kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

বিশেষ সাক্ষাৎকার : মোহাম্মদ আশরাফুল’

দেখে মনে হয়েছে ওরা খুব ভয়ে ভয়ে খেলছে

৫ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে




দেখে মনে হয়েছে ওরা খুব ভয়ে ভয়ে খেলছে

মোহাম্মদ আশরাফুল। ফাইল ছবি

এত দিন তাঁরা আক্ষরিক অর্থেই থেকেছেন উৎসবের শহরে। কারণ দুবাইয়ে বাংলাদেশ দলের ঠিকানা যে ক্রাউন প্লাজা হোটেল, সেটির অবস্থান ফেস্টিভাল সিটির ভেতরই। সুপার টুয়েলভে সব ম্যাচ হারার বিষাদ নিয়ে ক্রিকেটাররা গতকাল যখন হোটেলে ফিরে আজ সকালের ফ্লাইট ধরার জন্য গোছগাছে ব্যস্ত, তখন মোহাম্মদ আশরাফুল ঢাকার মিরপুরের প্রিন্স হোটেলে। জাতীয় ক্রিকেট লিগের পরের ম্যাচ খেলার অপেক্ষায় থাকা এই সাবেক অধিনায়ক হোটেলরুমে বসেই দেখেছেন অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ হতে। সেখান থেকেই ফোনে কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্যর্থতার ময়নাতদন্ত করলেন ২০০৭ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২৭ বলে ৬১ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলা আশরাফুল। এই সংস্করণের বিশ্ব আসরের মূল পর্বে যা এখনো বাংলাদেশের একমাত্র জয় হয়েই আছে।

 

কালের কণ্ঠ : আরেকটি হতাশার বিশ্বকাপ শেষ হলো। এত বছর পরও মূল পর্বে ওই একটিই জয়, যেটি ২০০৭ সালে আপনার ব্যাটে আসা। এখনো কি ওই ইনিংস নিয়ে আলোচনায় গর্বিত হন নাকি বিব্রত হন? সেই জয়ের পরের ১৪ বছরে আর একটিও ম্যাচ জিতল না।

মোহাম্মদ আশরাফুল : বিব্রত নই, এখনো গর্বিতই হই। কারণ আমি অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপে গিয়েছিলাম সেবার। আবার তখন আমার ইনিংসটা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেরও দ্রুততম ফিফটি ছিল। তখন ভেবেছিলাম, এই সংস্করণে আমরা ভালো দলই হয়ে উঠব। কারণ আমাদের ব্যাটাররা মারতে পছন্দ করে। কিন্তু ১৪ বছর পার করে এসে দেখছি, কোনো উন্নতিই হয়নি আসলে। আমাদের সময়েও আমরা হয়তো ব্যর্থ হয়েছি, তবে ক্রিকেট খেলেছি ভয়ডরহীন। এখনকার ছেলেরা কেন ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলতে পারছে না, সেটি আমি বুঝতেই পারি না। এত উন্নত সুযোগ-সুবিধার পরও কেন পারছে না, এটি ভেবে আমার দুঃখই হয়।

 

প্রশ্ন : এমন বাজে পারফরম্যান্সের কারণ কী বলে মনে হয় আপনার?

আশরাফুল : প্রথম ম্যাচ থেকেই পুরো দল চাপে ডুবে থেকে খেলেছে বলে আমার মনে হয়েছে। দেখে মনে হয়েছে, ওরা খুব ভয়ে ভয়ে খেলেছে। বিশেষ করে ওমান ম্যাচে আমাদের খেলোয়াড়দের চেহারা টিভিতে দেখে আঁতকেও উঠেছি। মনে হচ্ছিল, ওরা ভয়ে একদম শেষ এবং নিজেদের গুটিয়ে ফেলেছে। আর জেতার পর থেকে সংবাদ সম্মেলনে আসা খেলোয়াড়রা যা যা বলেছে, আমি মনে করি তা-ও আরো ভালো পারফরম করার চাপে ফেলে দিয়েছিল পুরো দলকে।

 

প্রশ্ন : ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এসেও বাংলাদেশ দলের এই হাল কেন?

আশরাফুল : হ্যাঁ, ২০০৭-এর পর ৬ নম্বর বিশ্বকাপেও আমরা ওই একটি জয় নিয়েই আছি। তবে তাসকিনের কথার সঙ্গে আমি একমত। এবার যা খেলেছে, তার চেয়ে বাংলাদেশ অনেক ভালো দল অবশ্যই। যে যার নাম অনুযায়ী খেলতে পারেনি। কেন পারল না? আমি বলব আমাদের সব কিছুতেই সমস্যা ছিল।

প্রশ্ন : সব কিছুতেই?

আশরাফুল : হ্যাঁ, সব কিছুতেই। বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে আমরা এমন তিনটি দলের সঙ্গে খেললাম, যারা প্রতিটিই ছিল দুর্বল দল। জিম্বাবুয়ের কথা ধরুন। মুজারাবানি ছাড়া আর একজন ভালো বোলারও ওদের ছিল না। ব্যাটিংও জিম্বাবুয়ের খুব ভালো ছিল না। তবু একটু পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখুন। তিন ম্যাচেই ওরা পাওয়ার প্লেতে আমাদের বিপক্ষে ৬০ রানের ওপরে করেছে (তিন ম্যাচে ৫০, ৪৮ ও ৬৩)। অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডও অনেক দুর্বল ব্যাটিং লাইন নিয়ে এসেছিল। ওরা নামেই বড় ছিল; কিন্তু দল হিসেবে নয়। তাই বোলারদেরও আসল পরীক্ষা ওই দুই সিরিজে হয়নি।

 

প্রশ্ন : তাহলে বলতে চাচ্ছেন প্রস্তুতি পরিকল্পনা একদমই ঠিক ছিল না বাংলাদেশের?

আশরাফুল : বাইরে থেকে দেখে প্রস্তুতি ঠিক হয়েছে বলে আমার একদমই মনে হয়নি। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সিরিজ জিতেছি ঠিকই; কিন্তু রান করিনি কেউই। বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে দেখলাম প্রত্যেক খেলোয়াড়ই ব্যক্তিগত অনুশীলন করেছে টানা। মুশফিকও চট্টগ্রামে গিয়ে ‘এ’ দলের হয়ে এইচপির বিপক্ষে দুটো এক দিনের ম্যাচ খেলেছে। দুই ম্যাচে ৮০ পার করা ইনিংসও খেলেছে। কিন্তু আমি বলব ওই ম্যাচ দুটো খেলার দরকারই ছিল না। ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টির মেজাজ তো এক নয়।

 

প্রশ্ন : কী করা দরকার ছিল বলে মনে করেন?

আশরাফুল : মেনে নিলাম যে অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয় দরকার ছিল। কিন্তু জিতলেও আমাদের ব্যাটারদের কারো ফর্ম ছিল না। বোলারদেরও কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়নি। এগুলো আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বোঝা দরকার ছিল। বুঝলে সমাধানও বের হতো। বিকেএসপি হোক বা অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে নিজেদের মধ্যেই একদম ফ্ল্যাট উইকেটে তিন-চারটি ম্যাচ খেলালেও প্রস্তুতিটা হতো। ২০০ রান করার মতো উইকেটে খেলে গেলেও অভ্যাসটা হতো। তা না করে ওমানে গিয়ে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নেওয়ার ভাবনাটাই ভুল ছিল।

 

প্রশ্ন : বিপিএল আছে, এবার ডিপিএলও (ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ) টি-টোয়েন্টি সংস্করণে হলো। এরও কোনো সুবিধা পাওয়া গেল না?

আশরাফুল : দেখুন, বিপিএল করে আমাদের খুব লাভ হয় বলে মনে হয় না। এখানে প্রতিটি দলে চারজন করে বিদেশি খেলে। ওরাই বোলিং শুরু করে, ডেথ ওভারের চ্যালেঞ্জও ওদেরই দেওয়া হয়। আমাদের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন ছাড়া কেউই সঠিক জায়গায় ব্যাটিং করার সুযোগ পায় না। কঠিন পরিস্থিতিতে বোলিং করে নিজেকে তৈরি করার সুযোগও আমাদের অনেক বোলারই পায় না।

 

প্রশ্ন : সাকিব-মুস্তাফিজ এই সংস্করণের বিশ্ব তারকা। আইপিএল খেলার পর তাঁদের ক্লান্ত বলে মনে হলো কি?

আশরাফুল : হ্যাঁ, মুস্তাফিজকে দেখে আমার সত্যি সত্যিই মনে হয়েছে যে আইপিএল খেলে দুর্বল হয়ে গেছে। বোলিং করল; কিন্তু না দেখলাম কোনো গতি, না দেখলাম অন্য কোনো কিছু। খুবই ক্লান্ত মনে হয়েছে। আর নিষেধাজ্ঞা থেকে ফেরার পর এখনো সাকিব ব্যাটিংয়ের ছন্দ ধরতে পারেনি। অন্তত যে সাবলীল ব্যাটিং সে করত আগে, সেটি এখনো ‘মিসিং’।

 

প্রশ্ন : একাদশ গঠনের ভুলও কি এই ব্যর্থতায় বড় ভূমিকা রেখেছে?

আশরাফুল : চাইলে প্রতিটি ম্যাচেই একটা না একটা বড় ভুল ধরতে পারেন। শ্রীলঙ্কা ম্যাচের কথাই ধরুন। সাকিবের সঙ্গে খেলালাম নাসুমকে, অথচ ওদের ব্যাটিংয়ে বাঁহাতি ব্যাটারদের ছড়াছড়ি। দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে দারুণ সিমিং উইকেট দেখেও আমরা একজন পেস বোলার কম খেলালাম। আজকে আবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নাসুমকে খেলালাম না; কিন্তু দেখুন ওদের টপ অর্ডারে একজন ছাড়া সবাই ডানহাতি। আমি আসলে বুঝতেই পারিনি যে একাদশ কিভাবে হয়েছে!

 

প্রশ্ন : নতুন ভাবনার সময় হয়েছে কি না?

আশরাফুল : সিনিয়র ক্রিকেটারদের কাউকে কাউকে সরিয়ে দেওয়া বা অবসরে পাঠানোর কথা বলছেন তো? অনেকে হয়তো এ রকমই বলছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন, কাকে খেলাবেন? শামীম পাটোয়ারী? ব্যাটেই বল লাগাতে পারছে না। আফিফ? কাদের নিয়ে যাবেন? আমার কথা হলো, দলে জায়গা পাওয়ার জন্য পারফরম্যান্সই শেষ কথা। সেটি ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্স হলেও। সর্বশেষ ডিপিএলের পারফরম্যান্স দিয়ে আমরা খুব সহজেই বিশ্বকাপের জন্য রনি তালুকদার বা মিজানুর রহমানের কথা চিন্তা করতে পারতাম। মিজানুর ১১ ম্যাচে ৪৫০-এর মতো রান করেছে। অনেকে বলে আমাদের খেলোয়াড় নেই। এটা একদম ভুল কথা। অনেকে মনে করে লিটন বা সৌম্য ছাড়া খেলোয়াড় নেই। আমি তো দেখি আছে। আসলে আমরা বর্তমান ভুলে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে গিয়েই বিপদে পড়ছি। কেউ যদি দলে এসে দুই সিরিজও ভালো করে, তাকেও আমাদের নেওয়া উচিত। আমরা আগেই কারো কাছ থেকে ১০ বছরের সার্ভিস পাওয়ার কথা ভেবে ভুল করছি।

 



সাতদিনের সেরা