kalerkantho

সোমবার । ১৪ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

অক্সিজেনের নল খুলে দেওয়ায় স্কুলছাত্রের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া ও গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

১১ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



অক্সিজেনের নল খুলে দেওয়ায় স্কুলছাত্রের মৃত্যু

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে গতকাল বিকেলে বিকাশের মরদেহ গাইবান্ধার সাঘাটার বাড়িতে পৌঁছানোর পর তার মা কল্পনা দাসের আহাজারি। ছবি : কালের কণ্ঠ

বকশিশের পুরো টাকা না পেয়ে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে রোগীর মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক খুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ট্রলি বয়ের বিরুদ্ধে। স্বজনরা বলছেন, এর পরই সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত বিকাশ মারা যায়। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতালটির সার্জারি বিভাগে এই ঘটনা ঘটে।

মারা যাওয়া বিকাশ চন্দ্র কর্মকারের (১৬) বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার পুঁটিমারী গ্রামে। উপজেলার একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল সে। অভাবের সংসারে লেখাপড়ার পাশাপাশি স্থানীয় একটি ওয়ার্কশপে কাজ করত বিকাশ। মঙ্গলবার রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয় সে। তাকে সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে।

বিকাশের চাচা শচীন চন্দ্র জানান, শজিমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রাত সাড়ে ১০টায় বিকাশকে নিয়ে পৌঁছেন তাঁরা। মাথায় আঘাত পাওয়া বিকাশকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে তৃতীয় তলার সার্জারি বিভাগে স্থানান্তর করেন। ট্রলি বয় আসাদুজ্জামান দুলু ট্রলিতে করে বিকাশকে তৃতীয় তলায় নিয়ে যান। বিকাশের প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হতে থাকায় জরুরি বিভাগেই তার মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরানো হয়। সার্জারি বিভাগে নেওয়ার পর দুলু ২০০ টাকা বকশিশ দাবি করেন। সঙ্গে যথেষ্ট টাকা না থাকায় বিকাশের বাবা বিশু দাস তাঁকে ১৫০ টাকা দেন। আরো ৫০ টাকার জন্য দুলু রাগারাগি করতে করতে এক পর্যায়ে বিকাশের মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক খুলে দেন। এতে বিকাশের শ্বাসকষ্ট আরো বেড়ে গেলে বিশু দাস ট্রলি বয়ের কাছে আনুনয়-বিনয় করেন। ৫০ টাকা না দেওয়া হলে মাস্ক লাগানো হবে না বলে জানিয়ে দেন দুলু।

বিশু দাস জানান, প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে এক পর্যায়ে বিকাশের দেহ নিথর হয়ে যায়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

গতকাল বুধবার হাসপাতালের উপপরিচালক আবদুল ওয়াদুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযুক্ত আসাদুজ্জামান দুলু হাসপাতালের কর্মচারী নয়। দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে শ্রমিকের কাজ করত সে। হাসপাতালের ভেতর এই ঘটনা ঘটায় আমরা চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।’

গতকাল বিকেলে বিকাশের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ঘটনার পরই পালিয়ে যান দুলু। তাঁর সঙ্গে কাজ করা আবুল নামের একজন জানান, দুলুর বাড়ি গাইবান্ধার মহিমাগঞ্জে। বগুড়া শহরের শাকপালা এলাকায় ভাড়া থাকেন তিনি।

বগুড়া সদর থানার ওসি সেলিম রেজা জানান, এ ঘটনায় পুলিশ একটি জিডি করেছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর মামলা করা হবে।

গতকাল সন্ধ্যায় বিকাশের মরদেহ গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার পুঁটিমারি গ্রামে পৌঁছালে সেখানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। প্রতিবেশীরা ছুটে যায় তার বাড়িতে। বিকাশের মা কল্পনা দাস বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, ‘কয়েকটা টাকার জন্য ওই লোকটা মুখ থেকিয়া মাস্ক খুলি নিল। আমরা গরিব তাই ছইল হারাইলাম।’ তাঁর আহাজারিতে উপস্থিত সবার চোখ ভিজে ওঠে।



সাতদিনের সেরা