kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

ই-কমার্স প্রতারণা দমনে ব্যর্থতা আইনের নয়, প্রয়োগের

ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট

৮ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ই-কমার্স প্রতারণা দমনে ব্যর্থতা আইনের নয়, প্রয়োগের

তানজীব উল আলম

ইভ্যালিসহ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এই তালিকায় নতুন নতুন কম্পানির নাম যোগ হচ্ছে। এ অবস্থায় গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নতুন আইন করার আলোচনা চলছে। এসব বিষয়ে নিজের মতামত দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাসুদ রুমী

 

কালের কণ্ঠ : ই-কমার্স খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

তানজীব উল আলম : সাম্প্রতিক সময়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে তা থেকে উত্তরণের প্রাথমিক পর্যায়ে আছে দেশের ই-কমার্স খাত। এই অবস্থায় আইন নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশে ই-কমার্সের জন্য যদিও আলাদা কোনো আইন করা হয়নি, কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অন্য যেসব আইন আছে সেগুলো ই-কমার্সের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য। তাই এটা বলার কারণ নেই যে ই-কমার্স যখন শুরু হয় তখন একে রেগুলেট করার জন্য আইন ছিল না। এখন নতুন আইন করার কথা যত বলা হবে ততই মনে হবে, আমরা স্বীকার করে নিচ্ছি, প্রচলিত আইনে এদের ধরা যাবে না। মোদ্দা কথা, আমরা যে অবস্থার মধ্যে পড়েছি, তা আইনের অভাবের কারণে হয়নি। আমি মনে করি, আইনের যথাযথ এবং সময়মতো প্রয়োগ না করার কারণে এই ঘটনা ঘটেছে। 

 

কালের কণ্ঠ : উদীয়মান ই-কমার্স খাত কেন বারবার হোঁচট খাচ্ছে? এর কারণ কি রেগুলেটরি ব্যর্থতা?

তানজীব উল আলম : অবশ্যই রেগুলেটরি ব্যর্থতা আছে। শুধু ই-কমার্স নয়, যেকোনো ধরনের ব্যাবসায়িক কার্যক্রমের জন্য বিভিন্ন ধরনের লেনদেনের ইস্যু থাকে। দেশে লেনদেন সম্পর্কিত আইন আছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, কিংবা লেনদেন সম্পর্কিত তদারকি সংস্থা, তাদের উভয় পক্ষেরই ব্যর্থতা আছে। আমরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে সতর্ক করে আসছি। বারবার বলেছি, পদক্ষেপ না নিলে এটা আরো ভয়াবহ হবে। দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো সময়মতো পদক্ষেপ নেয়নি বলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন কোনো সংস্থা যদি বলে, এটা আমাদের দায়িত্ব ছিল না, তাহলে বুঝতে হবে যে তাদের নিজেদের মধ্যেই সমন্বয়ের অভাব ছিল। কিংবা তারা এই বিষয়টি কত ভয়াবহ হতে পারে, তার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেনি। অথবা বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির হস্তক্ষেপের কারণে রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারেনি।

 

কালের কণ্ঠ : বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল কমার্স সেল ই-কমার্স খাত তদারকি করছে। একটি আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠনের কথাও বলা হচ্ছে। আসলে কী করা উচিত?

তানজীব উল আলম : দায়িত্বশীল যেসব সংস্থা আছে তারা যদি তাদের দায়িত্বটা সময়মতো এবং যথাযথভাবে পালন করে তাহলে কোনো নতুন অথরিটির দরকার নেই। নতুন অথরিটি তৈরি করতে গেলে বাকি রেগুলেটরি অথরিটিগুলোর কর্তৃত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে তদারকির কর্তৃত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের আছে। আমরা যদি আলাদা একটি কর্তৃপক্ষ করে দিই তাহলে তার দায়িত্ব হবে ওই ব্যাংকিং লেনদেনগুলো মনিটর করা। একই জিনিস মনিটরিংয়ের দায়িত্ব কেন আমরা আরেকটি সংস্থাকে দেব? যখন আমরা আরেকটি রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের দাবি করি, তখন সেই সংস্থার কাজ কী হবে, সে সম্পর্কে ধারণা দিয়ে তারপর বলা উচিত। তার চেয়ে বিদ্যমান সংস্থাগুলোকে আমরা লোকবল, দক্ষতা ও প্রযুক্তি দিয়ে আরো ক্ষমতায়িত করতে পারি। পৃথক সংস্থাতেই যদি সমাধান সূত্র থাকত তাহলে অনেক দেশ তাই করত। অন্য দেশগুলো যদি বিদ্যমান অবকাঠামোর মাধ্যমে সফলভাবে পরিচালনা করতে পারে তাহলে আমরা কেন পারব না?

 

কালের কণ্ঠ : সরকারি সংস্থাগুলোর শিথিলতা ও সমন্বয়হীনতা রোধের পথ কী?

তানজীব উল আলম : ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা—এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে একই গতি দেখা যায়নি। ইভ্যালির বিরুদ্ধে পঞ্জি স্কিমের অভিযোগ সবার আগে উঠেছিল, কিন্তু সবার পরে ইভ্যালির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তারা বিভিন্নজনকে খুশি রাখার চেষ্টা করেছে। সেটি বিজ্ঞাপন দিয়ে কিংবা ডোনেশন, স্পন্সরশিপ দিয়ে। তারা প্রভাবশালীদের পক্ষে রেখে কর্মকাণ্ড আরো বিস্তৃত করেছে। এতে সাধারণ ভোক্তা প্রলুব্ধ হয়ে সর্বস্ব সঁপে দিয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : ক্রেতারাও তো লোভে পড়ে ঝুঁকি নিয়েছে। 

তানজীব উল আলম : সব পক্ষ এখানে সমানভাবে দায়ী। এর মধ্যে কাউকে আগে রাখতে হলে সেটা অবশ্যই গ্রাহক। পকেটের টাকাটা তো সেই স্বেচ্ছায় দিয়ে দিয়েছে। তাই গ্রাহকই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত।

 

কালের কণ্ঠ : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

তানজীব উল আলম : বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বাণিজ্য নিয়ে দেখাশোনা করার যে দায় সেটা তাদের আছে। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ই-কমার্সের কোনো রেগুলেটরি বডি নয়। তাদের ডিজিটাল কমার্স সেলের তাই আইনগত কর্তৃত্ব নেই। কোনো ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার এখতিয়ার তাদের নেই। কেউ কেউ মনে করছে, সরকারি ক্ষমতা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। ব্যাপারটা আসলে তা নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ধরনভেদে বিভিন্ন ধরনের রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন আইনের অধীনে আছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা আইনগত দিক থেকে এখানে খুবই সীমিত। এ ধরনের কর্মকাণ্ড মহীরুহ হয়ে ওঠার আগে অঙ্কুরেই বিনাশ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিআইএফইউকে (বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট) আরো আগেই তৎপর হওয়া উচিত ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক যে তদন্তটি করেছে, সেটা তারা নিজস্ব উদ্যোগে করেনি। তারা এটি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকেরই এএমএল গাইডলাইন জারি করা আছে। ওই গাইডলাইন অনুযায়ী, বাংলাদেশের যেকোনো ব্যাংক যখন কোনো একটি হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন দেখবে তখন তাদের দায়িত্ব হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিপোর্ট করা। বাংলাদেশ ব্যাংক তখন ওই হিসাবটি মনিটর করবে কোনো ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড হচ্ছে কি না। পুলিশসহ আরো কয়েকটি সংস্থাও অভিযুক্ত ই-কমার্স নিয়ে তদন্ত করেছে। কিন্তু সবাই ঘটনা জানার পরও অন্যের জন্য অপেক্ষা করেছে। পদক্ষেপ না নেওয়ার ক্ষেত্রে সবাই হয়তো ওপরের নির্দেশের জন্য বসে ছিল। তারা নিজস্ব বিবেচনায় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ওপর থেকেও কোনো নির্দেশনা আসেনি।

 

কালের কণ্ঠ : আপনি তথ্য-প্রযুক্তি খাতসহ বিভিন্ন আইন প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছেন। তথ্য-প্রযুক্তি ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ই-কমার্স খাত কতটা গুরুত্ব পেয়েছে?

তানজীব উল আলম : অনলাইনে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডকে দমন করার জন্য তথ্য-প্রযুক্তি আইন ও ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনই যথেষ্ট। আমাদের পেনাল কোডেও যথেষ্ট বিধান আছে। ই-কমার্স খাতে বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য বিভিন্ন ধরনের আইনের প্রয়োগ হয়। কেউ যদি এমন একটি অফার কিংবা বিজ্ঞাপন দেয়, যেটি প্রতিযোগিতাবিরোধী, তাহলে প্রতিযোগিতা আইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সেখানে যদি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকে তাহলে ই-কমার্সের অধীনে আলাদা আইন করে আপনি তো একই ব্যবস্থা নেবেন। এর চেয়ে প্রতিযোগিতা আইনটিই প্রয়োগ করেন। যদি সে অনলাইনে প্রতারণা করে তাহলে ৪২০, ৪০৬ ধারা তো আছেই। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনেও প্রতারণার বিধান আছে, সেটাও আপনি প্রয়োগ করছেন না।  

 

কালের কণ্ঠ : খাতটিতে শৃঙ্খলা আনতে স্বল্প মেয়াদে ও দীর্ঘ মেয়াদে কী করা দরকার?

তানজীব উল আলম : এখানে মূল সমাধান হলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো। প্রতিটি সংস্থা দুর্বল। তাদের কারো লোকবল নেই, কারোর জ্ঞান, দক্ষতাও খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের। তাদের আরো বেশি প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এই ধরনের ব্যবসার অপারেশনস সম্পর্কে ভালো প্রায়োগিক জ্ঞান থাকতে হবে, যাতে তারা বিজনেস মডেল দেখেই বুঝতে পারে, এটার উদ্দেশ্যটা কী। প্রতিটি ঘটনা আমাদের চোখের সামনে ঘটে গেছে, কিন্তু এর গভীরতা আমরা বুঝতে পারিনি, কিংবা বুঝলেও বিভিন্ন কারণে পদক্ষেপ নিতে পারিনি। ইভ্যালির মডেলে আরো অনেকে আসছে, কিন্তু বর্তমান আইনে তাদের তো ক্যাশ অন ডেলিভারি এবং এক্সকোর মাধ্যমে ব্যবসা করার কথা। তার মানে তারা আইন মানছে না। আইন থাকার পরও তা প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। যদি কোনো সংস্থা করতেই হয়, তাহলে উন্নত দেশের আদলে ‘সিরিয়াস ফ্রড অফিস’-এর মতো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীতে একটি সংস্থা গঠন করা যেতে পারে।

 



সাতদিনের সেরা