kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ মাঘ ১৪২৮। ২৭ জানুয়ারি ২০২২। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

শূন্য থেকে শুরু করুন

সাইদুজ্জামান   

৫ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




শূন্য থেকে শুরু করুন

হাঁসফাঁস করতে থাকা ব্যাটার আউট হওয়ার পর ধারাভাষ্যকাররা আর আগের মতো করে বলেন না, ‘অবশেষে তাঁর মুক্তি মিলল!’ গতকাল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশের আউট হওয়া ব্যাটারদের দেখে সে রকমই মনে হচ্ছিল। গোল্লায় যাক রান, এই পর্বতসম চাপ থেকে তো মুক্তি মিলল!

দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ দলকে দীর্ঘকাল অনুসরণের সুবাদে জানি সফরের শেষটায় অস্থিরতায় ভোগেন ক্রিকেটাররা। বাড়ির টান থাকে। আর ব্যর্থতা সঙ্গী হলে বাড়ি ফেরার তাড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আড়াল খোঁজার অস্থিরতা।

বিজ্ঞাপন

দুঃসময়ে মাঠে নেমে অযথা সমালোচিত হওয়ার মানে অনেকেই খুঁজে পান না। বরং সেসব ম্যাচে দলের বাইরে কিংবা ডাগ আউটে বসে থাকাই নিরাপদ, গ্যালারির গালমন্দ তো আর গায়ে এসে পড়বে না। সব দোষ তো যাঁরা মাঠে খেলেছেন, তাঁদের!

মোটেও নয়। বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টিকেন্দ্রিক ভাবনাতেই তো গলদ। এই ফরম্যাটের ব্যাটারদের পাওয়ার হিটিং সামর্থ্য থাকা অনিবার্য। সেটি বাংলাদেশ দলে অনুপস্থিত, গোটা দেশ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও এমন একজন ব্যাটারকে পাওয়া যাবে না যিনি ১৪০ স্ট্রাইক রেট রাখতে সক্ষম। বাংলাদেশের স্বীকৃত ব্যাটারদের মধ্যে এই ফরম্যাটে সবচেয়ে বেশি স্ট্রাইক রেট লিটন কুমার দাসের, ১২২.৬৭। এবারের বিশ্বকাপে সেই তাঁরই স্ট্রাইক রেট ৯৪.৩২! এই আসরে সবচেয়ে বেশি রান করা নাঈম শেখের স্ট্রাইক রেট ১১০.৮২।

অথচ রাসেল ডমিঙ্গোর বিশ্বকাপ ‘ব্লু প্রিন্ট’ ছিল পুরো উল্টো। ৬ ওভারের পাওয়ার প্লে-তে ৬০ রান লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন তিনি। তাই ১১৬.৯৬ স্ট্রাইক রেটের তামিম ইকবালকে দিয়ে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে না। লিটনের সঙ্গে ওপেনিং জুড়ি বেঁধে দেন ডমিঙ্গো। বিকল্প হিসেবে অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহর পছন্দ সৌম্য সরকার, প্রয়োজনে তাঁর মিডিয়াম পেস বোলিংটাও পাওয়া যাবে।  

যুক্তি অবশ্যই আছে। ওপেনারকে ধুমধাম মারতে হবে। কিন্তু ডমিঙ্গো কি বুঝতে পারেননি যে তাঁর দলের কেউই পাওয়ার প্লে-তে ৬০ রান তোলার জন্য তৈরিই হননি। ঝিমুতে থাকা উইকেটে খেলে অভ্যস্ত কোনো ব্যাটারের পক্ষেই যে খোলা মনে শট খেলা সম্ভব নয়, এটা ভিনদেশি ডমিঙ্গো যদি না-ও বুঝে থাকেন, বাংলাদেশ অধিনায়ক এবং নির্বাচকদের তো অজানা থাকার কথা নয়। দল নির্বাচনী সভায় তো তাঁরাও ছিলেন। কী করে পাওয়ার প্লে-তে ৬০ রান তোলার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপে গেছেন, তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন।

বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নিবিড় প্রস্তুতি নিয়েছিল বাংলাদেশ দল। জিম্বাবুয়েতে একটি এবং এরপর ঘরের মাঠে দুটি সিরিজ মিলিয়ে মোট ১৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ প্রস্তুতির জন্য দারুণ মঞ্চ। কিন্তু এই তিনটি সিরিজের সাফল্যই যে বাংলাদেশের সত্যিকারের সামর্থ্য নয়—সেটি কেন উপলব্ধি করতে পারেনি টিম ম্যানেজমেন্ট? কেন বিশ্বকাপের সাত ম্যাচ খেলে ফেলার পর তাসকিন আহমেদকে বলতে হয়, ‘আমরা দেশে যে রকম উইকেটে খেলি, সেখানে খেলে অন্য কোথাও ভালো করা সম্ভব নয়। সেটা ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগেই। ’ বাংলাদেশ দলসংশ্লিষ্ট কেউ যদি এটুকু বুঝে না উঠতে পারেন, তবে তাঁর সরে যাওয়াই উচিত।

উচিত আরো অনেক কিছুই। প্রথমত, মিরপুরের ‘রহস্যময়’ উইকেটে অন্তত টি-টোয়েন্টির আসর যেন আয়োজন না করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দুর্বল শক্তির অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে মিরপুরের গোলকধাঁধায় ফেলে জনমনে মেকি স্বস্তি দেওয়া এবং ফাঁকি দিয়ে র্যাংকিংয়ের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা যায়, কিন্তু পতন অনিবার্য। ৬ নম্বরে থেকে বিশ্বকাপে মাহমুদ উল্লাহরা। দেশে ফিরছেন ৯ নম্বরে ঝুলে। আশা করছি এবারের অভিজ্ঞতা থেকে বিসিবির কর্তাব্যক্তি এবং টিম ম্যানেজমেন্ট যেনতেনভাবে জেতার চেয়ে ভালো উইকেটে খেলা আয়োজনে আগ্রহী হবেন।

এটা ঠিক যে বিশ্বের সব দেশই নিজেদের পছন্দের উইকেটে খেলে সেরা ফল বের করে নিতে চায়। কিন্তু পাওয়ার হিটিং অত্যাবশ্যক বিধায় টি-টোয়েন্টির ব্যাপারটা আলাদা। এই শক্তিটা নেই বলে বাংলাদেশ দল থেকে কেন উইলিয়ামসনের উদাহরণ দেওয়া হয়ে থাকে, যিনি স্কিল দিয়ে পাওয়ারের ঘাটতি পূরণ করে দেন। কিন্তু তাঁর নিউজিল্যান্ড দলে মার্টিন গাপটিল, ড্যারিল মিচেল, ডেভন কনওয়ের মতো পাওয়ার হিটারের ছড়াছাড়ি—সেটির উল্লেখ কেউ করেন না।

মোদ্দা কথা হলো, বাংলাদেশে টি-টোয়েন্টির পরিবেশই এখনো তৈরি হয়নি। ফ্র্যাঞ্চাইজি আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) হয় হওয়ার জন্য। টি-টোয়েন্টির আদর্শ উইকেট তৈরির পরিকল্পনা দেখা যায় না। যায় না কারণ, বিশেষ বিশেষ ক্রিকেটার কিংবা দলের সঙ্গে মানানসই উইকেট তৈরিতেই ব্যস্ত থাকেন মাঠকর্মীরা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উইকেট তৈরি হয় ধীরগতির। তাতে শট খেলার সাহসটাই তৈরি হয় ব্যাটারের মনে। আর স্পিন নির্ভরতার যে গালগল্প প্রচলিত দশক ধরে, সেসবই স্রেফ বাগাড়ম্বর।

একটা দলের সফলতম ব্যাটার এবং বোলার একজন অলরাউন্ডার। সাকিব আল হাসানের জন্য এটা অবশ্যই দারুণ গর্বের। তবে একটি দলের জন্য যা দুর্ভাবনারই। তাহলে বিশেষজ্ঞ ব্যাটার-বোলাররা কী করছেন?

উন্নতি করতে চাইলে এসব নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। এমন না যে বাংলাদেশ দল আকস্মিকভাবে খারাপ দলে পরিণত হয়েছে। এই বিশ্বকাপের চেয়ে ভালো খেলার সামর্থ্য মাহমুদ উল্লাহদের আছে। কিন্তু সর্বোচ্চ সেই সামর্থ্যও বিশ্বমঞ্চে চমকে দেওয়ার উপযুক্ত নয়। সংশ্লিষ্টরা এটা অনুধাবন করুন। এতে লজ্জার কিংবা হতোদ্যম হওয়ার কিছু নেই। পারি না মানে পারবই না নয়। পারি না যখন তখন নতুন করে শিখতে হবে—এই শপথ নিন। নয়তো বিশ্বকাপের পর বিশ্বকাপ শেষ হবে হারে হারে!

 

 



সাতদিনের সেরা