kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

কুমিল্লার ঘটনার জের

প্রতিবাদ, বিক্ষোভ বিভিন্ন স্থানে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রতিবাদ, বিক্ষোভ বিভিন্ন স্থানে

দেশের কয়েকটি এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে বিক্ষোভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ইসকনভক্তরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়, বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সোমবার ঢাকাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে অংশ নিয়ে হামলায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং ইসকনের (আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ) সদস্যরাও দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।

সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের কয়েক শ শিক্ষার্থী। তাঁদের সঙ্গে ইসকন স্বামীবাগ আশ্রমের ভক্তরাও সংহতি জানান। তিন ঘণ্টারও বেশি সময় অবরোধ শেষে দুপুর সোয়া ২টার দিকে সাত দফা দাবি মানতে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে শাহবাগ ত্যাগ করেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের এই অবরোধের কারণে শাহবাগ দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পল্টন, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, বাংলামোটর ও টিএসসিমুখী সড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়।

বিক্ষোভকারীদের সাত দফা দাবি হলো সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার মন্দিরগুলোর সংস্কারের ব্যবস্থা করা; রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিকাণ্ড ও লুটপাটের ক্ষতিপূরণ দেওয়া; হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা; জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে মন্দির ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়া; সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় ও কমিশন গঠন করা; হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের আধুনিকায়ন করে ফাউন্ডেশনে উন্নীত করা এবং জাতীয় বাজেটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য ১৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল সংসদের সাহিত্য সম্পাদক ও আন্দোলনের সমন্বয়ক জয়জিৎ দত্ত সাত দফা দাবি ঘোষণা করে বলেন, ‘আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের এই দাবিগুলো মানতে হবে। যদি না মানা হয় অথবা সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করেন, তাহলে আগামীকাল বিকেলে আরো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করাসহ তিন দফা দাবিতে মানববন্ধন করেছে। দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশের পাদদেশে এই মানববন্ধন হয়।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন করেন। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশ যে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নিয়েছে, সেই নৈতিক অবস্থান আজ হুমকির মুখে। প্রতিনিয়ত ধর্মকে ব্যবহার করে দেশে একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলা যে বিভাজনের সৃষ্টি করেছে, তা ইসলাম ধর্মকে অবমাননার চক্রান্ত। বিকেলে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘দেশে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে তা অকল্পনীয়।’ তাঁরা বলেন, পাকিস্তানি প্রেতাত্মারা এখনো বাংলাদেশে সক্রিয়। তারা সরকারে সক্রিয়, দলে সক্রিয়, প্রশাসনে সক্রিয়, এমনকি পুলিশ প্রশাসনেও। ইসকন সিলেট এ কর্মসূচির আয়োজন করে। এতে হাজারো মানুষ অংশ নেয়।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের জয় বাংলা চত্বরে ‘সম্প্রীতির পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ ব্যানারে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মানববন্ধন হয়। এতে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অতি দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।

দুপুরে গোপালগঞ্জে শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়ায় সড়কে ঘটনার প্রতিবাদ ও জড়িতদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

ঘটনার প্রতিবাদ এবং জড়িতদের শাস্তির দাবিতে কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয় পূজা উদযাপন কমিটির উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

চট্টগ্রামে বিকেলে সর্বস্তরের সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নাগরিক সমাজ চেরাগী পাহাড় মোড়ে এক বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশে সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম প্রত্যাহার করতে সরকারের প্রতি দাবি জানান আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ড. অনুপম সেন। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, কিন্তু এটা বঙ্গবন্ধুর দল নয়। দেশ এমন জায়গায়—সংবিধানে বাংলাদেশ আছে, পাকিস্তানও আছে। বঙ্গবন্ধু আছেন, জিন্নাহ সাহেবও আছেন। দলে অনেক মোশতাক। মুজিব কোট গায়ে দিয়ে পাকিস্তানি প্রেতাত্মার সঙ্গে মেলবন্ধন করে এ হামলাগুলো করা হয়েছে।’

সমাবেশে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করছে, তখন এই প্রতিবাদে দাঁড়াতে হচ্ছে। আজকের বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ নয়।

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আবুল মোমেন বলেন, লজ্জায় অধোবদন। যখনই সম্প্রীতি বিনষ্ট হবে, বুঝতে হবে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় দায়িত্ব পালন করেনি। আজ কোনো রাজনৈতিক দল মাঠে নামেনি। তিনি আরো বলেন, ‘১৯৪৭ থেকে হিন্দুদের ওপর বারবার হামলার প্রধান কারণ সম্পত্তি দখল। ঘটনার সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দল মিলেমিশে যায়। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সাম্প্রদায়িকতার যে বিষবাষ্প ঢুকে পড়েছে, তা এক দিনে সরানো যাবে না। মাদরাসার সিলেবাস বদলাতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থা উদার মানবিক বহুত্ববাদী করতে হবে। সমাজের পচন ঠেকাতে শেষবারের মতো বড় রকমের ধাক্কা দিতে হবে, যা হলো সামাজিক আন্দোলন।’

আবৃত্তিশিল্পী রাশেদ হাসানের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন খেলাঘর চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম, নারী নেত্রী নূরজাহান খান, সিপিবি জেলা সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইউনুচ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা কল্পনা লালা, নারী নেত্রী জেসমিন সুলতানা পারু, গণজাগরণ মঞ্চ চট্টগ্রামের সমন্বয়ক শরীফ চৌহান, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর চৌধুরী, প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার প্রমুখ।

কুমিল্লায় নগরীর টাউনহল মাঠে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে এবং সম্প্রীতির পক্ষে মহানগর আওয়ামী লীগের গণজমায়েত হয়।

রাজবাড়ী প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা এবং স্থানীয় ইসকন মন্দিরের পুরোহিতসহ অন্যরা। মানববন্ধন শেষে শহরের প্রধান সড়কে বিক্ষোভ হয়।

সাতক্ষীরায় সকাল ১১টায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাধা শ্যামসুন্দর মন্দির (ইসকন) সাতক্ষীরা শাখার আয়োজনে প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। গাইবান্ধায় বিক্ষোভ সমাবেশ করেন বাম গণতান্ত্রিক জোট ইসকন প্রচার কেন্দ্রের সদস্যরা। দিনাজপুরে প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে ইসকনের মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা)



সাতদিনের সেরা