kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

ইতিহাস বদলাল পাকিস্তান

রাহেনুর ইসলাম   

২৫ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইতিহাস বদলাল পাকিস্তান

পাকিস্তানের ঐতিহাসিক জয়ের পর মোহাম্মদ রিজওয়ানকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন ভারতের অধিনায়ক বিরাট কোহলি। ছবি : এএফপি

বিশ্বকাপে এলেই চেপে ধরে ‘সিন্দাবাদের ভূত’। দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে ভারতের কাছে পাকিস্তানের ১২ হারের আর ব্যাখ্যা কী? ওয়ানডে বিশ্বকাপে ৭-০ আর টি-টোয়েন্টিতে ভারতের জয় ৫-০। ইতিহাসটা বদলাল মরু শহর শারজায়। গতকাল রবিবার বিরাট কোহলির দলকে ১০ উইকেটে হারিয়ে বেদনার গল্পটা বদলে দিল পাকিস্তান। কোহলি দ্যুতিতে গড়া ভারতের ১৫১ রানের চ্যালেঞ্জ ১৩ বল হাতে রেখে পেরিয়ে যায় ২০০৯ সালের চ্যাম্পিয়নরা। জেদি পাকিস্তানিদের দাপটে আসলে দুমড়েমুচড়েই গেছে ফেভারিট ভারত। টি-টোয়েন্টিতে ১০ উইকেটে এটাই প্রথম হার ভারতের। পাকিস্তান আবার প্রথমবার স্বাদ পেল ১০ উইকেটে জেতার। মঞ্চটার জন্য বিশ্বকাপের চেয়ে বড় আর কী হতে পারে।

মোহাম্মদ সামির করা ১৮তম ওভারের পঞ্চম বলে নেওয়া দুই রানে জয় নিশ্চিতের পরই ভোঁ-দৌড় মোহাম্মদ রিজওয়ানের। থামার নাম নেই! এ যেন বুক থেকে পাথর নামার স্বস্তি। আর এটা শুধু চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপক্ষে প্রথম জয়ই নয়, নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের বার্তাও। ইমরান খান, জাভেদ মিয়াঁদাদ, ওয়াসিম আকরাম, ইনজামাম উল হকদের মতো কিংবদন্তিরা ফিরেছেন গ্লানি নিয়ে। বাবর আজম, শাহিন শাহ আফ্রিদিদের প্রজন্ম ভেঙে দিল ব্যর্থতার বৃত্ত। বুমরাহ, শামি, ভুবনেশ্বরের মতো বোলাররা কিনা একটাও উইকেট নিতে পারলেন না পাকিস্তানের। হারটা হজম হবে তো কোহলিদের?

ওয়াসিম আকরাম বিশ্বকাপ শুরুর আগেই বলেছেন, ‘কোহলি যেসব শৃঙ্গ জয় করেছে, সেখানে পৌঁছানো কঠিন নয় বাবরের।’ পূর্বসূরির কথাটা যে বাড়াবাড়ি নয়, বাবর প্রমাণ করলেন আরো একবার। এমন চাপের ম্যাচে ঠাণ্ডা মাথায় যেন খুনই করলেন ভারতকে। মোহাম্মদ রিজওয়ানের সঙ্গে ওপেন করতে নেমে মাঠ ছাড়লেন ম্যাচটা জিতিয়ে। উদ্বোধনী জুটিতে দুজন ১৫২ রানে অবিচ্ছিন্ন থেকে গুঁড়িয়েই দিয়েছেন ১৯৯২ বিশ্বকাপ থেকে চলা ভারতের রাজত্ব। বাবর আজম ৫২ বলে ৬ বাউন্ডারি ২ ছক্কায় ৬৮* আর রিজওয়ান ৫৫ বলে ৬ বাউন্ডারি ৩ ছক্কায় করেন ৭৮* রান। দুজনের ব্যাটিংয়েই কখনো ছিল শিল্পীর তুলির ছোঁয়া, কখনো আগ্রাসন তো কখনো গণিতজ্ঞের মতো এগিয়ে চলার দর্শন। ইতিহাসটা বদলেছে তাতেই। ৩ উইকেট নিয়ে আসল কাজটা আগেই করে রেখেছিলেন পেসার শাহিন শাহ আফ্রিদি। ম্যাচসেরার পুরস্কারটা তাঁরই।

ভারতের কোহলি, রোহিত, রাহুল, জাদেজা, পান্ডের মতো তারকা থাকলেও পাকিস্তান ভয়ে কুঁকড়ে ছিল না। নিয়ন্ত্রিত ও সাহসী বোলিং করেছে শুরু থেকে। তাই শারজায় মরু ঝড় ওঠেনি পাওয়ার প্লেতে। প্রথম ৬ ওভারে ৩ উইকেটে ভারতের রান মাত্র ৩৬। শাহিন শাহ আফ্রিদি প্রথম ওভারে ফেরান রোহিত শর্মাকে। ইয়র্কার লেন্থের বলটা মিডল স্টাম্প বরাবর পেছনের পায়ে লাগলে এলবিডাব্লিউ রোহিত। রিভিউ নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেননি তিনি। ‘গোল্ডেন ডাক’ পাওয়া রোহিতের মতো ব্যর্থ অন্য ওপেনার লোকেশ রাহুলও। ৮ বলে ৩ করে আফ্রিদির আগুনে বলে বোল্ড তিনি। সময়ের অন্যতম সেরা এই পেসারের সামনে তখন অসহায় ভারত। শুরুতেই তাঁর ২ উইকেট ছিল যেন বুর্জ খলিফার দুটি তলা ধসিয়ে দেওয়া!

আইপিএলজুড়ে রানের ফোয়ারা ছুটিয়েছিলেন সূর্যকুমার যাদব। মুগ্ধ হয়ে ওয়াসিম আকরাম পর্যন্ত তাঁকেই ‘এক্স ফ্যাক্টর’ বলেন ভারতের। কিন্তু চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান ম্যাচের অন্তত চাপটা নিতে পারেননি তিনি। হাসান আলীর বলে ১১ রান করা সূর্যকুমারের ক্যাচটা উইকেটের পেছনে বাজপাখির মতোই ঝাঁপিয়ে তালুবন্দি করেন মোহাম্মদ রিজওয়ান। পাওয়ার প্লেতে ৩ উইকেট হারিয়েও রানের চাকাটা সচল রাখেন বিরাট কোহলি ও ঋষব পান্ট। চতুর্থ উইকেটে দুজনের ৫৩ রানের জুটি ম্যাচে ফেরায় ভারতকে। ৩০ বলে ৩৯ করা পান্টকে ফিরিয়ে জুটিটা ভাঙেন শাদাব খান। সুইপ করতে গিয়ে আকাশে বল তুলে দিয়েছিলেন পান্ট। নিজের বলে অনেকখানি দৌড়ে নিজেই ক্যাচটা নেন এই লেগ স্পিনার।

বিরাট কোহলি অন্য প্রান্তে তখনো অবিচল। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে আর দশটা খেলার মতোই নিয়ে স্বাভাবিক থাকতে চেয়েছিলেন ভারতীয় অধিনায়ক। সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যাটার বলেই কোহলির পক্ষে সম্ভব হয়েছে ইনিংস টেনে নেওয়াটা। পাকিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপে তাঁর আগের তিনটি ইনিংস ৭৮*, ৩৬* ও ৫৫*। মানে তিন বিশ্বকাপে পাকিস্তানি বোলাররা আউটই করতে পারেননি কোহলিকে। গতকাল অবশ্য তাঁকে ফেরান শাহিন শাহ আফ্রিদি। ১৯তম ওভারের চতুর্থ বলে করা স্লোয়ার বাউন্সার পুল করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে মোহাম্মদ রিজওয়ানকে ক্যাচ দেন ভারতীয় অধিনায়ক। তাঁর ৪৯ বলে ৫ বাউন্ডারি ১ ছক্কায় করা ৫৭ রানে ভর করে ভারত পায় ৭ উইকেটে ১৫১ রানের পুঁজি।

চোটের জন্য অনিশ্চিত ছিল হার্দিক পান্ডের বল করা। ব্যাটিংয়ে ছয় নম্বরে বিকল্প না থাকায় একাদশে জায়গা পান তিনি। তবু হার্দিকের আগে ৬-এ পাঠানো হয় রবীন্দ্র জাদেজাকে। হাসান আলীর স্লোয়ার উড়িয়ে মারতে গিয়ে ডিপ মিড উইকেটে মোহাম্মদ নওয়াজকে ক্যাচ দেন ১৩ বলে ১৩ করা এই বাঁহাতি। সাতে নেমে ৮ বলে ১১ রানে আউট পান্ডে। ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বোলিংয়ে আফ্রিদি ৩১ রানে নেন ৩ উইকেট। ৪৪ রানে ২ উইকেট হাসান আলীর। নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে ৪ ওভারে ২২ রানে ১ উইকেট শাদাব খানের। অন্য পেসার হারিস রউফ ২৫ রানে নিয়েছেন ১ উইকেট।

মুখোমুখি লড়াইয়ে টেস্ট বা ওয়ানডেতে ভারতকে বেশিবার হারানোর কীর্তি পাকিস্তানের। টেস্টে পাকিস্তান এগিয়ে ১২-৯ আর ওয়ানডেতে ৭৩-৫৫ ব্যবধানে। শুধু বিশ্বকাপেই এত দিন ভারত এগিয়ে ছিল ১২-০-তে। দুর্ভেদ্য হয়ে ওঠা সেই দুর্গ এত দিনে ধসিয়ে দিল পাকিস্তান।

 



সাতদিনের সেরা