kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মামলা-হয়রানিতে ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের বাইকেই আগুন

আজ সারা দেশে রাইড শেয়ার চালকদের কর্মবিরতি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মামলা-হয়রানিতে ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের বাইকেই আগুন

করোনা মহামারি শুরু হওয়ার আগে শওকত আলম সোহেল ছিলেন ব্যবসায়ী। আয় ভালো হওয়ায় ছিল সুখের সংসার। তবে করোনার ছোবলে ধস নামে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে কেনেন একটি মোটরসাইকেল। রাইড শেয়ারিং অ্যাপস পাঠাওয়ের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন শুরু করেন সোহেল। নতুন জীবনযুদ্ধেও বারবার বাধা হয়ে আসে করোনার লকডাউন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পুলিশের কড়াকড়ি। কয়েক দফায় ট্রাফিক পুলিশ মামলা দেওয়ায় চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তিনি। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর বাড্ডা লিংক রোড এলাকায় সার্জেন্ট মামলা দিতে গেলে জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন মোটরসাইকেলটিতে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন সোহেল। বাইক আগুনে পোড়ানোর ভিডিও এক পথচারী ফেসবুকে শেয়ার করলে মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। মানুষ কতটা বিরক্তির পর্যায়ে পৌঁছলে এমন করতে পারে সে বিষয়েই বেশি মন্তব্য করছেন নেটিজেনরা।

এদিকে ঘটনার পর বাড্ডা থানার পুলিশ সোহেলকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ থাকায় উত্তেজিত হয়ে সোহেল নিজের বাইকে আগুন দেন। এ ঘটনায় আইনগত কারো কোনো দায়দায়িত্ব আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সোহেলকে হয়রানি করা হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

অন্যদিকে মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়ার ঘটনাকে মর্মান্তিক উল্লেখ করে পুলিশি হয়রানি বন্ধসহ ছয় দফা দাবিতে আজ মঙ্গলবার কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে অ্যাপ-বেইজড ড্রাইভারস ইউনিয়ন অব বাংলাদেশ (ডিআরডিইউ)।

গতকাল আলোচিত বাইক রাইডার সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোহেলের বাড়ি কেরানীগঞ্জে। করোনা সংক্রমণ শুরুর আগে তিনি স্যানিটারি সামগ্রীর ব্যবসা করতেন। এতে তাঁর লোকসান হয়। জীবিকা নির্বাহে তিনি দুই মাস ধরে বাইকে যাত্রী পরিবহন করছেন। নিজের জীবিকা নিয়ে তিনি চরম হতাশার মধ্যে পড়েন।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, বাইকে আগুন দিয়ে সোহেল উদভ্রান্তের মতো চিৎকার করছেন। প্রত্যক্ষদর্শী একজন পানি ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন। তখন সোহেল এসে তাঁকে বাধা দেন। বলেন, ‘কেউ যাবেন না, আপনারা কেউ যাবেন না।’ অন্য একজন সোহেলকে বলেন, ‘ভাই, মাথা ঠাণ্ডা করেন।’

বাড্ডা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু সাঈদ মিয়া বলেন, রাইডার সোহেল মোটরসাইকেল রং পার্ক করে আইন অমান্য করায় বাড্ডা লিংক রোড এলাকায় কর্তব্যরত সার্জেন্ট বাইকের কাগজ দেখতে চান। আইনগতভাবে এটা ওই সার্জেন্টের দায়িত্ব। কাগজ চেক করার সময় হুট করেই নিজের বাইকে আগুন ধরিয়ে দেন সোহেল। পরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়। সোহেল পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, তাঁর মোটরসাইকেলের কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও বারবার মামলা দিচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। চলতি মাসেও পল্টনে একবার মামলা দেওয়া হয়। তাই রাগে-ক্ষোভে বাইকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। পুলিশ পরিদর্শক আবু সাঈদ মিয়া বলেন, ‘সার্জেন্ট মামলা দেননি বলে জানতে পেরেছি। তবু সোহেল ও সার্জেন্টকে থানায় এনে বিষয়টি জানার চেষ্টা করা হয়। সোহেল নিজের ক্ষোভের কারণে এমনটা ঘটিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’

গুলশান ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি যেখানে ঘটেছে, সেখানে আগে থেকেই ট্রাফিক সদস্যদের বলা ছিল, কোনো মোটরসাইকেল সকালবেলা সেখানে দাঁড়াবে না। ঘটনাস্থলে রাইড শেয়ারিংয়ের একটি মোটরসাইকেল দাঁড়ালে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা তার কাছে কাগজপত্র দেখতে চান। কিন্তু মোটরসাইকেলচালক কাগজপত্র না দেখিয়ে উল্টো রেগে নিজের বাইকে নিজেই আগুন ধরিয়ে দেন।’

ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) ফারুক হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে সোহেল কিছুটা মানসিক সমস্যায় আছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় কারো কোনো আইনগত দায়দায়িত্ব আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে রাইড শেয়ার চালকদের কর্মবিরতির ব্যাপারে ডিআরডিইউয়ের সাধারণ সম্পাদক বেলাল আহমেদ বলেন, অনেকে ধার করে বাইক কিনে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। করোনার কারণে সবারই অবস্থা খারাপ। হয়রানির জন্য একজন চালক তাঁর মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। এ ধরনের ঘটনাও যদি পুলিশকে নাড়া না দেয়, তাহলে কি আত্মাহুতি দিলে তাদের বিবেক নাড়া দেবে? তিনি বলেন, ‘গাড়ি কোথাও ব্রেক করলে সেখানেই ধরে ফেলে ট্রাফিক পুলিশ। সরকার আমাদের জায়গা নির্ধারণ করে দিক। তাহলে আমরা যত্রতত্র দাঁড়াব না।’

তিনি জানান, বাইক রাইডারদের ছয় দফা দাবি হলো—অ্যাপসনির্ভর শ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি, কর্ম ও সময়ের মূল্য দেওয়া; সব ধরনের রাইডে কমিশন ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা, মিথ্যা অজুহাতে কর্মহীন করা থেকে বিরত থাকা;  ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে রাইড শেয়ারিংয়ের যানবাহন দাঁড়ানোর জায়গা করে দেওয়া; সব ধরনের পুলিশি হয়রানি বন্ধ করা; তালিকাভুক্ত রাইড শেয়ারকারী যানবাহনগুলোকে গণপরিবহনের আওতায় অ্যাডভান্সড ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) মুক্ত রাখা এবং গত বছর গ্রহণ করা সব এআইটি তালিকাভুক্ত যানবাহন মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া।

 



সাতদিনের সেরা