kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

বিশেষজ্ঞ মত

পুরনো বৃত্তে পাকিস্তান

সোহরাব হোসেন

৪ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পুরনো বৃত্তে পাকিস্তান

সোহরাব হোসেন

পাকিস্তানে কোনো সরকারই পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। কোনো প্রধানমন্ত্রীও পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির ক্ষমতার পাঁচ বছরে চারজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খান সরকারেরও তিন বছর আট মাসের মাথায় পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হলো।

বিজ্ঞাপন

ইমরান খান যখন ২০১৮ সালে পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, তখন ধারণা করা হচ্ছিল তাঁর পেছনে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর জোরালো সমর্থন আছে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বলতে গেলে, মুখ্য ভূমিকায় সামরিক বাহিনীই। বর্তমানে পাকিস্তানে অর্থনৈতিক সংকটও ব্যাপক। একদিকে অর্থসংকট, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডার কমে গেছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে। পাকিস্তানি রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে। সব মিলিয়ে সাধারণ জনগণ অনেক চাপে আছে।

পাকিস্তানে এখন যে জোট বা বিরোধী ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে এটি কতটা শক্তিশালী হয়ে কাজ করতে পারবে তা বলা কঠিন। পাকিস্তানে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। আদৌ এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন হবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ আছে। নির্বাচনের বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে কেউ যদি সুপ্রিম কোর্টে যান তবে সেখানেও কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে। আদালত বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখতে পারেন।

পাকিস্তান পরিস্থিতি এখন কোন দিকে যায় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই। তবে নির্বাচন যদি হয় তিন মাস বা তারও পরে, সেখানে যে জোটটা হয়েছে তা কতটুকু কী করতে পারবে তা এখনই বলা কঠিন। ইমরান খানের দল থেকে যাঁরা বেরিয়ে গেছেন তাঁরা আবার ফিরবেন কি না—তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। যদি ফিরে আসেন তবে আবার প্রেক্ষাপট পাল্টে যাবে। মানে সেখানে পরিস্থিতি খুব পরিবর্তনশীল। আরো কিছুদিন গেলে হয়তো বোঝা যাবে পরিস্থিতি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে।

ইমরান খান বিদেশি উসকানির অভিযোগ করেছেন। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা তা অস্বীকার করেছে। রাজনীতিতে এ ধরনের বক্তব্য অনেক আসে। কিছুটা সত্যতা থাকতেও পারে।

ইউক্রেন ইস্যুতে ইমরান খানের অবস্থান নিয়েও অনেক কথা আছে। সমস্যা হলো, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর আগ মুহূর্তে তিনি মস্কো সফর করেছিলেন। অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে বিদেশি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অভিযোগ করে তিনি আবার একে ‘স্লিপ অব টাং’ বলে বিষয়টিকে হাল্কা করার চেষ্টা করেছিলেন।

কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান বলেছেন, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি ভারসাম্যপূর্ণ। ইউক্রেনে মানবতাবিরোধী কাজকে পাকিস্তান সমর্থন করে না। রাশিয়া পাকিস্তানের বন্ধুরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রও পাকিস্তানের কৌশলগত অংশীদার। এভাবে বলা হয়তো ব্যালান্স করারও চিন্তা।

ইমরান খান গত সপ্তাহে পাকিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় বাংলাদেশেরও প্রশংসা করেছেন। ইমরান খানের মুখে বাংলাদেশের প্রশংসা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও তিনি পাকিস্তানের পার্লামেন্টে বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন। তাঁর দলের সদস্যরাও বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন। তিনি যখন বলছিলেন পাকিস্তানকে সুইজারল্যান্ড বানাবেন, তখন পার্লামেন্ট সদস্যরা বলেছিলেন, আমরা আগে বাংলাদেশের মতো হতে চাই।

পাকিস্তানের ফরেন রিজার্ভ এখন আমাদের প্রায় অর্ধেক। প্রায় পাঁচ বছর আগে আমি যখন পাকিস্তানে দায়িত্বে ছিলাম তখন পাকিস্তানি রুপি ও বাংলাদেশের টাকার পার্থক্য খুব কম ছিল। এখন বাংলাদেশের এক টাকা সমান পাকিস্তানের দুই রুপির চেয়ে বেশি।

পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর গুরুত্ব সব সময় আছে। ইমরান খান থাকবেন কি থাকবেন না—এই ভাবনা সামরিক বাহিনীর থাকতেই পারে। নির্বাচন যদি হয় তাহলে নির্বাচনকালীন সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা আঁচ পাওয়া যাবে। ইমরান খানের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর দূরত্ব যে খুব বেশি তা-ও বলা যাবে না। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়োগ নিয়ে কথা আছে। সেগুলোর বিষয়ে সামরিক বাহিনীর হয়তো কিছু আপত্তি ছিল।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর নিজস্ব কিছু কৌশল আছে। কৌশল অর্জনের জন্য কে প্রধানমন্ত্রী হলে ভালো হয়, সেটি অনেক সময় তাদের বিবেচনায় থাকে। তাই আজই বলা যাবে না পাকিস্তানের পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে। আরো কিছুদিন অপেক্ষা করলে অনুমান করা যাবে, এর মধ্যে নতুন কোনো বিষয় যুক্ত হচ্ছে কি না।

সোহরাব হোসেন : পাকিস্তানে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার

 



সাতদিনের সেরা