kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

আইসিইউ শয্যা বাড়লেও কাটছে না হাহাকার

তৌফিক মারুফ   

৩১ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আইসিইউ শয্যা বাড়লেও কাটছে না হাহাকার

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সিরাজগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান। গতকাল তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভর্তির জন্য অ্যাম্বুল্যান্সে করে আনা হয়। ভর্তিপ্রক্রিয়ার জন্য চলছিল অপেক্ষা। এ সময় তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে কষ্ট লাঘব ও সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন নাতি পলাশ। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

সারা দেশে হাসপাতালগুলোতে তুলনামূলক সীমিত সুবিধায় স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা না পাওয়া বা উপচে পড়া রোগীর চাপ এসে পড়ছে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। এই চাপ সামাল দিতে আগে থেকেই হিমশিম অবস্থা ঢাকার হাসপাতালগুলোর, বিশেষ করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সেবার চাহিদাসম্পন্ন রোগীর চাপে দিশাহারা অবস্থা।

গত এক বছরে ঢাকার অনেক হাসপাতালেই আইসিইউ সুবিধা বেড়েছে। মহাখালীতে ঢাকা মহানগর উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) হাসপাতালের মতো দুই শতাধিক আইসিইউ শয্যাসম্পন্ন উচ্চ ক্ষমতার হাসপাতাল চালু করা হয়েছে। তার পরও ঢাকা নগরের ১৬টি সরকারি হাসপাতাল ঘিরে আইসিইউয়ের জন্য প্রতিদিন চলছে রোগীর স্বজনদের হাহাকার। এই হাসপাতালগুলোর আইসিইউতে ঠাঁই নেই। কেউ মারা গেলে কিংবা সুস্থ হলে যখন কোনো শয্যা খালি হয় তখন অন্যদের সুযোগ মেলে। সেই আশা নিয়ে হাসপাতালগুলোর সামনে তীর্থের কাকের মতো রাত-দিন অপেক্ষায় থাকে বিপদগ্রস্ত স্বজনরা।

গত এক বছরে হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের গলদ থাকায় সংকট আরো প্রকট হয়ে উঠেছে। রাজধানীর ১৬টি কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের মধ্যে বড় তিনটিতে আইসিইউ ইউনিট চালুই করা হয়নি। বাকি ১৩টি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা আছে ৩৮১টি। এর মধ্যে শুধু ডিএনসিসি হাসপাতালেই আছে ২১২টি। বাকি ১২ হাসপাতালে আছে ১৬৯টি। এর মধ্যে তিনটি হাসপাতালে আছে যথাক্রমে চার, ছয় ও আটটি শয্যা। আরো তিনটি হাসপাতালে আছে ১০টি করে। অন্য ছয়টি হাসপাতালে ১৫টি থেকে সর্বোচ্চ ২৬টি করে আইসিইউ শয্যা রয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি ব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সপ্তাহে আরো ৪০টি আইসিইউ শয্যাসম্পন্ন একটি কভিড ইউনিট চালুর প্রস্তুতি চলছে। যেখানে পর্যায়ক্রমে সাধারণ ও অন্যান্য মিলিয়ে মোট এক হাজার শয্যার ব্যবস্থা করা হবে বলে ওই হাসপাতাল সূত্র জানায়।

অন্যদিকে ঢাকার তিনটি ছাড়াও ঢাকার বাইরে ৪৫টি কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালেও এখন পর্যন্ত আইসিইউ ইউনিট চালু করা হয়নি। যেগুলোতে আইসিইউ সুবিধা কমবেশি আছে, সেগুলোতে শয্যা খালি নেই, অনেক হাসপাতালের সাধারণ শয্যাও রোগীতে পূর্ণ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, ঢাকায় সরকারি ১৭টি হাসপাতালে মোট আইসিইউ শয্যা আছে ৩৮৪টি, যার মধ্যে খালি আছে ১৩টি। বেসরকারি ২৮টি হাসপাতালের ৫০৭টির মধ্যে খালি আছে ৭৪টি। সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি মোট এক হাজার ৩১৭টি আইসিইউয়ের মধ্যে খালি আছে গতকাল শুক্রবারের হিসাব অনুসারে ১৮১টি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, ঢাকার ১৬টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি ও হাসপাতাল, নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে একটিও আইসিইউ শয্যা চালু নেই কভিড রোগীদের জন্য। অন্যদিকে শ্যামলী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট যক্ষ্মা হাসপাতালে ১৬টি আইসিইউ শয্যার ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে সেখানে চালু আছে চারটি। ফুলবাড়িয়া কর্মজীবী হাসপাতালে ছয়টি আইসিইউ শয্যা চালু আছে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কভিড আইসিইউ চালু আছে মাত্র আট শয্যার। অন্যদিকে ১০টি করে শয্যা আছে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার এক-দেড় বছরে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় যতটা উন্নতি করেছে তার থেকে আরো বেশি করার সুযোগ ছিল এবং এখনো আছে। বড় বড় সব বিশেষায়িত হাসপাতালে যে অবকাঠামো সুবিধা আছে, সেখানে সহজেই কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। ২০ থেকে ২৫ করে আইসিইউ শয্যা স্থাপন করাও কঠিন কিছু নয়। সারা দেশে যে হাসপাতালগুলোতে কভিড রোগীদের ইউনিট রয়েছে, সেগুলোতে অল্প পরিসরে হলেও আইসিইউ সুবিধা চালু করা দরকার ছিল। সেটা করা গেলে ঢাকায় যেভাবে রোগীর চাপ বেড়েছে সেটা হতো না। এ ছাড়া গত দেড় বছর ধরে ঢাকায় যে হাসপাতালগুলোতে বেশি কভিড রোগী থাকছে, সেখানেও আইসিইউ শয্যা আরো বাড়ানো উচিত ছিল। প্রয়োজনে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে জনবল কাজে লাগানো যেত। কিন্তু সেটা না করতে পারা দুঃখজনক। শুধু জনবল ঘাটতির অজুহাতে মাসের পর মাস কাটিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুাজব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের ফিল্ড হাসপাতালের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। তবে সব যন্ত্রপাতি এখনো হাতে পাইনি। আশা করি, সেগুলো পেলে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ অন্ততপক্ষে কিছু বেডে রোগী ভর্তি শুরু করা যাবে।’

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে আমাদের এখানে আইসিইউ ছিল না। আমি মন্ত্রণালয় থেকে ১০ বেডের একটি আইসিইউ চালুর অনুমোদন এনেছি। কিন্তু যন্ত্রপাতি ও জনবল পাইনি।’

কভিড-১৯ মোকাবেলায় সরকার গঠিত কারিগরি পরামর্শক কমিটির হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান কালের কণ্ঠকে বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই আইসিইউ চালু আছে সেগুলোতে আরো বেড বাড়িয়ে শক্তিশালী করা উচিত। পাশাপাশি ঢাকার বড় বড় বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর সবটিতেই আইসিইউ চালু করা দরকার। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জনবল সংকট থাকায় আইসিইউ বা ভেন্টিলেটর সুবিধা না দিয়ে বরং কম দক্ষ লোক দিয়ে চালানো সম্ভব, সিপ্যাপ-বাইপ্যাপ যন্ত্র দিলে বেশি উপকার হবে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, দেশে এ পর্যন্ত বিভিন্ন মাধ্যমে উপহারের পোর্টেবল ৩০০ এর বেশি ভেন্টিলেটর এসেছে। সেগুলো বেশির ভাগই চালানো যাচ্ছে না কারিগরি দক্ষতার অভাবে।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদেশ থেকে যে পোর্টেবল ভেন্টিলেটরগুলো এসেছে, সেগুলো বিতরণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তালিকা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আমরা আপাতত ২১৪টি ভেন্টিলেটর কেনার অর্ডার দিয়েছি, যা হাতে পেতে আরো ১৫-২০ দিন সময় লাগবে। এ ছাড়া আগামী মাসের শেষ নাগাদ আরো দু-তিন শ ভেন্টিলটর, ৩০০ আইসিইউ বেড ও মনিটর কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করি, সেগুলো হাতে পেলে এখনকার যে ক্রাইসিস সেগুলো কেটে যাবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মো. ফরিদ হোসেন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েকটি হাসপাতালে আইসিইউ বেড বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে জনবল। এখন কিছু জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এই নিয়োগ হলে হয়তো সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে।’

 



সাতদিনের সেরা