kalerkantho

বুধবার । ১২ মাঘ ১৪২৮। ২৬ জানুয়ারি ২০২২। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

মুক্তিযোদ্ধাদের ‘শিক্ষাগুরু’

৫০ বছর পার করেছে বাংলাদেশ। বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের বড় অংশ এখন জীবনসায়াহ্নে। তাঁদের মধ্য থেকে ৮০ বছর পেরিয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে লিখছেন কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিরা

মনোতোষ হাওলাদার বামনা (বরগুনা)   

৬ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মুক্তিযোদ্ধাদের ‘শিক্ষাগুরু’

আ. মজিদ মিয়া

পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের বৈষ্যমের প্রতিবাদে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফিরে এসেছিলেন শ্যামল বাংলায়। সেনার বৃত্তি ছেড়ে হয়েছিলেন স্কুলের শিক্ষক। তবে ইতিহাসের ফেরে শরীরচর্চার শিক্ষকতার কাজ অচিরেই পরিণত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের মতো গুরুভার দায়িত্বে। আবার হাতে তুলে নিতে হয় অস্ত্র।

বিজ্ঞাপন

এ কাহিনি একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা বরগুনার বামনার ৮২ বছর বয়সী আ. মজিদ মিয়ার। স্মরণশক্তি বিলোপের অসুখ কেড়ে নিয়েছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় গৌরবের স্মৃতি। যুদ্ধকালের স্মৃতি তাই শোনা হলো সহধর্মিণী হাসিনা বেগমের মুখে। স্ত্রী হিসেবে হাসিনা বেগম খুব কাছ থেকে দেখেছেন মজিদ মিয়ার যুদ্ধদিনের তৎপরতা।

বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের শিংড়াবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আ. মজিদ মিয়া। ৯ নম্বর সেক্টরের সাবসেক্টর হেডকোয়ার্টার বুকাবুনিয়ার কমান্ডার ছিলেন তিনি।

সম্প্রতি আ. মজিদ মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে এ প্রতিনিধি তাঁর বাড়ি যান। সামনে যেতেই অপরিচিত হলেও বসতে বললেন। কিছু সময় বসে থেকে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির কথা। তখনই জানা গেল ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে স্মরণশক্তি চলে যাওয়ার কথা। ৫০ বছর আগের মুক্তিযুদ্ধের কথা তুলতেই তিনি বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কারণ কোনো কথাই প্রায় মনে পড়ে না। স্ত্রী হাসিনা বেগম জানালেন, ১৯৬০ সালের দিকে বিএম কলেজে পড়া অবস্থায় বাড়িতে কাউকে কিছু না বলে আ. মজিদ মিয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। লাহোরে পদায়ন হলে ১৯৬৪ সালের দিকে সদ্যোবিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে যান। ১৯৬৫ সালে কাশ্মীর নিয়ে পাক-ভারত যুদ্ধ হলে তাতে অংশ নেন। তখনই বাঙালি সেনাদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের বৈষম্যমূলক আচরণ চোখে পড়ে তাঁর। একসময় বিতৃষ্ণ হয়ে বড় ভাইয়ের মৃত্যুর সুবাদে দেশের বাড়ি চলে আসেন। আর সেনাবাহিনীর চাকরিতে ফিরে যাননি। ১৯৬৯ সালে বুকাবুনিয়া আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শরীরচর্চার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। দেশ তখন আন্দোলনে উত্তাল। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ডাকে অনুপ্রাণিত হন। প্রতিদিন স্কুলের শিক্ষার্থীদের শারীরিক কসরতের পাশাপাশি বাঁশ ও লাঠি দিয়ে যুদ্ধের কৌশল শেখাতে থাকেন। অচিরেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বুকাবুনিয়ার পাশে মঠবাড়িয়া উপজেলার রাজারহাটে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ছোট ঘাঁটি করেন ক্যাপ্টেন মেহেদী আলী  ইমাম ও উপ-অধিনায়ক আলমগীর হোসেন। তাঁদের সঙ্গে মজিদ মিয়ার যোগাযোগ হয়। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত হয়, সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় বুকাবুনিয়াতেই সাবসেক্টর হেডকোয়ার্টার হবে। আর এই হেডকোয়ার্টারের কমান্ডারের দায়িত্ব পান আ. মজিদ মিয়া। এর পর থেকে প্রতিদিন গভীর রাতে সেখানে নতুন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিতেন তিনি।

মজিদ মিয়ার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা ও বামনা থানা মুক্ত করার বীর সেনা মুক্তিযোদ্ধা আমীর হোসেন খান একাত্তরের স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘আমি মজিদ মিয়ার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আমি দেখেছি দেশের প্রতি তাঁর মমত্ব। ’

আমীর হোসেন খান আরো জানান, ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর ভোররাতে বামনা থানা আক্রমণে মজিদ মিয়া তাঁদের সঙ্গে ছিলেন। দুই মুক্তিযোদ্ধা মজিদ মিয়া ও সেলিম সরদারের নির্দেশনায়ই তাঁরা অভিযান চালিয়ে বামনা থানা মুক্ত করেন।

তৎকালীন বরগুনা মহকুমার মুজিব বাহিনীর প্রধান ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন খান বলেন, ‘আ. মজিদ মিয়া সাবসেক্টর হেডকোয়ার্টারের মুক্তিযোদ্ধাদের শিক্ষাগুরু। তাঁর প্রাথমিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করায় উৎসাহ পেয়েছিল। ’

প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার পর থেকে টানা প্রায় ২০ বছর বামনা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ছিলেন আ. মজিদ মিয়া।



সাতদিনের সেরা