kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

তবু তিনি সাকিব

সাইদুজ্জামান   

১৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তবু তিনি সাকিব

রাতে রুমে ঢোকার আগে শুনলাম সাকিব আল হাসান এসেছেন। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে ডাবলিনের হোটেল লবিতে দেখি ছিপছিপে এক তরুণ, খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। আরে, তিনি সাকিব আল হাসান!

২০১৯ সালের এপ্রিলে তাঁকে না চেনার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আইপিএল ব্যস্ততার কারণে বিলম্বে আয়ারল্যান্ডে দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া সাকিবকে সেদিন এক ঝলকে চেনা সত্যিই কঠিন ছিল। অবিশ্বাস্য বিবর্তন। বত্রিশের সেই সাকিবের লুক টিন এজারের। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের জার্সিতে মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। ম্যাচ ডে-র অখণ্ড অবসর তাই কাটিয়েছেন ফিটনেস ট্রেনিং করে, একেবারে মেদহীন সাকিব যেন বছর কুড়ির তরুণ।

পাশাপাশি চলেছিল স্কিল ট্রেনিংও। প্রিয় কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে ভারতে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ডাবলিনের হোটেলে বসেই বলেছিলেন, “একটা ‘কিক’ অনুভব করছি।” সেই ‘কিক’ আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের পর ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে দেখেছে গোটা বিশ্ব। আট ম্যাচে ১১ উইকেট ও ৮৬.৫৭ গড়ে গড়ে ৬০৬ রান করা সাকিব কেন টুর্নামেন্টসেরার পুরস্কারটা পেলেন না, প্রশ্ন ছিল ভিনদেশি সাংবাদিকদের মনেও।

গতকাল আরেকবার আইপিএল টু বাংলাদেশ যাত্রা করেছেন সাকিব আল হাসান। এবারের আইপিএলেও দলে পর্যাপ্ত কদর পেয়েছেন বলে মনে হয়নি। কভিড-পূর্ববর্তী অংশে শুরুর কয়েকটা ম্যাচের পরে তাঁকে বসিয়েই রেখেছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স। আমিরাতেও সুযোগ মিলেছে শেষ ভাগে। ফাইনাল বাদ দিলে বোলিংয়ে ভালো করেছেন সাকিব। কিন্তু একটি ম্যাচ ছাড়া কথা বলেনি এই বাঁহাতির ব্যাট। স্বভাবতই আইপিএলকে কেন্দ্র করে খুব বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়নি সাকিবের একনিষ্ঠ ভক্তকেও। বরং চেন্নাই সুপার কিংসের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে ব্যাটে-বলে তাঁর ব্যর্থতায় মুষড়ে পড়ে ভার্চুয়াল জগতে এ দেশের ক্রিকেট অনুসারীরা।

একজন ওয়ালে লিখেও ফেলে, ‘আইপিএলের ফাইনাল দেখে বোঝা যায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দলের (বাংলাদেশ) সম্ভাব্য পরিণতি!’ কিন্তু সাকিবকে নিয়ে বিভ্রমটা হয় এখানেই। ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যাবে বড় মঞ্চ, বড় দল এবং দুঃসময়ের মেঘে ঢাকা সাকিবের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সেবা পেয়ে এসেছে বাংলাদেশ দল।

বড় মঞ্চে সাকিবের সেরা নৈপুণ্য নিঃসন্দেহে ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ। তবে বিশ্বকাপের অভিষেক আসরে ভারতের বিপক্ষে অসাধারণ জয়ের ম্যাচেও কিন্তু ফিফটি ছিল কুড়ি বছর বয়সী সাকিবের। বাংলাদেশের ইতিহাসসেরা এই ক্রিকেটার ওয়ানডে বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ক্রিকেটার।

তবে এবারের টুর্নামেন্টটা টি-টোয়েন্টির। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ফরম্যাটের বিশ্ববাজারেও বাংলাদেশের সেরা প্রতিনিধি সাকিব আল হাসান। এই ফরম্যাটের সব বিশ্বকাপেই তিনি খেলেছেন। এবং যথারীতি বাংলাদেশের পক্ষে সবচেয়ে বেশি রান এবং উইকেট সাকিবের। সবচেয়ে বেশি রান এবং উইকেটের তালিকায় আলাদাভাবে চোখ রাখলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাবে, কিন্তু অলরাউন্ডার হিসেবে তাঁর ধারেকাছে কেউ নেই।

অবশ্য বহু আগেই থেকেই বড় মঞ্চের বড় খেলোয়াড় সাকিব। দুঃসময়ে আরো তুখোড় এই অলরাউন্ডার। শৃঙ্খলাজনিত কারণে নিষিদ্ধ সময় কাটিয়ে তাঁর সদর্পে প্রত্যাবর্তনের অনেক উদাহরণ আছে। আইসিসি প্রদত্ত এক বছরের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষে আবারও দলের সেরা খেলোয়াড়ের মুকুট ফিরে পেয়েছেন সাকিব।

তবে আরো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ দলের জার্সিতেই সবচেয়ে প্রভাবশালী পারফরমার সাকিব। এখন তিনি কোনো ফরম্যাটেই দলের অধিনায়ক নন। তবু দলের গেম প্ল্যানের সবচেয়ে বড় অংশটা তাঁকে ঘিরেই তৈরি হয়। এই গুরুত্ব সাকিবের মনে বাড়তি দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট।

সাকিব কতটা গুরুত্ব পেয়ে থাকেন দলে, তার ছোট্ট একটা নমুনা ২০১৯ বিশ্বকাপ। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের আগেই আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। তো, ডাবলিনে দলের সঙ্গে পরে যুক্ত হওয়া সাকিবকে আলাদা ডেকে কথা বলেছিলেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। দলে তাঁর অপরিসীম গুরুত্বের কথা বলেছিলেন তৎকালীন অধিনায়ক। পরেরটুকু তো ইতিহাস, অভাবিত ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের প্রদর্শনী!

নিশ্চিতভাবেই বলে দেওয়া যায়, বাংলাদেশ দলের বিশ্বকাপ পরিকল্পনা নিয়ে যোগাযোগের কোনো একটি মাধ্যমে সাকিবের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত ছিল টিম ম্যানেজমেন্টের। ওমানে দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর মাহমুদ উল্লাহও যদি শীর্ষ তারকার সঙ্গে ‘একান্ত বৈঠক’ করে থাকেন, তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই। একটা ব্যাপার তো পুরো দলই জানে, সাকিবের সম্পৃক্ততা জয়ের অন্যতম শর্ত। এই সম্পৃক্ততা শুধু তাঁর ব্যাট-বলে অবদানই নয়, অন্যদের অনুপ্রাণিত করার ব্যাপারও রয়েছে। অধিনায়ক না হয়েও ফিল্ডিংয়ে তৎপরতা, অধিনায়কের সঙ্গে ঘন ঘন পরামর্শ করা কিংবা বোলারকে উজ্জীবিত করতে যেসব দিনে দেখা যায় সাকিবকে, সেসব দিনে ভালো কিছুর আশা করায় ঝুঁকি কম থাকে।

তাই আইপিএল পারফরম্যান্স দিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের জার্সিতে সাকিব আল হাসানকে অনুমান করলে ভুল হবে। বরং কেন যেন মনে হচ্ছে, ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপ-পূর্ব পরিস্থিতির মতো কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে এখন দাঁড়িয়ে তিনি। সাকিবদের কাছে হার-জিত ছাপিয়ে আরেকটি তাড়না থাকে, ব্যক্তি ইমেজ। ওটা মাটিতে গড়াগড়ি খেতে দেওয়ার অবস্থায় নেই ৩৪ বছর বয়সী সাকিব আল হাসান, বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘পোস্টার বয়’!



সাতদিনের সেরা