kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

১৬০ ইউপির নির্বাচন

আশঙ্কার মধ্যেও ভোট উৎসব

বিশেষ প্রতিনিধি   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আশঙ্কার মধ্যেও ভোট উৎসব

উৎসবমুখর পরিবেশে গতকাল ভোট দিতে আসেন ভোটাররা। কক্সবাজারের চকরিয়ার হালকাকারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। ছবি : কালের কণ্ঠ

বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতা, অনিয়ম ও বর্জনের মধ্য দিয়ে গতকাল সোমবার শেষ হয়েছে প্রথম ধাপের দ্বিতীয় দফার ১৬০ ইউনিয়ন পরিষদ এবং ৯ পৌরসভার ভোটগ্রহণ। ১৬০টি ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচনে ১৩১টিতে বিজয়ী হয়েছেন নৌকার প্রার্থীরা। বাকিগুলোতে বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। আর ৯টি পৌর মেয়র পদে তিনটিতে আগেই আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছেন। বাকি ছয়টির মধ্যে চারটিতে আওয়ামী লীগ এবং দুটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।   

অন্যদিকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এই নির্বাচনে তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কয়েকটি কেন্দ্রে গোলাগুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ। সহিংসতার আশঙ্কা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও ভোটারের উপস্থিতি ছিল বিপুল। তবে বৃষ্টির কারণে কিছু ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি আশানুরূপ ছিল না। খুলনায় এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। নোয়াখালীর হাতিয়ায় প্রার্থীর পক্ষে ব্যালট পেপারে সিল দিতে গিয়ে দুটি ভোটকেন্দ্রের চারজন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারসহ ছয়জন ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তা আটক হয়েছেন। গতকাল দুপুরে উপজেলার চরঈশ্বর  ইউনিয়নের ৬ নম্বর কেন্দ্রে এবং জাহাজমারা ইউনিয়নের ১৩ নম্বর কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। হাতিয়া উপজেলায় নৌকার দুই প্রার্থীসহ চারজন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।

গতকাল ভোট চলাকালে কক্সবাজারের মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন দুজন। এ ছাড়া ভোটের আগের রাতে মোংলায়  নির্বাচনী সংঘর্ষে একজন নিহত হন। এর আগে গত ২১ জুন প্রথম ধাপের প্রথম দফায় ২০৪টি ইউপি নির্বাচনে তিনজন নিহত হন।

সহিংসতা : কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া ও টেকনাফ উপজেলার ১৪টি ইউপির মধ্যে পাঁচটিতে নির্বাচনী সহিংস ঘটনা ঘটলেও অন্য সব ইউপিতে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া মহেশখালী ও চকরিয়া পৌরসভা নির্বাচনও হয়েছে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে।

বেশি সহিংস ঘটনা ঘটেছে কুতুবদিয়া দ্বীপ উপজেলার বড়ঘোপ ইউনিয়নের একটি এবং মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের দুটি ভোটকেন্দ্রে। গতকাল দুপুরে কুতুবদিয়া বড়ঘোপ ইউনিয়নের পিলেটকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবুল কালামের সমর্থকরা হৈ-হুল্লোড় করে কেন্দ্রে ঢুকে পড়েন।

এক পর্যায়ে তাঁরা ব্যালট পেপার ও সিল ছিনতাই করলে কেন্দ্রে কর্তব্যরত পুলিশ গুলি চালায়। এতে নৌকা প্রতীকের পোলিং এজেন্ট আবদুল হালিম (৪০) গুলিবিদ্ধ হয়ে কেন্দ্রের ভেতরেই নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হন আরো একজন পোলিং এজেন্টসহ চারজন।

সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার এবং কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জামশেদুল ইসলাম সিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনার বিষয়ে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার শাহাবুদ্দিন আমাকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালায়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।’ এ ঘটনায় আহত পোলিং এজেন্টসহ চারজন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া এ দ্বীপের আরো অন্তত তিনটি ভোটকেন্দ্রে সহিংস ঘটনা ঘটে। কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গতকাল বিকেল পর্যন্ত ৩২ জন আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া গতকাল সকালে মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের মহিউসসুন্নাহ দারুল উলুম দাখিল মাদরাসা ভোটকেন্দ্র দখলে নিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী শেখ কামাল ও বিদ্রোহী প্রার্থী মোশাররফ হোসেন খোকনের সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলিতে একজন নিহত ও কমপক্ষে সাতজন আহত হন। নিহত ব্যক্তির নাম আবুল কালাম (৩৭)। তিনি বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থক বলে জানা গেছে। গুলিবিদ্ধ চারজনকে জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই ইউনিয়নের তাজিয়াকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই ধরনের ঘটনা ঘটলে পুলিশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য প্রার্থীর ৫০০ ব্যালট পেপার উধাও হওয়ার অভিযোগে দুটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। সেখানে ক্ষুব্ধ জনতার ইটপাটকেলে ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ওই অভিযোগের বিষয়টিকে  গুজব বলছেন।

মোংলায় নির্বাচনী সহিংসতায় অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। গতকাল দুপুরে উপজেলার সোনাইলতলা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে এবং সুন্দরবন ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে মেম্বার প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আহতদের দুপুর পৌনে ৩টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সবার শরীরে ধারালো অস্ত্র ও রডের আঘাত রয়েছে।

এর আগে রবিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে এ উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর চাঁদপাই গ্রামের মেম্বার প্রার্থী ও বর্তমান মেম্বার মতিয়ার রহমান মোড়লের ওপর হামলা চালায় অন্য মেম্বার প্রার্থী শফিকুল শেখের লোকজন। এ সময় ঘটনাস্থলেই মারা যান ফাতেমা বেগম (৬৫)। গুরুতর আহত হন চারজন।

বাগেরহাটের শরণখোলায় রবিবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল সোমবার  ভোটের দিন দুপুর পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় ছয় নারীসহ ২৭ জন আহত হয়েছেন। উপজেলার রায়েন্দা ও সাউথখালী ইউনিয়নের মেম্বর প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষ হয়। আহতদের মধ্যে গুরুতর তিন নারীসহ ১০ জনকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। রায়েন্দা ইউনিয়নের ১ নম্বর উত্তর রাজাপুর ওয়ার্ডের সদস্য প্রার্থী সাখাওয়াত তালুকদারের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হেলাল সরদার ও তাঁর কর্মীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করে সাখাওয়াত তালুকদার ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

নির্বাচন কমিশন যা বলছে : নির্বাচনে সহিংসতা সম্পর্কে গতকাল ভোট শেষে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য খুব বেদনাদায়ক, দুঃখজনক ঘটনা যে মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় দুজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২৪ জন লোক বিভিন্ন জায়গায় প্রার্থীদের নিজেদের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ির ঘটনায় আহত হয়েছেন। এ ছাড়া মোটামুটি সব জায়গায় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে আমরা খবর পেয়েছি। পাঁচটি ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের কারণে ভোটগ্রহণ বন্ধ করা হয়েছে। ইভিএমে ইউনিয়নে ৫০ শতাংশ এবং পৌরসভায় ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। আর ব্যালটে ৬৫ শতাংশ হবে বলে আশা করি।

এদিকে রামপাল উপজেলায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও ১০ ইউনিয়নে শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। এ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে ক্ষমতাসীন দলের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় সেখানে সদস্য পদে ভোট হয়।

চিতলমারী ও কচুয়া উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নারী ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভোটাররা কেন্দ্রে হাজির হন। কয়েকটি কেন্দ্রে খোলামেলা অরক্ষিত স্থানে ভোটবাক্স দেখা যায়। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো স্থান থেকে অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে গতকাল সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অনিয়মের অভিযোগ এনে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন কচুয়া উপজেলার ধোপাখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী মাসুদ রানা লালন এবং ফকিরহাটের শুভদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আবদুল আউয়াল।

ফকিরহাট উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটাররা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। সকাল থেকে বৃষ্টি উপেক্ষা করে ভোটাররা কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন। মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৪টি ইউপিতেও শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে।

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার ইউনিয়নের প্রতিটি কেন্দ্রে ছিল নারী-পুরুষ ভোটারদের সরব উপস্থিতি।

খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার বারাকপুর ইউনিয়নে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়াধাওয়ি, হামলা, ভাঙচুর এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কয়লা ইউনিয়ন পরিষদের আনারস প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী রফিকুল ইসলাম ভোট বর্জন করেন। এ ছাড়া একই ইউনিয়নে পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের চশমা প্রতীকের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী আফতাব আহমেদও একই অভিযোগে দুপুর ১টার দিকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর মক্তব কেন্দ্রের পাশে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে কেন্দ্র দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন নৌকা প্রতীকের কর্মীরা। এ সময় তাঁরা হাতুড়ি ও লাটিসোঁটা নিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। পরে র‌্যাব সদস্যরা উপস্থিত হয়ে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

তালা থানার ওসি মেহেদি রাসেল জানান, জালালপুর ইউনিয়নের দোহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মফিদুল হক লিতুর কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে বাবুল হোসেন ও ইমদাদুল হক নামের দুই পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। তাঁদের সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া আটক গুলিবিদ্ধ সুজিত কাগুজির পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসা চলছে। এ ছাড়া গতকাল সকালে শ্রীমন্তকাটি কেন্দ্রের পাশে নৌকার কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

ভোটের আগের রাতে কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী শহিদুল ইসলাম ও একজন ইউপি সদস্য প্রার্থীসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

(প্রতিবেদনটিতে স্থানীয় প্রতিনিধিরা তথ্য সহযোগিতা দিয়েছেন)

 



সাতদিনের সেরা