kalerkantho

সোমবার । ২৭ জুন ২০২২ । ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৬ জিলকদ ১৪৪৩

তামিমের সেঞ্চুরিতে নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের

সাইদুজ্জামান, চট্টগ্রাম থেকে   

১৮ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তামিমের সেঞ্চুরিতে নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের

শতরান উদযাপন তামিম ইকবালের। ছবি : মীর ফরিদ

ঘোর দুঃসময় জাপটে না ধরলে চট্টগ্রামের এই উইকেটে কোনো ব্যাটারের রান না পাওয়ার কথা নয়। তবে নাজমুল হোসেন শান্ত তো গতকালই প্রথম অফস্টাম্পের বাইরের নির্বিষ বলে খোঁচা মেরে আউট হননি। মমিনুল হকের ব্যাট-প্যাডের মাঝে ফাঁক থেকে যাওয়া নিয়ে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা গতকাল টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে জানিয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচ জেমি সিডন্স। এই দুটি খুঁত বাদ দিলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটিং প্রদর্শনী দাপুটে।

বিজ্ঞাপন

এই দাপটের সেরা উদাহরণ তামিম ইকবাল। এক রাতের বিশ্রামে পানিশূন্যতা কাটিয়ে আজ আবার ব্যাটিংয়ে নামলে যাঁর ইনিংস ১৩৩ থেকে বেড়ে আজ আরো অনেক বড় হওয়ারও সম্ভাবনা আছে যথেষ্টই।

গতকাল ক্যারিয়ারের দশম টেস্ট সেঞ্চুরি করেছেন তিনি। নিজের শহরে এটা তাঁর দ্বিতীয় শতক। টেস্টে তামিম সেঞ্চুরি পেলেন ১৬ ইনিংস পর, যা তাঁর নামের প্রতি সুবিচার নয়। অবশ্য দুইবার নার্ভাস নাইন্টিজে কাটা না পড়লে এত লম্বা সময় অপেক্ষায় থাকতে হতো না তামিমকে। তাঁর অপেক্ষার এই অবসানও হয়েছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বিপর্যস্ত হয়ে ফেরা দলকে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছেন তিনি। চাপ ছিল তামিমের উদ্বোধনী সঙ্গী মাহমুদুল হাসানের ওপরও। ডারবানে দুর্দান্ত সেঞ্চুরির পরের তিন ইনিংসে ব্যর্থ এই তরুণের আরেকটি শতক সময়ের ব্যাপারই মনে হচ্ছিল। কিন্তু মুহূর্তের ভুলে সেই গন্তব্য আর ছোঁয়া হয়নি মাহমুদুলের (৫৮)। ততক্ষণে অবশ্য একটি রেকর্ডের অংশীদার হয়ে গেছেন তিনি, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উদ্বোধনী জুটির। ১৬২ রানের এই জুটি বড় ইনিংসের সাহস জোগাচ্ছে মুশফিকুর রহিম (৫৩*) ও লিটন দাসকেও (৫৪*)। অবিচ্ছিন্ন চতুর্থ উইকেট জুটিতে এরই মধ্যে স্কোরবোর্ডে তাঁরা যোগ করেছেন ১৩৪ রান। গতকালের দাপট যদি আজও বজায় থাকে, তবে মুশফিক ও লিটনের ফিফটি সেঞ্চুরি পেরিয়ে না যাওয়ার বিশেষ কোনো কারণ নেই। শ্রীলঙ্কার প্রথম ইনিংসকে টপকে যাওয়া তো সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এই ইনিংসে এরই মধ্যে তিনটি ‘বাধা’ টপকে গেছে বাংলাদেশ দল। লম্বা সময় ফিল্ডিংয়ের পর দিনের শেষ ভাগে মমিনুলদের ব্যাটিং লাইন আপ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়নি চট্টগ্রামে। দ্বিতীয় দিনের শেষ ভাগে ব্যাটিংয়ে নেমে নির্বিঘ্নে ১৯ ওভার কাটিয়ে দেওয়া তামিম ও মাহমুদুল তৃতীয় দিনেও শাসন করেছেন লঙ্কান বোলারদের। দ্বিতীয় সেশনে মাত্র ১৬ রানের ব্যবধানে ৩ উইকেট হারানোর আগে পর্যন্ত ওভারপিছু চারের বেশি রান তো আর এমনি এমনি রাখা যায় না। তাই বলে ব্যাটিংয়ে শৃঙ্খলার ঘাটতি ছিল না। প্রান্ত বদল করেও বিস্তর রান তুলেছেন তামিম-মাহমুদুল। আবার বাউন্ডারি লেখা বল পেলে ছাড়েননি। তাতে ২৫তম ওভারেই বাংলাদেশের ঘরে ১০০ রান জমা পড়ে। প্রথম সেশনে ৮১ রান বিনা উইকেটে। বাংলাদেশের দুই ওপেনারই ফিফটি পেরিয়ে গেছেন ততক্ষণে।

মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর দ্বিতীয় ওভারেই প্রথম চোট লাগে বাংলাদেশ ইনিংসে, আসিথা ফার্নান্ডোর লেগ সাইড দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া বল গ্লাভস ছুঁয়ে যায় মাহমুদুলের। সঙ্গী হারানোর ‘শোক’ অবশ্য প্রভাব ফেলেনি তামিমের মনঃসংযোগে। এমনকি নাজমুল ও মমিনুলের বিদায়েও লক্ষ্যচ্যুত হননি তিনি। যা ক্ষতি করার তা করেছে চট্টগ্রামের ভাপসা গরম। হাতের পর পায়ের পেশিতেও টান ধরায় চা-বিরতির পর তাঁকে আর মাঠে নামাতে চায়নি টিম ম্যানেজমেন্ট। মাঝে একটি রাতের বিরতির পর পূর্ণশক্তির তামিমকে আবার ব্যাটিংয়ে পাবে বলে আশাবাদী দলের ব্যাটিং কোচ জেমি সিডন্স।

দিনের দ্বিতীয় সেশনে ঝটপট তিন উইকেট হারানোই গতকালের একমাত্র ক্ষয়ক্ষতি বাংলাদেশ দলের। এই ক্ষতিটাও করেছেন ‘কনকাশন সাবসটিটিউট’ কাসুন রাজিথা। ব্যাটিংয়ের সময় শরিফুল ইসলামের বাউন্সার মাথায় লাগা বিশ্ব ফার্নান্ডো গতকাল সকালে বোলিংও করেছেন। কিন্তু মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর সতর্কতা হিসেবে তাঁর ‘এমআরআই’ করানোর সিদ্ধান্ত নেয় শ্রীলঙ্কা। তাতেই পরিবর্ত খেলোয়াড় হিসেবে একাদশে ঢুকে পড়েন রাজিথা, প্রথম ওভারে তুলে নেন নাজমুলকে। মমিনুলও তাঁর শিকার।

এমন বিপর্যয় বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত কি না, নেট দুনিয়ায় জোর আলোচনা শুরু হয়ে গেছে তখন। কিন্তু যত সময় গড়িয়েছে, ততই সেই বিপদসংকেত হামলে পড়েছে লঙ্কানদের ওপর। সৌজন্যে মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাস। পোর্ট এলিজাবেথের সেই রিভার্স সুইপ বিস্তর অপদস্থ করেছে মুশফিককে। গতকালও সুইপ খেলেছেন তিনি, তবে রিভার্স নয়। বরং মনে হয়েছে ১৭ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতার সবটুকু মেলে ধরেছেন মুশফিক। অন্যদিকে লিটন বরাবরের মতোই দর্শনীয়। ব্যাটিংটাকে দারুণ উপভোগ্য করে তোলেন তিনি। ফর্মে যে আছেন, সেই আশ্বাস জুগিয়েছেন প্রতিটি শটে। শুধু একবার লেগ স্লিপে ক্যাচ দিয়েছিলেন। এই একটি ভুল ছাড়া লিটনের ফিফটির ইনিংসকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে আরেকটি সেঞ্চুরি।

তবে ব্যক্তিগত ল্যান্ডমার্ক বিবেচনায় আরো বড় অর্জনের চৌকাঠে ঝুঁকিহীন ফিফটি পার হওয়া মুশফিক। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটের পাঁচ হাজারি ক্লাবে নাম লেখানোর খুব কাছে তিনি। তবে এই রেসে তামিম ইকবালও আছেন। পানিশূন্যতা কাটিয়ে আজ আবার ব্যাটিংয়ে নামলে এই লড়াইও জমে ওঠার কথা। পাঁচ হাজার টেস্ট রান থেকে মাত্র ১৫ রান দূরে আছেন মুশফিক। আর তামিমের চাই ১৯ রান। তৃতীয় দিনেও অক্ষত চট্টগ্রামের উইকেটে কি তবে একই দিনে দুজন পাঁচ হাজারি ক্লাবে নাম লেখাবেন?

দলীয় খেলায় দলের স্বার্থই মুখ্য। সেখানেও এগিয়ে বাংলাদেশ। হারের চোখরাঙানি হারিয়ে গেছে প্রায়। আজ ব্যাটাররা দ্রুত রান তুলতে পারলে উল্টো সফরকারীদেরই হারের হুমকি দেওয়া যাবে—বাকি দুটি দিনে দলের এমন লক্ষ্যের কথাই গতকাল জানিয়েছেন ব্যাটিং কোচ জেমি সিডন্স।

 

 



সাতদিনের সেরা