kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

১৩ জনের ফাঁসি, যাবজ্জীবন ১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১৩ জনের ফাঁসি, যাবজ্জীবন ১৯

আমিনবাজারে ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্র হত্যামামলার রায় শেষে গতকাল আসামিদের আদালত থেকে কারাগারে নেওয়া হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভার উপজেলার আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামে শবেবরাতের রাতে বেড়াতে যাওয়া ছয় ছাত্রকে ‘ডাকাত আখ্যা’ দিয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ১৩ আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১৯ জনকে। আর অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় মামলার অন্য ২৫ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার ১০ বছর পর গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক ইসমত জাহান হত্যা মামলাটির রায় ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞাপন

কারাগারে থাকা ৪৪ আসামিকে গতকাল আদালতে হাজির করা হয়। এ ছাড়া এই রায়ের দিনে আত্মসমর্পণ করেন এক আসামি, যাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। জামিনে ছিলেন এক আসামি, তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে। বাকি ১১ আসামি পলাতক। তাঁদের দুজন আদালতের রায়ে খালাস পেয়েছেন। বাকি ৯ পলাতক আসামির দুজনের মৃত্যুদণ্ড এবং সাতজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত।

আদালত ও মামলার তদন্ত সূত্রে জানা যায়, দণ্ডিত আসামিরা বড়দেশী গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার), বালু ব্যবসায়ীসহ প্রভাবশালী ব্যক্তি। ছয় ছাত্রকে হত্যার পর পাল্টা ডাকাতির মামলা করে তাঁরা ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিতে চেয়েছিলেন। আলোচিত এই মামলার মোট ৯২ সাক্ষীর মধ্যে ৫৫ জন সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং তদন্তে ওই ছাত্রদের গণপিটুনির মাধ্যমে হত্যার প্রমাণ মিলেছে। দেশে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এ ধরনের রায় আগে হয়নি। তাই রায়টিকে যুগান্তকারী বলে মন্তব্য করছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে দ্রুত কার্যকর করার দাবি করেছেন তাঁরা। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীা বলেছেন, তাঁরা ন্যায়বিচার না পাওয়ায় উচ্চ আদালতে যাবেন।

গতকাল সকাল সোয়া ১১টার দিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানা থেকে আসামিদের কাঠগড়ায় তোলা হয়। এরপর বিচারক সাড়ে ১১টার দিকে রায় ঘোষণা করেন। রায়ের আদেশে বলা হয়, পেনাল কোডের ৩০২/৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় আসামি আব্দুল মালেক, সাইদ মেম্বার, আব্দুর রশীদ, ইসমাইল হোসেন রেপু, জমসের আলী, মীর হোসেন, মজিবুর রহমান, আনোয়ার হোসেন, রজ্জব আলী সোহাগ, আলম, রানা, হামিদ ও আসলাম মিয়াকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। একই সঙ্গে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডের আদেশ প্রদান করা হলো। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৩ আসামিকে পেনাল কোডের ২০১/৩৪ ধারায় সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ে পেনাল কোডের ৩০২/৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় আসামি শাহীন আহম্মেদ, ফরিদ খান, রাজীব হোসেন, ওয়াসিম, সাত্তার, সেলিম, মনির হোসেন, আলমগীর, মোবারক হোসেন, অখিল খন্দকার, বশির, রুবেল, নুর ইসলাম, শাহাদাৎ হোসেন, টুটুল, মাসুদ, মোখলেছ, তোতন ও সাইফুলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ১৯ জনকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ১৯ আসামিকে পেনাল কোডের ২০১/৩৪ ধারায় সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

খালাস ২৫ জন : আদালতের রায়ে বলা হয়, অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আসামি বাদশা, ফালান, অখিল, নুর হোসেন, রহিম, শাহাজান, সুলতান, এনায়েত, দুলাল, সোহাগ, লেমন, নিজামউদ্দিন, খালেক, ইমান আলী, আলম, আমিন, সালেহ আহমেদ, শামসুল হক, হাত কাটা রহিম, সেলিম, সানোয়ার হোসেন, আনোয়ার হোসেন ও সাইফুলকে বেকসুর খালাস প্রদান করা হলো। এ ছাড়া মারা যাওয়ায় আসামি কবির হোসেন, রাশেদ ও ছাব্বির আহম্মেদকে অব্যাহতি দেন আদালত।

নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, মামলার আসামিদের মধ্যে ১১ জন পলাতক ছিলেন। তাঁরা হলেন সাইফুল, সাত্তার, মোবারক, আফজাল, আলম, সেলিম, মনির, তোতন, শাহীন আহম্মেদ, মজিবুর রহমান ও আমিন। এর মধ্যে আফজাল ও আমিন বেকসুর খালাস পেয়েছেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জমসের আলী এত দিন পলাতক ছিলেন। গতকালই তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পলাতক আসামি আলম ও মজিবুর রহমানের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। এ ছাড়া শাহীন, সাত্তার, সেলিম, মনির, তোতন, মোবারক ও সাইফুলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। খালাস পাওয়া আসামি নিজামও জামিনে আছেন।

পলাতক আসামিদের মধ্যে পাঁচজন গত ২২ নভেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায় ঘোষণা করলে এজলাস থেকে পালিয়ে যান। তাঁদের মধ্যে জমসের আলীও ছিলেন, যিনি গতকাল আত্মসমর্পণ করেছেন।

দুই পক্ষের প্রতিক্রিয়া : সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আনন্দ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন আদালত। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। তবে পূর্ণাঙ্গ রায় বের হলে আদেশ পর্যালোচনা শেষে খালাস পাওয়া আসামিদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। ’

আসামিপক্ষের আইনজীবী শিউলী আক্তার খান ও শেখ সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘রায়ে ন্যায়বিচার হয়নি। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাব। মামলাটি গণপিটুনির। এই মামলায় কোনো চাক্ষুষ সাক্ষী নেই। মামলার তদন্ত ঠিকমতো হয়নি। ’

সেদিন যা ঘটেছিল : ২০১১ সালের ১৭ জুলাই শবেবরাতের রাতে সাভার উপজেলার আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামের কেবলা চরে ডাকাত আখ্যায়িত করে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পিটুনিতে শামস রহিম, তৌহিদুর রহমান, ইব্রাহিম খলিল, কামরুজ্জামান, টিপু সুলতান ও সিতাব জাবির নিহত হন, প্রাণে বেঁচে যান তাঁদের বন্ধু আল-আমিন। ২০১৬ সালে তিনি আদালতে সাক্ষ্য দেন। আল-আমিন বলেছিলেন, তিনিসহ সাত বন্ধু দারুসসালাম এলাকার একটি মসজিদে নামাজ পড়তে যান।



সাতদিনের সেরা