kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ২৬ মে ২০২২ । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৪ শাওয়াল ১৪৪

সরকারের একক উদ্যোগের সমালোচনা

বিশেষ প্রতিনিধি   

১৯ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সরকারের একক উদ্যোগের সমালোচনা

নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নে নেওয়া সরকারের পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও এককভাবে এই উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারের সমালোচনা করেছেন বিভিন্ন দল ও অংশীজনরা। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ও নাগরিক সমাজের একাংশ এমন অভিযোগও তুলেছে, রাষ্ট্রপতির সংলাপের মাধ্যমে যেভাবে আগের দুইবার নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং এবারও হতে যাচ্ছে, তাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এই আইন করা হচ্ছে।

তবে সরকারি দল দাবি করছে, যারা সমালোচনা করছে তারা তো এত দিন আইন প্রণয়নের কথা চিন্তাই করেনি। টিআইবি চাচ্ছে সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য আইন হোক।

বিজ্ঞাপন

  

২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। ‘রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ পদ্ধতি অধ্যাদেশ, ২০০৮’ নামে আইনের ওই খসড়া প্রকাশ করা হয়। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়টি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের বিবেচনার জন্য রেখে যায়। গত ১২ বছরে তা নিয়ে আর কোনো আলোচনা হয়নি।  

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের জন্য নির্ধারিত যে সময়সীমা, যদি তার আগে আইন প্রণয়ন সম্ভব হয় তাহলে এবারের ইসি গঠন হবে সেই আইন অনুসারেই। সার্চ কমিটির মাধ্যমে ইসি গঠনের যে প্রক্রিয়া তার চেয়ে ভালো কোনো প্রস্তাব এখন পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি। যারা এর সমালোচনা করছে, তারা তো এত দিন আইন প্রণয়নের কথা চিন্তাই করেনি।

সরকারের প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হবে। ছয় সদস্যের এই অনুসন্ধান কমিটির প্রধান থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি। সদস্য থাকবেন হাইকোর্টের একজন বিচারপতি, মহাহিসাবনিরীক্ষক, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রপতির মনোনীত দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। কমিটি যোগ্য ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করবে। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন।

সম্প্রতি সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আইনমন্ত্রীর কাছে নির্বাচন কমিশন গঠন আইনের একটি খসড়া প্রস্তাব দেয়। এই বিষয়ে সুজনের প্রস্তাব ছিল, রাষ্ট্রপতি কমিশনারের শূন্যপদে নিয়োগদানের জন্য ন্যূনতম একজন নারীসহ সাত সদস্যের সমন্বয়ে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করবেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতি এর আহ্বায়ক হবেন। অন্য সদস্যরা হবেন সরকারি দলের মনোনীত একজন, সংসদে বিরোধী দলের মনোনীত একজন, সংসদে আসনসংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় বৃহত্তম দলের মনোনীত একজন সংসদ সদস্য, মহাহিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, প্রথম পাঁচজনের সর্বসম্মত অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে মনোনীত নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের একজন করে প্রতিনিধি।

অনুমোদিত খসড়া আইনে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগে অযোগ্যতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, আদালতের মাধ্যমে কেউ অপ্রকৃতিস্থ হিসেবে ঘোষিত হন, দেউলিয়া ঘোষণার পর দেউলিয়া অবস্থা থেকে মুক্ত না হন, অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেন বা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন, নৈতিক স্খলন এবং সে ক্ষেত্রে যদি ফৌজদারি অপরাধে কমপক্ষে দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রায়ে দণ্ডিত হন। আর রাষ্ট্রীয় পদে থাকলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনার হতে পারবেন না।

সুজনের প্রস্তাবে বাড়তি ছিল, বৈধ আয়ে থাকলে এবং ঋণখেলাপি হলে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পাবেন না।

খসড়া আইনে অনুসন্ধান কমিটির কার্যপরিধি সম্পর্কে কী আছে, তা জানা যায়নি। এ বিষয়ে সুজনের প্রস্তাব ছিল, কমিটি কমিশনে নিয়োগদানের উদ্দেশ্যে পেশাজীবী সংগঠনসহ নাগরিকদের কাছ থেকে নাম আহ্বান করবে। সেখান থেকে একটি প্রাথমিক তালিকা করবে এবং তা গণবিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করবে। ওই ব্যক্তিদের বিষয়ে গণশুনানি হবে, তাঁদের  সাক্ষাৎকার  নেবে এবং সর্বসম্মতভাবে ন্যূনতম দুজন নারীসহ সাতজনের একটি প্যানেল করা হবে।

এতে দেখা যায়, এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনের প্রস্তাবিত খসড়ার কিছু ধারা-উপধারা সুজনের খসড়ায় স্থান পেয়েছে। যেমন হুদা কমিশনের প্রস্তাব ছিল, অনুসন্ধান কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। সুজনও একই প্রস্তাব করেছে। আর যা স্থান পায়নি তার মধ্যে আছে, ৬৫ বছরের বেশি বয়স হলে এ পদে অযোগ্য হবেন। কমিশনারদের  যোগ্যতা সম্পর্কে বলা হয়েছিল, ‘প্রমাণিত প্রশাসনিক দক্ষতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতাসহ আইনানুগ জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। ’ সুজনের প্রস্তাবেও একই কথা বলা হয়েছে।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত আইনের খসড়া সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি, তাতে মনে হয়েছে, রাষ্ট্রপতির সংলাপের মাধ্যমে যেভাবে আগের দুইবার নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং এবারও হতে যাচ্ছে, তাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এই আইন করা হচ্ছে। আমরা গত ১৮ নভেম্বর আইনমন্ত্রীকে একটি খসড়া বিবেচনার জন্য দিয়েছিলাম। তাতে অনুসন্ধান কমিটিতে সব পক্ষের সংসদ সদস্যদেরও রাখার কথা বলা হয়েছিল। অনুমোদিত খসড়া আইনে তা রাখা হয়নি। আমরা অনুসন্ধান কমিটির কার্যপরিধি বিষয়ে কিছু প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কমিটি নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেওয়ার জন্য যে তালিকা করবে তা গণবিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করার প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। খসড়া আইনে এ ধরনের কোনো বিধান রাখা হয়েছে কি না তা এখনো জানতে পারিনি। ’

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম গতকাল এ বিষয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, এত দিন ধরে যেটা প্রশাসনিক কায়দায় হয়েছে এখন সেটা আইনি কায়দায় হবে। এ জন্যই এটা ‘যেই লাউ, সেই কদু’।

জাতীয় পার্টি রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুজন প্রতিনিধির বিষয়ে আপত্তি তুলেছে। জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন তৈরিকে আমরা স্বাগত জানাই। আইনের যে খসড়ার কথা পত্রিকায় লেখা হয়েছে, তাতে অনুসন্ধান কমিটিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুজন থাকবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক  কি না—আমরা এ নিয়ে আলোচনা করছি। ’

আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত না নেওয়ার সমালোচনা করেছে বামদলগুলো। তাদের অভিযোগ, সরকার একলা চলো নীতি অবলম্বন করেছে। বাম গণতান্ত্রিক জোটের সাইফুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, সবার মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠন আইন প্রণয়ন করা উচিত।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘খসড়াটি দেখার পর বিস্তারিত মন্তব্য করা যাবে। তবে আমরা বহু আগে থেকেই বলে আসছি, এ বিষয়ে জনগণের মতামত গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ’

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, চুপিসারে মন্ত্রিপরিষদে আইনের খসড়া অনুমোদন গভীর উদ্বেগের বিষয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মতৈক্য ছাড়া সরকারি দলের পছন্দ অনুযায়ী সার্চ কমিটিকে আইনি চেহারা দিলে জনগণের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।



সাতদিনের সেরা