kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

মূল্যবৃদ্ধির পর আজ সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে

সজীব আহমেদ   

৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মূল্যবৃদ্ধির পর আজ সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে

সয়াবিন তেলের জন্য দোকানে দোকানে ঘুরছে ক্রেতা, তবু মিলছে না। বাজার ঘুরেও তেল না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে ক্রেতারা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও অতীতে ভোজ্য তেলের এমন সংকট হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাম সমন্বয় করতে না পারার কারণেই ভোজ্য তেল নিয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের পর তেলের দাম বাড়াবে বলেই কম্পানিগুলো ঈদের ১৫ দিন আগে থেকেই সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল, যার কারণে বাজারে সংকট দেখা দেয়। তবে তেল সরবরাহকারী কম্পানিগুলোর অভিযোগ, ঈদের আগে বাজারে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হয়, ঈদের পর তেলের দাম বাড়ার খবরে খুচরা বিক্রেতারা তেল মজুদ করেছেন।

এদিকে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বোতলে নতুন দাম সাঁটানো তেল এখনো বাজারে আসেনি। যেসব দোকানে সয়াবিন তেল আছে, তাতে আগের গায়ের দাম লেখা; কিন্তু তাঁরা দাম নিচ্ছেন নতুন দরে।

তেল সরবরাহকারী কম্পানিগুলো বলছে, বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেলের দাম টনপ্রতি দুই হাজার ডলার হয়ে গেছে। কিন্তু সরকারকে কথা দেওয়ায় ঈদের আগে দাম বাড়ানো হয়নি।

গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারেও ভোজ্য তেলের দাম সমন্বয় করে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৩৮ টাকা বাড়িয়ে ১৯৮ টাকা নির্ধারণ করার ঘোষণা দেন ব্যবসায়ীরা। এই দাম আজ শনিবার থেকে কার্যকর হবে। নতুন দাম অনুযায়ী পাঁচ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি করা হবে ৯৮৫ টাকায়। এ ছাড়া খোলা সয়াবিন তেল এক লিটার ১৮০ টাকা এবং পাম তেল এক লিটার বিক্রি করা হবে ১৭২ টাকায়।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা মাসুদ মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন বাজারে একদমই সয়াবিন তেল নেই। সয়াবিন তেল না থাকায় ভোক্তাদের মতো খুচরা বিক্রেতারাও ফিরে যাচ্ছেন। কম্পানির পরিবেশকরা বলছেন, দু-এক দিনের মধ্যে তেল দেবেন। ’ তিনি বলেন, ‘ঈদের পরে তেলের দাম বাড়াবে বলেই কম্পানিগুলো ঈদের অনেক আগে থেকেই তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল। কিছু কম্পানি তেল সরবরাহ একদম বন্ধই করে দিয়েছিল। ’

রাজধানীর জোয়ারসাহারা বাজারের ভাই ভাই স্টোরের ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাজারে সয়াবিন তেলের এই সংকট ঈদের ১৫ থেকে ২০ দিন আগে থেকেই। ঈদের আগে আমি কম্পানিগুলোর কাছে টাকা দিয়ে রেখেছি, তার পরও তেল পাচ্ছি না। বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, এতে মানুষের যে কষ্ট হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে বাজারে এসে তেল না পেয়ে। তেল ছাড়া তো রান্নার কাজ সম্ভবই নয়। তাই কম্পানির উচিত বাজারে পর্যাপ্ত তেলের সরবরাহ দেওয়া। ’ তিনি বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে সব পরিবার তেল কিনেছিল, এরই মধ্যে তাদের তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন দোকানে দোকানে ঘুরেও তেল কিনতে পারছে না তারা। এখন তেল পেলে সাধারণ মানুষ বেশি দামেই নিতে রাজি। ’

রাজধানীর ভাটারা থানার নতুন বাজারের ব্যবসায়ী রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঈদের আগে থেকেই কম্পানিগুলো সয়াবিন তেল দিচ্ছিল না, তাই বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। এখন দাম যেহেতু বেড়েছে, দু-এক দিন পরে হলেও কম্পানিগুলো তেল দেবে। ’

জোয়ারসাহারা বাজারে সয়াবিন তেল কিনতে এসে বাজার ঘুরে দুই লিটারের বোতল পাননি নেজামুল হক। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঈদের আগে বাজার ঘুরে কোথাও পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের বোতল পাইনি। তাই দুই লিটারের বোতল নিয়েছিলাম। সেটা ঈদে শেষ হয়ে গেছে। এখন যেহেতু তেলের দাম বাড়িয়েছে, বাজারে তেল পাওয়া যাবে, এ আশায় এসেছিলাম, কিন্তু বাজারে তেল পাচ্ছি না। ’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স ও বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিশ্বজিৎ সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম অনেক বেড়ে গেছে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের বাজারেও তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন দামের সয়াবিন তেল আগামীকাল (আজ) থেকে বাজারে সরবরাহ করা শুরু হবে। কম্পানিগুলোর কাছে এখন পর্যাপ্ত সয়াবিন তেল রয়েছে, বাজারেও পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হবে। আশা করি, তেলের সংকট থাকবে না। ’

বিশ্বজিৎ সাহা আরো বলেন, ‘বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বাড়লেও বেকারিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনে প্রভাব পড়বে না। কারণ সয়াবিন তেল মূলত রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। আর বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে পাম অয়েল ব্যবহৃত হয়ে থাকে, সয়াবিন তেল নয়। ’

ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সয়াবিন তেল আমাদের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় একটি পণ্য। এটির দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের কষ্ট হবে। কারণ ক্রেতাদের আয়-রোজগার তো আর বাড়েনি। বরং কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয় কম্পানিগুলো। ফলে কিছুদিন ধরে বাড়তি দামেও ভোক্তারা তেল কিনতে পারছিল না। ’ তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা তো লস দিয়ে পণ্য বিক্রি করবে না। সেই কারণে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল। যেহেতু এখন আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দাম সমন্বয় করা হয়েছে, তাই কম্পানিগুলোর উচিত বাজারে দ্রুত পর্যাপ্ত ভোজ্য তেল সরবরাহ বাড়ানো। ’

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক পণ্যবাজারে অস্বাভাবিক উত্থান হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি সংস্থার হিসাবে, এ দুটি দেশ বিশ্বে সূর্যমুখী তেলের এক-তৃতীয়াংশ জোগান দিত। সূর্যমুখী তেলের সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় চাপ পড়ে প্রধান দুটি ভোজ্য তেল পাম ও সয়াবিনের ওপর। এ ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে খরায় সয়াবিনের উৎপাদন কম হয়েছে এবার। এমন অবস্থায় ইন্দোনেশিয়া পাম তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। তাতে ভোজ্য তেলের বাজার আরো অস্থির হয়।

বিশ্বব্যাংকের গত ২৬ এপ্রিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না। সংস্থাটি সম্ভাব্য যে দামের আভাস দিয়েছে, সেটিও হতে পারে ইতিহাসের সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাসের দুই দিন পর ইন্দোনেশিয়া পাম তেল রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেয়। এর পরই বিশ্ববাজারে পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধির নতুন রেকর্ড হয়।

 

 



সাতদিনের সেরা