kalerkantho

বুধবার । ১২ মাঘ ১৪২৮। ২৬ জানুয়ারি ২০২২। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

সুসম্পর্কের ক্ষতি চায় না ভারত

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সুসম্পর্কের ক্ষতি চায় না ভারত

হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার সফরে সীমান্তে হত্যা বন্ধ এবং দ্রুত তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের তাগিদ দিয়েছে বাংলাদেশ। সুসম্পর্কের স্বর্ণযুগেও সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যার ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেছেন, তাঁরা বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক নষ্ট করতে চান না।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের সাক্ষাতের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে চমৎকার সুসম্পর্ক থাকার পরও ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর দ্বারা বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা বিরক্তিকর বিষয় হিসেবে আছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বিষয়টি ভারতের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার কাছে তুলে ধরার জন্য ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিবকে অনুরোধ করেছেন।

শ্রিংলার সৌজন্য সাক্ষাতের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা যে উচ্চ আসনে পৌঁছেছি, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সুন্দর সোনালি অধ্যায়, সেটি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। সেখানে অনেক ইস্যু এসেছে। তাঁরাও চান না এমন কাজ হবে যাতে উভয় দেশের মধ্যে কোনো ধরনের ...। ’

বাংলাদেশ ও ভারত কোনো ‘ভুল-বোঝাবুঝি’ এড়াতে চাইছে কি না জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা ‘ভুল-বোঝাবুঝি’ বলিনি। আমরা সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ় করতে ও সামনে এগোতে চাই। উভয় দেশের জনগণের কল্যাণের জন্য এটি দরকার। ”

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘সীমান্ত ইস্যু প্রসঙ্গে তারা (ভারতীয় পক্ষ) নিজেরাই বলেছে, তারা এগুলোর বিষয়ে আরো সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। তারা একটা ফর্মুলা দিয়েছে যাতে ঝামেলা না হয়। ’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, ‘ছোটখাটো ঝামেলাও যেন না হয়। পানির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সব বিষয়ই আমরা সমাধান করব আলোচনার মাধ্যমে। আলোচনা আরো ত্বরান্বিত করা হবে। ’

পরে পাঠানো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে দুই দেশের অমীমাংসিত অনেক ইস্যু সমাধান করার কথা ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের কাছে তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি আশা করেন, তিস্তাসহ অভিন্ন নদ-নদীগুলোর ন্যায্য ও সমন্বিত পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত স্বাক্ষর করা হবে। ভারত পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করলে তা ‘ভালো প্রতিবেশী’র প্রমাণ হিসেবে দেখা হতে পারে।

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব দুই দিনের সফরে গতকাল সকালে ঢাকায় পৌঁছান। এরপর তিনি দুপুরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে প্রায় ৫০ মিনিট ধরে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের পর মাসুদ বিন মোমেন বলেন, অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর পাশাপাশি আগামী দিনগুলোতে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

একই বছরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সফরকে ‘রেকর্ড’ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যৌথভাবে মৈত্রী দিবস পালনের কথা উল্লেখ করেন মাসুদ বিন মোমেন। তিনি বলেন, ‘সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের একটা স্বর্ণযুগ চলছে। ’

দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, প্রযুক্তিসহ নতুন খাতগুলোতে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রসচিব। তিনি বলেন, ‘আরো শান্তিপূর্ণ সীমান্ত কিভাবে আমরা নিশ্চিত করতে পারি সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ’

বাণিজ্য বৃদ্ধি ও কভিড মোকাবেলায় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘আমরা জানি, ওমিক্রন এখানে এসেছে। সামনে আরো ভেরিয়েন্ট আসতে পারে। সুতরাং কভিড সহযোগিতাও আমাদের মধ্যে অব্যাহত রাখতে হবে। ’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ কখনো নিরাপদ থাকবে না যদি ভারত নিরাপদ না থাকে। একইভাবে ভারত নিরাপদ থাকবে না যদি বাংলাদেশ নিরাপদ না থাকে। এটি সারা বিশ্বের জন্যই প্রযোজ্য। সুতরাং আমাদের সহযোগিতা করা ছাড়া কোনো সুযোগ নেই। ’

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশ, ভারত উভয় দেশের জনগণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছে। এটি এক বিরল ঘটনা। শ্রিংলা বলেন, ‘আমরা (ভারত) আপনাদের (বাংলাদেশের) বিজয় উদযাপনের অংশ হতে পেরে গর্বিত। ’ ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা সোনালি অধ্যায়ে আছি। আমরা অনেক ইস্যু আলোচনা করেছি। আমরা বড় কোনো মতপার্থক্য পাইনি। ’

বাংলাদেশকে অত্যন্ত সফল একটি দেশের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে শ্রিংলা বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমরা গর্বিত। অংশীদার, উন্নয়ন অংশীদার ও বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের যাত্রা বৈচিত্র্যময় করতে পেরে আমরা আনন্দিত। ’

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব আগামী বছর আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ১৯৬৫ সালের আগের পাঁচটি রেল সংযোগের সবগুলো পুনঃস্থাপন সম্পন্ন করার কথা জানান। তিনি বলেন, “আমরা ‘মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটির’ প্রত্যাশায় আছি। পরিবেশবান্ধব উপায়ে অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও  অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহার করতে চাই। ”

টিকা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা : ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে বৈঠকে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন কভিডের টিকা ও রোহিঙ্গা ইস্যুও তুলে ধরেন। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় ভারত থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশের টিকা পাওয়ার বিষয়ে জোর দিয়েছেন পররাষ্ট্রসচিব। এ ছাড়া তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে তিনি ভারতের সহযোগিতা চেয়েছেন।  

দ্রুত ট্রানজিট চালুর আশা : চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে ট্রানজিট সুবিধা দ্রুত কার্যকর করার প্রত্যাশায় আছে ভারত। গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাক্ষাতের পর শ্রিংলা সাংবাদিকদের এ কথা জানান। ওই সাক্ষাতে সড়ক যোগাযোগ বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

শ্রিংলা বলেন, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ টিকা পাবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের যত টিকার দরকার ভারত তা দেবে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তিস্তা বা সীমান্ত নিরাপদ করাসহ যেসব বিষয়ে আপনারা জানতে চাচ্ছেন তার সব কিছু নিয়েই আমরা কথা বলেছি। কাজও চলছে। আশা করি, সব সমস্যারই সমাধান সম্ভব। ’

প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন কি না জানতে চাইলে শ্রিংলা বলেন, গত মার্চ মাসে নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফরের সময়ই শেখ হাসিনাকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এই সফরের যথার্থ সময় বের করতে দুই দেশ কাজ করছে। শ্রিংলা বলেন, ‘ওমিক্রনসহ কভিড পরিস্থিতির বিধি-নিষেধের মতো বিষয় নিয়ে উদ্বেগ আছে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব সফর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। ’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণের বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রসচিব আজ বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানাবে।

শ্রিংলা সন্ধ্যায় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সফর শেষে তিনি আজ বুধবার নয়াদিল্লিতে ফিরে যাবেন।

 



সাতদিনের সেরা