kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

১২ জুলাই আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলাম

পঙ্কজ ভট্টাচার্য   

৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১২ জুলাই আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলাম

রাজনৈতিকজীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করার, দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছি। প্রথমে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসেবে, এরপর ন্যাপের (মোজাফফর) সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রাম, কারাবাস এবং দেশ পুনর্গঠনের কাজে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তাঁকে মুজিব ভাই বলেই ডাকতাম।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয় ১২ জুলাই ১৯৭৫। বিকেল ৩টায় গণভবনে গিয়ে দেখা করেছিলাম। একটি বিশেষ বার্তা নিয়ে গিয়েছিলাম। বার্তাটি দিয়েছিলেন বাংলাদেশে বুলগেরিয়ার রাষ্ট্রদূত বরিস বাইজস্টিক, যাঁর বয়স ছিল ৮৭ বছর। এই বয়সে কেউ রাষ্ট্রদূত হয়ে আসে না। কিন্তু বুলগেরিয়া সরকার এই অভিজ্ঞ মানুষটিকে পাঠিয়েছিল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তাঁর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে। তিনি হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নির্যাতিত হয়েছিলেন। তিনি আমাকে ১১ জুলাই ডেকে নিয়ে একটি গুরুতর সংবাদ জানালেন। তিনি জানান, সেনাবাহিনীর ছোট ও মধ্যস্তরের কর্মকর্তাদের একটি অংশ দেশে একটি ক্যুর ষড়যন্ত্র করছে। রক্তাক্ত এই অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত নিহত হতে পারেন। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সতর্ক করা দরকার। বার্তাটি তাঁর কাছে পৌঁছানো দরকার।

আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা সরাসরি রাষ্ট্রপতিকে জানাচ্ছেন না কেন? তিনি বললেন, রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন তাঁর দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে আমরা নাক গলাচ্ছি কি না, এ কারণে তাঁরা জানাচ্ছেন না। আর যেহেতু আমার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তাঁরা জানতেন, তাই আমাকেই বার্তাটি জানানোর জন্য অনুরোধ করলেন।

আমি তখন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ-মোজাফফর) সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা। এর আগে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির ত্রিদলীয় জোট গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের (গজ) সমন্বয় কমিটির সদস্য ছিলাম।

বার্তাটি মুজিব ভাইকে পৌঁছাতে পরদিনই ছুটে যাই। শুনে তিনি প্রথমে কেমন চুপসে গেলেন। এরপর বললেন, ‘বাংলাদেশে কেউ আমার বুকে অস্ত্র তাক করতে গেলে তার হাত কি কাঁপবে না? আমি ভাত-কাপড় না দিতে পারি; কিন্তু এ দেশের স্বাধীনতা কি এনে দিইনি? এ দেশের মানুষের জন্য আমি কি জেল খাটিনি?’ বললাম, ষড়যন্ত্রের নেশায় যারা মেতেছে, তারা তো এসব ভাববে না। স্বগতোক্তি করে তিনি বলেন, ‘মেজর ডালিম, রশিদ ও ফারুক এরা এসেছিল আমার কাছে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে ওরা সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। এখন এসে কান্নাকাটি করছে সেনাবাহিনীর চাকরিতে তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু সেনানিয়মে এটা তো সম্ভব নয়। তাদেরকে বললাম, তোমরা ব্যবসা-বাণিজ্য করো। তারা বলল, ব্যবসা করবে, টাকা পাব কোথায়? আমি বললাম, আমি অর্থমন্ত্রীকে বলে দিচ্ছি, তোমরা ব্যাংকের লোন নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করো।’

আশ্চর্য, সেদিন যেসব মেজরের নাম বঙ্গবন্ধুর মুখে শুনেছিলাম, তারাই ছিল বঙ্গবন্ধুর খুনি।

বঙ্গবন্ধু তখন জানতে চাইলেন, তাঁর কী করা উচিত?

জানালাম, রাষ্ট্রদূত বলেছেন, আপনার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটি নিরাপদ নয়। এক কিলোমিটার দূর থেকেও এই বাড়িকে টার্গেট করে আপনাকে আঘাত করা সম্ভব। সে তুলনায় গণভবন অনেক নিরাপদ।

তিনি বললেন, ‘তোর ভাবি তো এই বাড়ি ছাড়তে চায় না। সে বলে, সারা জীবন জেলে থেকেছ। এখন এখানেই থাকো। তোমাকে নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করতে পারব না। সারা জীবন এখানে থেকেছি, গাছপালা লাগিয়েছি, না থাকলে সব নষ্ট হবে।’

বঙ্গবন্ধু আবেগতাড়িত হয়ে পড়লেন। বললেন, ‘আমার চিন্তুা তো তোদের নিয়ে, আঘাত যদি আসে এ দেশে কমিউনিস্টদের ওপরেই প্রথমে আঘাতটা আসবে। আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না, আমাকে ক্ষমতা থেকে হটাতে চাইলে আমি নিজেই ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে চাদরটা কাঁধে দিয়ে বাউলি মেরে আমার প্রিয় জনতার মধ্যে চলে যাব, আবার মানুষকে নিয়ে লড়াই-সংগ্রাম শুরু করব।’

আমি বললাম, যারা ষড়যন্ত্র করছে, তারা কি আপনাকে জীবিত রাখবে? তারা জানে, আপনাকে জীবিত রাখলে তাদের কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হবে না। সুতরাং আপনাকে বেঁচে থাকতে হবে।

তারপর তিনি আমাকে আশ্বস্ত করার জন্য বলেন, ‘আমি একটা ব্যবস্থা নিচ্ছি, কর্নেল নূরুজ্জামানকে (রক্ষীবাহিনীর প্রধান) যুগোস্লাভিয়ায় পাঠিয়েছি, অ্যান্টিট্র্যাংক আনার জন্য। এক মাসের মধ্যে এসে যাবে।’

এই কথার মাঝখানে অতি সন্তর্পণে ফাইল হাতে ঢুকলেন এক ব্যক্তি। তাঁকে দেখে আমি চমকে উঠলাম। আমি মুজিব ভাইয়ের হাঁটুতে চাপ দিয়ে ইঙ্গিত করলাম প্রসঙ্গটি বন্ধ রাখতে; কিন্তু হিতে বিপরীত হলো। তিনি বললেন, ‘আরে ও তো আমার সচিব আবদুর রহিম, ও আমার বিশ্বস্ত লোক। অ্যান্টিট্র্যাংক এক মাসে আনার বিষয়টি পুনরায় উল্লেখ করলেন। সহাস্যে দাঁড়িয়ে থাকলেন পাকিস্তানফেরত সাবেক পুলিশকর্তা আবদুর রহিম, যিনি আমার মতো অনেক আন্দোলনের কর্মীদের ইন্টারোগেশনের সময় তাঁর রূঢ় রূপটি দেখেছিলাম।

বঙ্গবন্ধুকে আবার অনুরোধ করলাম, আপনি ভাবিকে বোঝান, আপনাকে সতর্ক হতে হবে।

তিনি আবার বলেন, ‘আমি তোদের জন্য ভাবি, মণিদা, মোজাফফর এদের সাবধান থাকতে বলিস।’

যখন মুজিব ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরব, তখনই দেখি খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির দোরগোড়ায়। তাকে দেখে মুজিব ভাই হেসে হেসে বললেন, ‘এই পঙ্কজ দেখ, আমাদের রি-অ্যাকশনারি মন্ত্রী এসেছে।’ খন্দকার মোশতাক আহমেদও হেসে হেসে বলল—নেতা আপনার জীবদ্দশায় আমি আপনার বিরোধিতা করব না। খুনি মোশতাক তার কথা রেখেছিল। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পরে মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেনি। বাংলার ইতিহাসে এভাবে মোশতাক মীরজাফরের সমার্থক হয়ে উঠল।

সেদিনের দৃশ্যটি চোখের সামনে ভাসছে। যে মোশতাক মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করতে চেয়েছিল, সে আবার সুযোগ পেয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে বিসর্জন দিয়ে দেশটাকে আবার পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিল।

দুঃখটা আজও মনের মধ্যে থেকে গেল, সেদিন যদি বঙ্গবন্ধুকে জোর দিয়ে রাজি করাতে পারতাম, তাহলে হয়তো এই মর্মান্তিক ঘটনাটা ঘটত না।

১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড তাই আমাদের জন্য একটি শিক্ষা। সঠিক সময়ে সতর্ক না হলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর মতো মানুষকে এভাবে হারাতে হবে, এটা কখনো কেউ ভাবেনি। কিন্তু তা-ই ঘটে গিয়েছিল। এরপর দেশের পাকিস্তানপন্থীদের পুনর্বাসন হয়েছে; সংবিধান সংশোধন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে; সাম্প্রদায়িক ধারায় দেশ পরিচালিত হয়েছে; যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার রহিত করার চেষ্টা হয়েছে। এসব থেকে অনেকটা মুক্ত হয়েছে দেশ। কিন্তু এখনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে। দেশের রাজনীতিতে জনগণের সার্বভৌমত্ব এখনো আসেনি। এ জন্য সব রাজনৈতিক শক্তি ও বঙ্গবন্ধুকন্যাকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানাই।

শোকের মাসে বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

পঙ্কজ ভট্টাচার্য : সভাপতি, ঐক্য ন্যাপ।

অনুলিখন : আজিজুল পারভেজ

 



সাতদিনের সেরা