kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

ডলারের বাজার অস্থির

ব্যাংকে ৮৮ টাকা, খোলাবাজারে ৯১ টাকা

জিয়াদুল ইসলাম   

২৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ডলারের বাজার অস্থির

আন্ত ব্যাংক মুদ্রাবাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে ডলারের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা গেলেও বিপরীত চিত্র খোলাবাজারে। সরবরাহ ঘাটতির কারণে এই বাজারে পাগলা ঘোড়ার বেগে ছুটছে ডলারের দাম। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় এক টাকা। এখন খোলাবাজারে প্রতি ডলারের জন্য ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৯১ টাকা। একই কারণে ব্যাংকেও নগদ ডলারের দাম কিছুদিন ধরেই বাড়ছে। বর্তমানে ব্যাংকে নগদ ডলার বিক্রি হচ্ছে ৮৭ থেকে ৮৮ টাকার মধ্যে। তবে আন্ত ব্যাংকে মুদ্রাবাজারে (ব্যাংক টু ব্যাংক) গত এক সপ্তাহে ডলারের দাম নতুন করে বাড়েনি, আগের মতোই ৮৫ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে আন্ত ব্যাংকের সঙ্গে খোলাবাজারে ডলারের দামের ব্যবধান চার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে এই পার্থক্য দুই থেকে আড়াই টাকার মধ্যে থাকে।

সাধারণত ডলারের দাম বাড়লে রেমিটার ও রপ্তানিকারকরা লাভবান হন। আর ক্ষতিগ্রস্ত হন আমদানিকারক ও সাধারণ মানুষ। কারণ ডলারের দাম বাড়লে পণ্যের মূল্যও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এরই মধ্যে আমদানি করা অনেক পণ্যের দাম বেড়েও গেছে।

মানি চেঞ্জাররা বলছেন, অনেক বেশি লোক হঠাত্ দেশের বাইরে যাওয়ায় ডলারের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। সে তুলনায় পর্যটক ও যাত্রীদের মাধ্যমে হাতে হাতে দেশে ডলার আসছে না। ফলে দাম বেড়ে গেছে। হাতে হাতে ডলার দেশে না এলে এই ঊর্ধ্বগতি শিগগিরই থামবে না। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদা বাড়লেও ব্যাংকগুলোতে ডলারের কোনো সংকট নেই। বাজার স্বাভাবিক রাখতে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি অব্যাহত রাখা হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র  মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক হওয়ায় এখন আমদানি বেশ বাড়ছে। আবার বিলম্বে পরিশোধ শর্তে যেসব পণ্য আমদানি করা হয়েছিল, সেগুলোর এখন পেমেন্ট করতে হচ্ছে। করোনা ভ্যাকসিন আমদানির অর্থও পরিশোধ করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দামও বাড়ছে। তবে সংকট সামাল দিতে বাজারে প্রয়োজনীয় ডলার সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

জানা যায়, খোলাবাজারে ডলার সরবরাহের মূল উত্স বিদেশি পর্যটক ও অন্যান্য যাত্রী। তাদের মাধ্যমে হাতে হাতে দেশে ডলার আসে। গত বছরের মার্চে করোনার আঘাত আসার পর থেকেই বিদেশি পর্যটক ও যাত্রীদের আসা-যাওয়া সীমিত হয়ে যাওয়ায় এই বাজারে নগদ ডলারের সরবরাহ তুলনামূলক কম ছিল। এখন করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় খুলে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন দেশের সীমান্ত। বহুজাতিক সংস্থাগুলোও অনেক রুটে তাদের বিমান চলাচল শুরু করেছে। ফলে পেশাগত কাজ, শিক্ষা, চিকিত্সা, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে দেশের বাইরে মানুষের যাতায়াত বাড়ছে। এতে পাসপোর্ট এন্ডোর্সমেন্টে খোলাবাজারে ডলারের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। কারণ ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে গেলে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু খোলাবাজার থেকে সহজেই ডলার কেনা যায়। এ ছাড়া আন্ত ব্যাংক মুদ্রাবাজারেও ডলারের সংকট থাকায় খুচরা ডলার বিক্রি করছে না অনেক ব্যাংক। ফলে খুচরা ডলারের জন্য খোলাবাজারেই মানুষ ভিড় করছে।

কয়েকটি মানি এক্সচেঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল সোমবার খোলাবাজারে প্রতি ডলার ৯০ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৯০ টাকা ৯০ পয়সা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। আগের কার্যদিবস রবিবার বিক্রি হয় ৮৯ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ৯০ টাকা ২০ পয়সায়। এক সপ্তাহ আগে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৯ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৮৯ টাকা ৯০ পয়সা। ফলে এক সপ্তাহের ব্যবধানেই খোলাবাজারে প্রতি ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় এক টাকা।

রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত পাইওনিয়ার মানি চেঞ্জারের চেয়ারম্যান মো. রোকন সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় যাত্রীদের আসা-যাওয়া বেড়েছে। তবে মানুষের আসার চেয়ে যাওয়ার সংখ্যাই বেশি। চিকিত্সাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ দেশের বাইরে বেশি যাচ্ছে। ফলে আমাদের কাছে ডলার আসছে কম, কিন্তু চাহিদা বেশি হচ্ছে। এতে দামও বাড়ছে।’ দিলকুশায় অবস্থিত আরেকজন মানি চেঞ্জার ব্যবসায়ী মো. ইকবাল কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় চিকিত্সা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে দেশের বাইরে যাচ্ছে মানুষ। এতে খোলাবাজারে ডলারের চাহিদা প্রচুর বেড়েছে, কিন্তু ডলার সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। এর ফলে প্রতিদিনই দাম বাড়ছে।

খোলাবাজারে ২৩ বছর ধরে ডলার কেনাবেচার ব্যবসা করছেন উল্লেখ করে রোকন সিদ্দিকী জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে ডলারের এটি সর্বোচ্চ দাম। এর আগে কখনো ৯০ টাকায় ডলারের দাম ওঠেনি।

করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পর থেকে দেশে অস্বাভাবিক গতিতে বাড়ছে বিভিন্ন পণ্যের আমদানি। মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি তেল—সব পণ্যের আমদানিই এখন বেশ ঊর্ধ্বমুখী। ফলে আমদানিতেও ডলারের চাহিদা বেশ বেড়েছে। কিন্তু ব্যাংকের কাছে ডলার আসার উত্স রেমিট্যান্স গত জুন থেকে টানা কমছে। একই সময়ে ধীরগতিতে বাড়ছে রপ্তানি আয়। অর্থাত্ রপ্তানি আয়ে ধীরগতি এবং প্রবাসী আয়ের নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক গতিতে বাড়ায় ডলারের কিছুটা সংকট তৈরি হয়েছে আন্ত ব্যাংক মুদ্রাবাজারেও। এতে গত আগস্ট থেকে আন্ত ব্যাংক মুদ্রাবাজারেও ডলারের দাম বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ৫ আগস্ট আন্ত ব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় বিক্রি হয়, যা বাড়তে বাড়তে গত ১৭ অক্টোবর ওঠে ৮৫ টাকা ৬৫ পয়সায়। এর মানে গত আড়াই মাসের ব্যবধানে আন্ত ব্যাংকে ডলারের বিপরীতে টাকা ৮৫ পয়সা দর হারিয়েছে। তবে এরপর টানা এক সপ্তাহ নতুন করে আন্ত ব্যাংকে ডলারের দাম বাড়েনি। এ কারণে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে বাজারে ডলার বিক্রি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ১৩ দিনে বিক্রি করা হয় প্রায় ৩৫ কোটি ডলার। এটি সেপ্টেম্বর মাসের পুরো সময়ের চেয়ে চার কোটি ডলার বেশি। সেপ্টেম্বর মাসে বিক্রি করা হয় মাত্র ৩০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। তবে আগস্ট মাসে রেকর্ড ৬৪ কোটি ১০ লাখ ডলার বিক্রি করা হয়। সব মিলিয়ে গত আগস্ট থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১২৯ কোটি ডলার বিক্রি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. হাবিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় বিভিন্ন প্রয়োজনে দেশের বাইরে মানুষের যাতায়াত বাড়ায় হঠাত্ নগদ ডলারের চাহিদা বেড়েছে। ব্যাংকেও নগদ ডলার বিক্রি করা হয়, কিন্তু মানুষজন ব্যাংকে না এসে খোলাবাজারেই বেশি যাচ্ছে। এতে ওই বাজারে বেশি চাহিদা তৈরি হওয়ায় দাম একটু বেশি বেড়েছে। তবে ব্যাংকে এখনো নগদ ডলার ৮৬ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, আমদানিতে ডলারের চাহিদা বাড়লেও ব্যাংকে ডলারের কোনো সংকট নেই। ব্যাংকগুলোর চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করছে। 

 

 



সাতদিনের সেরা