kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

দ্রুত বিদেশে নিতে চায় বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৫ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দ্রুত বিদেশে নিতে চায় বিএনপি

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক জটিলতা বাড়ছে। পুরনো সমস্যাগুলোর সঙ্গে গত দুই দিনে চিকিৎসকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে তাঁর শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণের মতো বিষয়। এর জন্য গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় আরো কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করে কালের কণ্ঠকে বলেছে, সর্বশেষ তাঁর এন্ডোস্কোপি ও কোলনোস্কোপি করা হয়েছে। তবে রক্তক্ষরণের জায়গাটি চিহ্নিত করা যায়নি।    

খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবিতে আট দিনের নতুন কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি। খালেদা জিয়াকে নিয়ে কোনো গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি।

আগের কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সারা দেশে দলের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সম্মেলন করে খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর দাবি করেছেন ডা. জাফরুল্লাহ। খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় গতকাল বিকেলে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে দোয়া মাহফিল করে জাতীয়তাবাদী উলামা দল।

স্বাস্থ্যের সর্বশেষ অবস্থা

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে গেছেন। খাওয়ার রুচিও কম। শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণের (ইন্টার্নাল ব্লিডিং) কারণে রক্তে হিমগ্লোবিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। তাই গত মঙ্গলবার রাতে তাঁকে রক্ত দিতে হয়েছে বলে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সূত্রে জানা গেছে।

গত রাত পর্যন্ত খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বড় কোনো অবনতি ঘটেনি বলে সূত্র জানায়। তিনি কথাবার্তা বলছেন।

এর আগে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গতকাল বিকেলে মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যরা বসেছিলেন। তাঁরা ম্যাডামের কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছেন। সেগুলো করানো শেষে তাঁরা পর্যালোচনা করবেন এবং নতুন করে আবার পরামর্শ দেবেন।’

আট দিনের কর্মসূচি ঘোষণা

গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের যৌথ সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার অবস্থা খুবই মুমূর্ষু। চিকিৎসকদের পক্ষে যতটা সম্ভব, তাঁরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছেন।’

মির্জা ফখরুল আরো বলেন, ‘ম্যাডামের বিষয়ে আপনারা সরাসরি আমাকে ফোন করবেন। আমি আপনাদের জানাব। আজ এখনো কিছু গুজব ছড়াচ্ছে। আমার মনে হয়, অত্যন্ত কৌশলে কোনো মহল অসৎ উদ্দেশ্যে গুজব ছড়াচ্ছে।’

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে কর্মসূচি দিয়ে গতকাল ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘ম্যাডামের মুক্তি ও তাঁর বিদেশে সুচিকিৎসার দাবিতে আমরা আপাতত এই কর্মসূচি শুরু করছি বৃহস্পতিবার থেকে। এই কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থার ওপর। প্রয়োজনে এই কর্মসূচি পরিবর্তন করা হতে পারে। সেটা আমরা যখন প্রয়োজন হবে, তখন জানাব।’

আট দিনের কর্মসূচির মধ্যে বিএনপি দুই দিন এবং অঙ্গসংগঠনগুলো চার দিনের কর্মসূচি পালন করবে। বিএনপি ২৬ নভেম্বর খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনায় সারা দেশে মসজিদে দোয়া মাহফিল ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনাসভা এবং ৩০ নভেম্বর বিভাগীয় সদরে সমাবেশ করবে। ২৫ নভেম্বর যুবদল, ২৮ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক দল, ৪ ডিসেম্বর ছাত্রদল এবং ৩ ডিসেম্বর কৃষক দল ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ, ২ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা দল মানববন্ধন এবং ১ ডিসেম্বর মহিলা দল মৌন মিছিল করবে।

খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে সুচিকিৎসার দাবিতে ২২ নভেম্বর খুলনা, নরসিংদী, নাটোর, সাতক্ষীরা, বরগুনাসহ বিভিন্ন স্থানে সমাবেশের কর্মসূচিতে পুলিশি বাধা ও হামলার ঘটনার নিন্দা জানান বিএনপি মহাসচিব।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, কেন্দ্রীয় নেতা আমানউল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, রুহুল কবীর রিজভী, খায়রুল কবির খোকন, শ্যামা ওবায়েদ, আবদুস সালাম আজাদসহ অঙ্গসংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি

দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলামের কাছে স্মারকলিপি দেয় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীর নেতৃত্ব একটি প্রতিনিধিদল। পরে সাংবাদিকদের রিজভী বলেন, ‘খালেদা জিয়া মিথ্যা মামলায় তিন বছর ধরে বন্দি রয়েছেন। আমরা আগেও বলেছি, তাঁকে তিলে তিলে নিঃশেষ করতেই বন্দি করা হয়েছে। এর প্রমাণ হলো, খালেদা জিয়া এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।’

আজই তাঁকে বিদেশে পাঠানো উচিত

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে যান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের কয়েকজন নেতা। এ বিষয়ে গতকাল সকালে রাজধানীর নগর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘খালেদা জিয়ার অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। আজকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে পাঠানো উচিত। খালেদা জিয়া কতক্ষণ, কয় মিনিট, কয় দিন বাঁচবেন সেটা আমি বলতে পারব না। কিন্তু এই হত্যার জন্য আইনমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হুকুমের আসামি হবেন।’

জাফরুল্লাহ বলেন, ‘মেডিক্যাল বোর্ডের ছয়জন চিকিৎসক গতকাল আমাকে বিস্তারিত বলেছেন। মঙ্গলবার আমরা যখন গিয়েছি তখন খালেদা জিয়াকে রক্ত দেওয়া হচ্ছিল। বিলেতে এ ধরনের রোগের চিকিৎসা আমিও করেছি। তাঁকে রক্ত দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। রাত ৩টা পর্যন্ত চিকিৎসকরা চেষ্টা করেছেন।’

বিচার বিভাগের উদ্দেশে জাফরুল্লাহ বলেন, ‘সুয়োমটো রুল বলতে একটা কথা আছে। আজ কেন বিচারপতিরা খালেদা জিয়ার মতো একজন মুমূর্ষু রোগীকে জামিন দিতে পারেন না? প্রতি মিনিটে খালেদা জিয়ার জীবনীশক্তি কমে যাচ্ছে।’

রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে যেতে পারতেন। আইনমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আর কোনো ভানুমতির খেলা দেখাবেন না। অনুগ্রহ করে আজকেই খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে দিন।’

সংবাদ সম্মেলনে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, আপনি তাঁকে (খালেদা জিয়া) বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন।’

সাংবাদিকদের আহ্বান

দুই হাজার ৫৮২ জন সাংবাদিক খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দিতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন। গতকাল সংবাদপত্রে পাঠানো ওই বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে আছেন রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, আলমগীর মহিউদ্দিন, আমানউল্লাহ, আবুল আসাদ, শওকত মাহমুদ, রেজোয়ান সিদ্দিকী, কাদের গনি চৌধুরী, কামাল উদ্দিন সবুজ, ইলিয়াস খান প্রমুখ।

কোরআন খতম ও দোয়া মাহফিল

খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি কামনায় গতকাল বিকেলে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দোতলায় কোরআন শরিফ খতম ও দোয়া মাহফিল করে জাতীয়তাবাদী উলামা দল।

এতে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নেতা রুহুল কবীর রিজভী, মৎস্যজীবী দলের সদস্যসচিব মো. আবদুর রহিম, উলামা দলের আহ্বায়ক শাহ মোহাম্মদ নেছারুল হক, সদস্যসচিব অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম তালুকদার, মহিলা দলের সুলতানা আহমেদ প্রমুখ।



সাতদিনের সেরা