kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

মাগুরায় ৪ খুন

গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সঙ্গে রাজনীতিও আছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সঙ্গে রাজনীতিও আছে

মাগুরায় চার খুনের পেছনে মূল অভিযোগের তীর জগদল ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম ও তাঁর অনুসারী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। নৃশংস ওই ঘটনায় তাঁদের পক্ষের একজন ও স্থানীয় মোল্লা পরিবারের তিনজন খুন হন। রাজনীতিকরা একে গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের জের বললেও স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা বলছেন এর সঙ্গে রাজনীতির সংশ্রব আছে।

আসন্ন ইউপি নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়ে শুধু ইউনিয়ন পর্যায়ে নয়, জেলা আওয়ামী লীগেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এর জের ধরে জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল ফাত্তাহ মিয়া গত ১১ অক্টোবর পদত্যাগ করেছেন।

গত ১৫ অক্টোবর নিহতদের মধ্যে তিনজনের পরিবারের সদস্যরা কালের কণ্ঠের কাছে অভিযোগ করেন, জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রভাবশালী নেতারাই রফিকুল ইসলাম ও নজরুল ইসলামকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন। এই দুজন পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছেন জেলা কার ও মাইক্রোবাস মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি আশরাফুজ্জামানের কাছ থেকেও। মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাও কালের কণ্ঠকে একই কথা বলেছেন।

দলীয় ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, মাগুরা সদরের জগদল ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম একসময় আশরাফুজ্জামানের মালিকানাধীন একটি ইটভাটার ব্যবস্থাপক ছিলেন। বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন দল থেকে লোক এনে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন রফিকুল। এরই অংশ হিসেবে তিনি ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য প্রার্থী নজরুল ইসলামকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন। নজরুল একসময় ইউনিয়ন বিএনপির নেতা ছিলেন।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ইউপি সদস্য প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের কর্মী সৈয়দ আলী হাসান। স্থানীয় সবুর মোল্লার পরিবার আলী হাসানকে সমর্থন দেয়। এ নিয়ে রফিকুল ও নজরুলের সঙ্গে তাদের বিরোধ চরমে ওঠে। এর আগেও বিভিন্ন সময় এই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ ছিল। নির্বাচন সামনে রেখে এই বিরোধ সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে নজরুলের সমর্থক ইমরান মোল্লা এবং বিরোধীপক্ষের সবুর মোল্লা, কবির মোল্লা ও রহমান মোল্লা খুন হন। ২০০৩ সালেও নজরুল ও তাঁর সমর্থকদের হামলায় মোল্লা পরিবারের দুই সদস্য মারা যান।

জানতে চাইলে নিহত সবুর মোল্লার ভাতিজা মাহফুজ মোল্লা বলেন, ‘২০০৩ সালের ১২ এপ্রিল এই নজরুল ও তাঁর বাবা মাছেম মোল্লাসহ অন্যরা আমার বাবা জরিপ মোল্লাকে কুপিয়ে হত্যা করেন। একই বছর নজরুলের হামলায় মারা যান কুদ্দুছ মোল্লা। এই ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে নজরুল নিজের দলের এক বৃদ্ধাকে হত্যা করে তার দায় চাপান সবুর মোল্লাদের ওপর। দায়ের হয় মামলা-পাল্টা মামলা। পরে সালিসি বৈঠকে ওই খুনের মামলার সমাধান হয়। এবারও একই কৌশল নিয়েছেন নজরুল। নিজের পক্ষের ইমরান নামের একজনকে হত্যা করে সেই দায় আমাদের ওপরে চাপানোর চেষ্টা করছেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জগদল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নজরুল ও সৈয়দ আলী উভয়ই আমার লোক। আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পর সবাইকে নিয়ে শান্তির পরিবেশ বজায় রেখেছি। কিন্তু গোষ্ঠীভিত্তিক পুরনো দ্বন্দ্বের জেরে শুক্রবার এই খুনের ঘটনা ঘটেছে। এখানে আমার সম্পৃক্ততা নেই। সামনে নির্বাচনে আমি প্রার্থী হওয়ায় আমার প্রতিপক্ষরা নানা কুৎসা রটাচ্ছে।’

রফিকুলকে প্রশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আশরাফুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রফিকুল ইসলাম ১৫ বছর আগে আমার ইটভাটায় ছিল। এরপর তো সে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছে। সে তার মতো করে রাজনীতি করছে। আমি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, সে কারণে আমার সঙ্গে তার যোগাযোগ। কিন্তু তাকে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমার কোনো ভূমিকা নেই। আমার নিজেরই তো দলে তেমন কোনো পদ-পদবি নেই। আসলে চারজনের হত্যাকাণ্ডের পরে কিছু লোক এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে।’

মনোনয়ন দ্বন্দ্বে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির পদত্যাগ : ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দ্বন্দ্বে মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল ফাত্তাহ মিয়া পদত্যাগ করেছেন। তিনি গত ১১ অক্টোবর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ কুমার কুণ্ডুর কাছে এ পদত্যাগপত্র জমা দেন। জানতে চাইল আব্দুল ফাত্তাহ মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছি, আওয়ামী লীগ থেকে নয়। আসলে বয়স হয়ে গেছে, সংগঠনের জন্য সময় দিতে পারছিলাম না। সে জন্য পদত্যাগ করেছি।’

পদত্যাগের পেছনে ব্যক্তিগত কারণের কথা বললেও মূলত দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীর তালিকা তৈরি নিয়ে দ্বন্দ্বই মূল বলে জানিয়েছেন মাগুরা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের একজন নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন যাঁরা জেলার রাজনীতিতে প্রভাব খাটাচ্ছেন তাঁদের বাবাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন ফাত্তাহ মিয়া। মনোনয়ন তালিকা তৈরির সময় উনাকে অনেক চাপে ফেলা হয়। তৃণমূল থেকে আসা অনেক নাম বাদ দিতে বাধ্য করা হয়। এসব নিয়ে মনঃক্ষুণ্ন হয়েই পদত্যাগ করেছেন ফাত্তাহ মিয়া।

জানতে চাইলে খুলনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন জেলার সাধারণ সম্পাদকের কাছে। এটা আমাদের কাছে এখনো আসেনি। অনেক সময় মান-অভিমান থেকে পদত্যাগ করে থাকেন, পরে আবার তা ঠিকও হয়ে যায়। এমনও হতে পারে, পদত্যাগপত্র আমাদের কাছে আসার আগেই উনি সেটা প্রত্যাহার করে নেবেন। আগামী ২৩ অক্টোবর মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় আমরা যাব। তার আগেই বিষয়টির সমাধান হতে পারে।’



সাতদিনের সেরা