kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

তাড়াতাড়ি ঘুরে আয়, অনেক কাজ আছে

সৈয়দ হাসান ইমাম   

৬ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তাড়াতাড়ি ঘুরে আয়, অনেক কাজ আছে

১৯৭৫ সালে শেখ মনি ও আমাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড দাওয়াত করলেন সস্ত্রীক। শেখ মনি বললেন, ‘আমার কাজ আছে, আমি যেতে পারব না।’ তখন নিয়ম ছিল, আমন্ত্রিত হয়ে বিদেশে যেতে হলে বঙ্গবন্ধুর অনুমতি নিতে হতো। জুন মাসের দিকে বর্তমান গণভবনে বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম। তিনি অনুমতি দিয়ে বললেন, ‘যা, তাড়াতাড়ি ঘুরে আয়, অনেক কাজ আছে।’ আমার ৪৫ দিনের আমন্ত্রণ ছিল। আমি বললাম, আমি ৩০ দিনের বেশি থাকতে পারব না। ৫ আগস্ট ফিরে এলাম। ফিরেই চলচ্চিত্রের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আর তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারিনি। ফলে আর দেখা হয়নি।

যদিও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয়ের সুযোগ হয় ছোটবেলাতেই। তখন ভারত অবিভক্ত। আমি নানাবাড়ি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে থাকতাম। বঙ্গবন্ধুকে তখন প্রথম দেখেছি নানাবাড়িতে। নানি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের বোন। বঙ্গবন্ধু এলে নানির কাছে বসে চা খেতেন; রাজনৈতিক নানা বিষয়ে আড্ডা, আলাপ-আলোচনা হতো। আমাদের আদর করতেন। লজেন্স, চকোলেট দিতেন।

১৯৪৭ সালে দেশভাগ হয়ে গেল, বঙ্গবন্ধু ঢাকায় চলে এলেন। আমি পড়াশোনা শেষ করে ১৯৫৭ সালে এলাম ঢাকায়। এসে আবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ হলো। পূর্ববঙ্গে তখন আওয়ামী লীগ সরকার; আতাউর রহমান সাহেব মুখ্যমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুও মন্ত্রী। তিনি তখন আমাদের নিয়ে ‘মুক্তধারা’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গঠন করলেন। বঙ্গবন্ধুর বন্ধু এ কে এম আহসান সভাপতি ও নুরুল আলম সাধারণ সম্পাদক। আব্দুল লতিফ, খান আতাউর রহমান, মাহবুবা হাসনাত (মাহবুবা রহমান), ডা. রওশন আরাসহ আমরা সবাই সদস্য। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুকে জেলে নেয়। এরপর আর সংগঠনটি তেমন কাজ করতে পারেনি।

১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতার সময় দীর্ঘদিন পর আবার যোগাযোগ হলো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। ওয়ারীতে সিধু ভাইয়ের বাড়িতে আমরা ক্যাম্প করলাম। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যাঁরা আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেখানে তাঁদের সাময়িক আশ্রয়ে রাখা হতো। সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু একটি ট্রাকে করে মিরপুরের অবাঙালি এলাকায় গেলেন। আমরাও ছিলাম সেই ট্রাকে। বঙ্গবন্ধু ট্রাক থেকেই বক্তব্য দিলেন। বললেন, ‘আজ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ ঘোষণা করলাম। যারা দাঙ্গা করবে, পূর্ব পাকিস্তানে তাদের ঠাঁই হবে না।’ লক্ষণীয়, এই ঘোষণা থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এ দেশে আর কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে বাঙালির অভূতপূর্ব বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচিত হলেন। সে সময় সিনেমার পত্রিকা পূর্বাণী বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা প্রদান করে। সেদিনের কথা স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমি তখন ‘লালন ফকির’ সিনেমার শুটিং করছি। শুটিং বন্ধ রেখে সংবর্ধনাস্থল পূর্বাণী হোটেলে যেতে দেরি হয়ে গেল। গিয়ে দেখি বক্তৃতা শেষ। অন্য হলরুমে খাবারের আয়োজন হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর কাছে যেতেই গলা জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘চল কেক কাটব।’ কিন্তু গিয়ে দেখা গেল নৌকার আকৃতিতে কেক বানানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘নৌকা আমার নির্বাচনী প্রতীক। আমি তো নৌকা কাটতে পারব না। তোরা বাড়িতে পাঠিয়ে দিস।’

মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলে ২০ ডিসেম্বর আমি ঢাকায় ফিরে আসি। এসে আবার স্ত্রী-মেয়েকে আনতে কলকাতায় যাই, ফিরি ১২ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আমি এয়ারপোর্ট থেকে স্ত্রী-মেয়েকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে সোজা যাই বঙ্গভবনে। গিয়ে দেখি শপথ শেষ, অনেক মানুষের ভিড়। আমার কেন যেন মনে হলো, এটা ঠিক হচ্ছে না। ধাক্কাধাক্কি করে সবাইকে সরিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম। আমি তাঁর কাছে গেলেই বঙ্গবন্ধু গলাটা জড়িয়ে ধরতেন। ‘আয়’ বলে এবারও তা-ই করলেন। আমি বললাম, আপনার সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। গলা জড়িয়ে ধরা অবস্থায়ই বললেন, ‘তোরা আমাকে মারবি?’ তিনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারতেন না, বাঙালি তাঁকে হত্যা করতে পারে।

দেশ স্বাধীনের পর গণভবন ছিল রমনায়। বঙ্গবন্ধু ওখানেই অফিস করতেন। আমাদের তখন তেমন কাজ নেই, থাকি রমনা থানার কাছে। সকালবেলা গণভবনে চলে যেতাম, প্রায় প্রতিদিনই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা হতো, কথা হতো।

লেখক : অভিনেতা, স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। 

অনুলিখন : আজিজুল পারভেজ

 



সাতদিনের সেরা