kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

এত অভিযানের পরও অধরা ভিওআইপি চক্র

রাজস্ব ক্ষতি সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এত অভিযানের পরও অধরা ভিওআইপি চক্র

গত মঙ্গলবারের ঘটনা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাসান আলী নামের এক বিদেশগামীকে তল্লাশি করে পাওয়া যায় অদ্ভুত ধরনের তিন হাজার কার্ড। কার্ডগুলো নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ শহরে যাওয়ার পথে ছিলেন হাসান আলী। পরে জানা যায়, কার্ডগুলো বানিয়েছে অবৈধ ভিওআইপি চক্র। উদ্দেশ্য চোরাপথে বিদেশ থেকে দেশে কল পাঠিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া এবং নিজেদের আখের গোছানো।

নানা কৌশলে অনেক বছর ধরেই অবৈধ ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) কারবার চলে আসছে দেশে। এই জালিয়াতিতে ঠিক কতগুলো চক্র জড়িত তার সঠিক হিসাব নেই।  এ ধরনেরই কোনো চক্রের সদস্য হাসান আলী। তাঁকে গত মঙ্গলবার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে বিমানবন্দরের এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্স (এভসেক)।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন তৌহিদ-উল আহসান বলেন, হাসান আলী কার্ডগুলো নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ শহরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেখানে চক্রের অন্তত অর্ধশতাধিক সদস্য রয়েছেন। আর দেশে রয়েছেন তাঁদের আরো অন্তত ৬০-৭০ জন সদস্য। তিনি জানান, জব্দ করা প্রতিটি কল কার্ড ১০ ডলার সমমূল্যের। এ হিসাবে তিন হাজার কার্ডের দাম বাংলাদেশি অর্থে প্রায় ২৬ লাখ টাকা। কার্ড উদ্ধারের ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে হাসান আলীকে।

এদিকে অবৈধ ভিওআইপি কারবার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। তাদের  সহযোগিতায় গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন কালের কণ্ঠকে বলেন, অবৈধ ভিওআইপি কারবারে জড়িতদের ধরতে এখন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ শ অভিযান চালানো হয়েছে। এতে গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় আট শ কারবারি। এ সময় টেলিটকসহ অন্যান্য মোবাইল প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ সিমসহ কোটি কোটি টাকার ভিওআইপি সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।

ঢাকার আরো অনেক বাড়িতে এখনো এ ধরনের কারবার হয়ে থাকতে পারে জানিয়ে র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, তদন্তে নিশ্চিত হয়ে তার পরই অভিযান চালানো হচ্ছে। মূল কারবারিদের অনেকেই ধরা না পড়ায় এ বিষয়ে অনেক তথ্য এখনো অজানা রয়েছে।

জানা যায়, হাসান আলীর কাছে পাওয়া কার্ডগুলো কলিং কার্ড, যা নিয়ে বিক্রি করা হয় প্রবাসী শ্রমিকদের কাছে। প্রবাসীরা সেই কার্ড ব্যবহার করে দেশে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছেন। এভাবেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে চোরাইপথে আন্তর্জাতিক কল বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকার প্রতি মিনিট ইনকামিং আইএসডি কলে তিন সেন্ট হিসাবে রাজস্ব পাবে। এটাই নিয়ম। তবে ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে সার্ভিস প্রভাইডারসহ বিভিন্ন সূত্রের তথ্যানুযায়ী, দেশে দৈনিক ১০ কোটি মিনিটের বেশি বৈদেশিক কল রিসিভ হয়। আর তার প্রায় সাত কোটি মিনিটই চোরাইপথে বা ভিওআইপির মাধ্যমে আসছে। আর এই অবৈধ ভিওআইপির কারণে মোবাইল ফোন অপারেটরদের আন্তর্জাতিক কল উদ্বেগজনক হারে কমে গেছে। বিটিআরসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, দৈনিক প্রায় ২০ কোটি টাকার বিদেশি কল ভিওআইপির মাধ্যমে চুরি হয়, যা বন্ধ করা গেলে সরকারের দৈনিক সাড়ে ১২ কোটি টাকা আর বার্ষিক চার হাজার ৫৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় হতো।

জানা গেছে, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে অবৈধ ভিওআইপি  কারবারের বিষয়ে একাধিক অভিযোগ জমা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে গত ১৪ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারকে চিঠি দেন নূরুল জিহাদ নামে একজন। ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ভিওআইপি কারবারে শারুন চৌধুরীর সঙ্গে টেলিটকের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা শুধু নন, জড়িত রয়েছেন আরো বহু কর্মকর্তা, যার অনেকেই বিতর্কিত ও সমালোচিত।’

এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাঁদের বিষয়ে কিছু অভিযোগ পেয়েছি। সেখানে বিবেচনা ও আমলযোগ্য কোনো বিষয়ে টেলিটকের এমডিসহ অন্য কারো বিরুদ্ধে তথ্য থাকলে অবশ্যই বিষয়টি তদন্ত করা হবে।’ মন্ত্রী আরো বলেন, ‘সাধারণত আমি একটি কাগজও ফেলে দিই না। এসব অভিযোগ আমলযোগ্য হলে আমাদের পক্ষ থেকে প্রশাসনিক তদন্ত ও অন্য যেসব করণীয় তা অবশ্যই করা হবে।’

জানা যায়, শারুন-সাহাব সিন্ডিকেটসহ ভিওআইপি কারবারিরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না বিটিআরসি। অথচ ভিওআইপি শনাক্ত করার সক্ষমতা বিটিআরসির রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘টেকনিক্যাল কারণে টেলিপে অ্যাপটি বন্ধ রাখা হয়েছে। শিগগিরই এটি আবার চালু করা হবে।’ দুর্নীতির কারণে ওএসডি থাকা প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘আমাকে সাত মাসের জন্য ওএসডি করা হয়েছিল। তবে এটাকে ঠিক ওএসডি বলা যায় না, আমাকে এমডি অফিসে সংযুক্তি দেওয়া হয়েছিল।’

এ বিষয়ে দায়ের করা একটি মামলার তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, নানা কৌশলে অবৈধ ভিওআইপি কারবারে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু সিন্ডিকেট। এরপর এই টাকা হুন্ডি করে ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে। জানা যায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা—বিটিআরসির অভিযানে চক্রের মাঠ পর্যায়ের কিছু কর্মী বিচ্ছিন্নভাবে গ্রেপ্তার হলেও নেপথ্যের মূল গডফাদাররা বরাবরই থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

 



সাতদিনের সেরা