামিনের অপব্যবহার করে তাঁদের দেশের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

জামিন আবেদনকারী ট্রাস্টি মোহাম্মদ শাহজাহানের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নথি জালিয়াতির ঘটনায় মামলা করা হয়েছে জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানিতে বলেন, এ মামলার বিরুদ্ধে রিট মামলা করে আদেশ নিয়ে তিনি দেশের বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে গিয়ে হাইকোর্টের সে আদেশে স্থগিতাদেশ নেয়। ওই মামলায় তিনি এখন জামিনে আছেন। সুতরাং তাঁদের জামিন দেওয়া হলে বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন। এ ছাড়া আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অর্থপাচার গুরুতর অভিযোগ। এসব বিবেচনায় জামিন আবেদন খারিজ করা হোক।

আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ট্রাস্টি হলেন যাঁকে ট্রাস্ট করা হয়। একজন ট্রাস্টি হিসেবে যদি সেই ট্রাস্ট ভঙ্গ করেন, তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এই চার আসামি ট্রাস্টের টাকার সদ্ব্যবহার করেননি। নিজের স্বার্থে টাকা ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি কিনেছেন অতিরিক্ত দাম দিয়ে। বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে। আপিল বিভাগের নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অর্থ আত্মসাৎ বা দুর্নীতি গুরুতর অপরাধ। আর অপরাধের গুরুত্ব বিবচেনায় হাইকোর্ট তাঁদের জামিন খারিজ করেছেন বলে মনে করি। ’

আসামিদের আইনজীবী মিজান সাঈদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামিন আবেদনকারীদের পুলিশ হেফাজেত দেওয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের অধস্তন আদালতে হাজির করার নির্দেশনা রয়েছে। হয়তো সোমবারই (আজ) তাঁদের হাজির করা হবে। সেখানে আমরা জামিন চাইব। ওই আদালত কী সিদ্ধান্ত দেন, তা দেখে আপিলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ’

ট্রাস্টি বেনজীরের কাণ্ড

আগাম জামিনের আবেদন সরাসরি খারিজ করে আদেশ দেওয়ার পরপরই তিনতলার আদালতকক্ষ থেকে বের হয়ে প্রথমে আদালতকক্ষের পাশের সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত চারতলায় ওঠেন বেনজীর। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে দু-তিনজনকেও উঠতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পরই আবার নেমে আসেন তিনতলায়। কিন্তু আদালতকক্ষে না ঢুকে দ্রুত হেঁটে ভবনের মূল সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যান। তখন তাঁর পেছন পেছন সংবাদকর্মীরাও ছুটতে থাকেন। ততক্ষণে বিষয়টি একজন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের নজরে আসে। পরে আদালতের কর্মকর্তারা তাঁকে আদালতকক্ষে নিয়ে আসেন। তিনি পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে কোনো জবাব দেননি ট্রাস্টি বেনজীর আহমেদ।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের জমি কেনা বাবদ অতিরিক্ত ৩০৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়ে তা আত্মসাতের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গত ৫ মে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক মো. ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী।

আসামিরা হলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আজিম উদ্দিন আহমেদ, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য এম এ কাশেম, বেনজীর আহমেদ, রেহানা রহমান, মোহাম্মদ শাহজাহান এবং আশালয় হাউজিং ও ডেভেলপারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিন মো. হিলালী।

তাঁদের মধ্যে রেহানা রহমান, এম এ কাশেম, মোহাম্মদ শাহজাহান ও বেনজীর আহমেদ হাইকোর্টে আগাম জামিন চেয়ে আবেদন করেন, যা গত বুধবার শুনানির জন্য ওঠে। ওই দিন উভয় পক্ষের শুনানির পর পক্ষ-বিপক্ষকে তাদের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ লিখিত আকারে জমা দিতে বলে পরদিন অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি রাখেন আদালত। বৃহস্পতিবার শুনানির জন্য উঠলে জামিন আবেদনকারীদের আইনজীবী মিজান সাঈদ শুনানির লিখিত সারসংক্ষেপ জমা দিতে প্রস্তুতির জন্য সময় চাইলে আদালত গতকাল রবিবার পর্যন্ত্ত শুনানি মুলতবি করেন।

 



সাতদিনের সেরা