kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বিশেষজ্ঞ মত

ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়াকে বিলম্বিত করতে হবে

ডা. মুশতাক হোসেন

৩০ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়াকে বিলম্বিত করতে হবে

ডা. মুশতাক হোসেন

করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন সারা বিশ্বকে নতুন করে উদ্বেগে ফেলেছে। ফলে এটি নিয়ন্ত্রণে সারা বিশ্বকে একযোগে কাজ করতে হবে।

করোনার ওমিক্রন ধরনের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আগে যেভাবে স্বাস্থ্যবিধির কথা বলা হয়েছিল, সেভাবেই মেনে চলতে হবে। যিনি আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁকে অন্যদের কাছ থেকে পৃথক রেখে চিকিৎসায় সহযোগিতা করা দরকার। এ ক্ষেত্রে সরকার ও কমিউনিটি কাজ করতে পারে। আর স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তি উদ্যোগ নিলেই হবে না, প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও উদ্যোগ নিতে হবে।

একান্ত প্রয়োজন ছাড়া সভা-সমাবেশ না করাই ভালো। কোনোভাবেই নতুন এই ধরনকে অবহেলা করা যাবে না। সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নইলে এই ধরন হু হু করে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

বিশেষ ধরনের আরটি-পিসিআরে ওমিক্রন ধরন প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা যায়, যা পরবর্তী সময়ে জিনোম সিকোয়েন্স করে নিশ্চিত করা যায়। দেশে আইইডিসিআর ছাড়া এ ধরনের আরটি-পিসিআর নেই। আমি মনে করি, বড় বড় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওমিক্রন ধরন শনাক্তে বিশেষ ধরনের আরটি-পিসিআর বসানো উচিত। এভাবে নজরদারি শক্তিশালী হলে প্রথমেই তা শনাক্ত করা যাবে। তখন ব্যবস্থা নিতে সহজ হবে।

করোনার শুরুর সময়ে আমরা অভিজ্ঞ ছিলাম না। দিন দিন অভিজ্ঞতা বেড়েছে। ওমিক্রন নতুন ধরন, সেটিকেও চিনতে ও রোধ করতে অভিজ্ঞতা দরকার। কোনো দেশে বিশ্বমারি ছড়িয়ে পড়া পুরোপুরি রোধ করা যায় না, তবে তাকে বিলম্বিত করা যায়। এ ক্ষেত্রে আমরা ওমিক্রন ছড়িয়ে পড়াকে বিলম্বিত করার কাজটি করতে পারি। যেমন—ডেল্টা ধরনকে আমরা বিলম্বিত করতে পেরেছিলাম, তাই ভারতের মতো অবস্থা আমাদের হয়নি।

নতুন ধরন ওমিক্রনের লক্ষণ কভিডের আগের লক্ষণগুলোর মতোই। তবে এটি ডেল্টা ধরনের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হওয়ায় ছড়াবে বেশি। বেশি ছড়ালে মৃত্যুও বেশি হয়। তাই নতুন ধরনকে নিয়ন্ত্রণে সব ধরনের চেষ্টা আমাদের করতে হবে। ভারতে যখন ডেল্টা ধরন পাওয়া গেল, তখন আমরা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা যথার্থই করেছি। ফলে দেশে ধরনটি হঠাৎ করে সুনামির মতো আছড়ে পড়েনি। অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা যদি যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারি, তাহলে ওমিক্রন নিয়ে খুব বেশি ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

দেখা যাচ্ছে, সব দেশ করোনার টিকা সমহারে পাচ্ছে না। উচ্চ আয়ের দেশগুলো টিকা পাচ্ছে, কম আয়ের দেশগুলো বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে যেসব এলাকায় টিকা দেওয়া হচ্ছে না, ভাইরাসটি সেখানে শক্তি বাড়াচ্ছে। এতে যারা টিকা নিচ্ছে, তারাও ঝুঁকিতে থাকছে। কারণ ওমিক্রন এতটা শক্তিশালী যে টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেও ডেল্টা ধরনের চেয়ে বেশি হারে আক্রমণ করছে। একা একা টিকার সুফল পাওয়ার সুযোগ নেই। সবাই একসঙ্গে ব্যবস্থা নিলে ভাইরাসটিকে পরাস্ত করা যাবে। অন্যথায় নতুন নতুন ধরন তৈরি হতেই থাকবে।

এ ক্ষেত্রে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর দায়িত্ব নিতে হবে। ওমিক্রনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ মানুষ টিকা পেয়েছে, এমন দেশে নতুন এই ধরন সৃষ্টি হয়নি। যেখানে পর্যাপ্ত টিকা দেওয়া হয়নি, সেখান থেকে ভাইরাসটি উচ্চ আয়ের দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশে জীবন রক্ষাকারী দামি ওষুধ তৈরি করে তা কম দামে উন্নয়নশীল দেশে সরবরাহের নিয়ম ছিল। কিন্তু কভিডের ক্ষেত্রে উচ্চ আয়ের দেশগুলো সেটা মানছে না। উন্নয়নশীল দেশগুলো সস্তায় কিভাবে ওষুধ, টিকা, রোগ নির্ণয় সামগ্রী পেতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে, তাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্যও পিপিই ও মাস্ক সহজলভ্য নয়। ফলে ওই সব দেশে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সারা বিশ্বে এসব জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাসামগ্রী ন্যায্য বণ্টন করে থাকে। কিন্তু এবার করোনা মহামারি মোকাবেলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকেও অভাবে পড়তে হয়েছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলো থেকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টিকা ও টাকা সরবরাহ না থাকায় তারা পিছিয়ে পড়া দেশগুলোতে পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ করতে পারছে না।

এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমাদের নিজেদের সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা করতে হবে। জনসাধারণকেও সচেতন হতে হবে।

লেখক : উপদেষ্টা, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)



সাতদিনের সেরা