kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

রাজধানীর ফুটপাত কবে হবে পথচারীর

শম্পা বিশ্বাস   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাজধানীর ফুটপাত কবে হবে পথচারীর

ড্রেন লাইনের কাজ চলছে, এ জন্য রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি। সেই মাটির স্তূপ ফুটপাতে এমনভাবে রাখা হয়েছে, দুজন মানুষ বিপরীতমুখী হেঁটে পার হতে গেলেই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। রাজধানীর লালবাগের কেল্লার পেছনের রাস্তা থেকে গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর রামপুরা ব্রিজ থেকে ফুটপাত ধরে মধ্য বাড্ডা অভিমুখে হাঁটছিলেন নাজমা খাতুন। সেখানে ইউ লুপের নিচ পর্যন্ত যেতে ফুটপাত থেকে তাঁকে ১৮ বার মূল সড়কে নামতে হয়েছে। কারণ স্থানে স্থানে ফুটপাত দখল করে ভ্রাম্যমাণ দোকান বসানো হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও পাশের দোকানের পণ্যসামগ্রী রাখা হয়েছে সামনের ফুটপাত দখল করে।

চলতি পথের এই বিড়ম্বনা নিয়ে জানতে চাইলে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন এই কর্মজীবী নারী। বললেন, ‘এখানে ফুটপাত কিন্তু বেশ প্রশস্ত। অথচ দেখেন, স্থানে স্থানে পুরোটাই দখল করে রাখা হয়েছে। এদের কারণে বারবার মেইন রোডে নামতে হচ্ছে। যেকোনো সময় অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে।’

সংশোধিত পরিবহন কৌশল পরিকল্পনায় (এসটিপি) বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে প্রতিদিন তিন কোটি ৯০ লাখের মতো ট্রিপ (বাসা থেকে রিকশায় বাজারে যাওয়া একটি ট্রিপ, সেখান থেকে হেঁটে সেলুনে যাওয়াও আরেকটি ট্রিপ) হয়। এর মধ্যে ৭৬ শতাংশ ট্রিপই দুই কিলোমিটারের কম দূরত্বের। এসব ট্রিপের বড় অংশই হেঁটে চলার। আর ২০ থেকে ২৩ শতাংশ মানুষ হেঁটে যাতায়াত করে।

রাজধানী ঢাকায় ফুটপাত দখল করে রাখাটা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা। অথচ জনসংখ্যার ভারে নুয়ে পড়া এই নগরে ফুটপাত আছে প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। গবেষণায় দেখা গেছে, অলিগলি ছাড়া মাত্র ৩৭ শতাংশ প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি সড়কের ফুটপাত আছে। তা-ও আবার স্থায়ী-অস্থায়ী দোকানের দখলে।

ফুটপাত দখল করে বসা স্থায়ী-অস্থায়ী দোকানগুলো মূলত পোশাক, তৈজসপত্র, ফুল, জুতা, সবজি, ফল ও খাবারের। বিভিন্ন পয়েন্টে আবার ফুটপাতের ওপর পুলিশ বক্সও বসানো হয়েছে। কোথাও কোথাও নিজেদের জায়গায় দোকান তৈরি করলেও দোকানের মালামাল সাজিয়ে রাখা হয় সংলগ্ন ফুটপাতে। আবার নির্মাণসামগ্রী রেখে পুরো ফুটপাত তো বটেই, রাস্তারও অংশবিশেষ দখল করে রাখা হয় দিনের পর দিন। এতে অনেক ক্ষেত্রেই পথচারীকে চলতে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।

মালিবাগে বসবাসকারী বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘দোকান বসার কারণে ফুটপাত সরু হয়ে যায়। ফলে হাঁটার সময় প্রায়ই অন্যের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এ ক্ষেত্রে বিশেষত নারীদের বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলতে গিয়ে অপ্রীতিকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় পুরুষ পথচারীদেরও।’

জামিয়া রহমান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ফুটপাত দখল করে দোকান বসানোর পাশাপাশি সম্প্রতি আরেক উৎপাত বেড়েছে। দখল হওয়া ফুটপাতের সামান্য ফাঁকা জায়গাটুকু অনেক সময় দখল করে নেয় সাইকেল ও মোটরসাইকেল। তখন আর পথচারীর দাঁড়ানোর সুযোগটুকুও থাকে না। আমি মনে করি, ফুটপাতে দোকান বসানো বন্ধে প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ জরুরি। পাশাপাশি ফুটপাতে যানবাহন উঠিয়ে দিলেই জরিমানা করা উচিত।’

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ফুটপাত দখলমুক্ত করে চলে আসার পর অনেক জায়গায়ই তা আবার দখল হয়ে যায়। তবে ফুটপাত সার্বক্ষণিক দখলমুক্ত রাখতে ডিএনসিসি কঠোর হচ্ছে। জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে। আসলে আমাদের দেশের বাস্তবতা একটু জটিল। অল্প জায়গার মধ্যে আমরা এত লোক বাস করি, তাদের জীবিকারও একটা বিষয় আছে। তাই চাইলেই একেবারে সব কিছু করা সম্ভব নয়। আমরা তাই ধীরে ধীরে এগোচ্ছি।’

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘নগর হচ্ছে একটি গণতান্ত্রিক পরিসর। যে শহর যত বেশি নিরাপদ ও সুপ্রশস্ত ফুটপাত তৈরি করে, সেই শহর তত বেশি প্রাণবন্ত ও জনপ্রিয় হয়। বিদেশি অনেক বড় শহর রাস্তার প্রশস্ততা কমিয়ে ফুটপাতের পরিমাণ বাড়িয়েছে। কারণ তারা দেখেছে যে শহরে চলাচলকারীদের একটি বড় অংশ হেঁটে যাতায়াত করে। আর আমাদের এখানে ফুটপাত দখল করে রাখা হয় নির্মাণসামগ্রী ও দোকানের পসরা দিয়ে। কোথাও কোথাও মূল রাস্তাকে বিভিন্ন উন্নয়নকাজে কেটে ফুটপাত আরো ছোট করে ফেলা হচ্ছে। দিন দিন এটা বাড়ছে। কর্তৃপক্ষকে বললেও গা করে না। জোর যার মুল্লুক তার পরিস্থিতি আর কি।’

ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘আমরা যদি ভালো নগরী গড়তে চাই, তাহলে অবশ্যই হাঁটার জায়গা রাখতে হবে। কারণ পথচারীকে ফুটপাতে হাঁটার সুযোগ না দিলে সে রাস্তায় নেমে আসবে। আর হাঁটার জায়গা না থাকলে সে শহরের মানুষ অকর্মণ্য ও স্বাস্থ্যহীন হবে, এটাই স্বাভাবিক।’

 

 



সাতদিনের সেরা