kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

সবচেয়ে মোটা চালও ৫০ টাকা কেজি

৭০-এর ওপরে ভালো মানের সরু চাল আমদানি ও রেকর্ড উৎপাদনের সুফল নেই বাজারে

রোকন মাহমুদ   

২৯ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




সবচেয়ে মোটা চালও ৫০ টাকা কেজি

করোনা পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতের কর্মজীবীদের আয় অনেক কমেছে। এতে বেড়েছে নিম্নবিত্তের সংখ্যা। মানুষ এখন সংসারের খরচ কমিয়ে কম মূল্যের চাল খাওয়ার অভ্যাস করছে। কিন্তু তাতেও কুলাতে পারছে না। চালের দাম বেড়ে গেছে এবং এর মধ্যে গরিবের কম দামের মোটা চালের দামই বেড়েছে তুলনামূলক বেশি। বাজারে সবচেয়ে কম দামের চালও এক কেজি কিনতে লাগছে ৫০ টাকা। ভালো মানের সরু চাল কিনতে লাগছে ৭০ টাকার ওপরে। অথচ দেশে বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন বেশ ভালো হয়েছে। চালের আমদানিতে সরকারি গুদামে মজুদ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দাম কমতির দিকে। কিছু খুচরা দোকান বন্ধ থাকলেও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পাইকারি বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক।

এসব কিছুর সুফল পাচ্ছে না সাধারণ ক্রেতা। মাস দেড়েকের মধ্যে মানভেদে চালের দাম কেজিপ্রতি ১৪ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সাধারণত চালের দাম বাড়ে ভরা বর্ষায়। কিন্তু এবার অনেক আগেই বেড়েছে। সামনের দিনগুলোতে আরো বাড়তে পারে। উদ্বিগ্ন সাধারণ ক্রেতারা বলছে, চাল প্রতিদিনই লাগে। ফলে কেজিতে এক টাকা বাড়লেও চাপ পড়ে পকেটে।

রাজধানীর চালের খুচরা বাজারগুলোতে গতকাল গুটি ও স্বর্ণাসহ অন্যান্য মোটা চাল বিক্রি হচ্ছিল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা কেজি। মাস দেড়েক আগে এই মানের চাল কেনা গেছে ৪৪ থেকে ৪৮ টাকা কেজি। এর মধ্যে কয়েক ধাপে কেজিপ্রতি দুই থেকে চার টাকা বেড়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, গত বছর করোনা ও বন্যার মধ্যেও মোটা চালের দাম ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি। গত বছর এই সময়ে মাঝারি মানের চালের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৪৪ থেকে ৫৬ টাকা। বর্তমানে ৫০ থেকে ৫৬ টাকা কেজি। দাম বেড়েছে ৬ শতাংশের বেশি।

খুচরা বাজারে মিনিকেট চাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা ও নাজিরশাইল চাল ৬৮ থেকে ৭২ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মাস দেড়েক আগে মিনিকেট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা এবং নাজিরশাইল ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় কেনা যেত।

রাজধানীর বাবুবাজার ও বাদামতলীর পাইকারি বাজারে মাস দেড়েক আগের চেয়ে গুটি ও স্বর্ণাসহ মোটা চাল বেড়েছে কেজিতে দুই টাকা। ৪৬ টাকার চাল এখন ৪৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে পাইকারি বাজারেই। পাইকারি বাজারে মে মাসের শেষ দিকে ব্রি আটাশ কেনা গেছে ৪৬ টাকা কেজি। জুনের শেষে তা ৪৭ টাকায় ওঠে। চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে দাম আরো বেড়ে ৪৮ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়। অর্থাৎ দাম বেড়েছে তিন টাকা পর্যন্ত।

মিনিকেট চালের দাম ছিল ৫৫ টাকা কেজি। গত মাসে তা বেড়ে ৫৬ টাকায় ওঠে। গতকাল ৫৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কেজিতে বেড়েছে তিন টাকা। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে নাজিরশাইল চালের দাম। মাস দেড়েক আগে নাজিরশাইল চালের দাম ছিল ৫৬ টাকা কেজি। গত মাসে কেজিতে চার টাকা বেড়ে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়। বর্তমানে ৬৮ থেকে ৭০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে পাইকারি বাজারে।

প্রতিবছর বোরো মৌসুমে দেশে চালের দাম অনেকটাই কমে যায়। কারণ এ মৌসুমে মোট চালের ৫৫ শতাংশের বেশি উৎপাদিত হয়। এবার দাম তেমন একটা কমেনি, বরং মৌসুম শেষ না হতেই বাড়ছে।

বাংলাদেশ রাইস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. রনি বলেন, ‘দাম না কমার অন্যতম কারণ হতে পারে কৃষক ধীরে চলো নীতিতে এগোচ্ছে। তারা সব ধান একসঙ্গে বিক্রি না করে অল্প করে বিক্রি করছে। করোনার কারণে যারা গ্রামে গেছে, তাদের অনেকেই ধান কিনে রাখছে। ফলে ধান মজুদ হয়েছে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের হাতে।’

তবে বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বড় ব্র্যান্ড কম্পানিগুলো চালের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। বেশির ভাগ চাল মজুদ হয়েছে তাদের হাতে। এতে দামের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মধ্যে বাংলাদেশেই এখন চালের দাম সর্বোচ্চ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দৈনিক খাদ্যশস্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সব দেশে চালের দাম কমেছে। ফলে বাংলাদেশ মোটা চাল আমদানি করলে প্রতি কেজি দাম পড়বে ৩৩ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে, যা বাংলাদেশের বর্তমান বাজারদরের চেয়ে অনেক কম।

দেশে বোরো, আমন ও আউশ মৌসুমে বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন চাল উৎপাদিত হয়। গত বছর বোরো মৌসুমে উৎপাদিত হয়েছিল প্রায় এক কোটি ৯৬ লাখ টন চাল। এ বছর উৎপাদন দুই কোটি সাত লাখ টনের তথ্য দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সে হিসাবে শুধু বোরোর উৎপাদনই বেড়েছে ১১ লাখ টন। হাইব্রিড বীজ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদনও গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। গত বছর ছিল ৩.৯৭ শতাংশ, চলতি বছর তা ৪.২৯ শতাংশে দাঁড়ায়। এদিকে সর্বশেষ হিসাবে খাদ্য অধিদপ্তরের গুদামে চালের মজুদ দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৬৬ হাজার টন, যা দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

রাজধানীর গোপীবাগের চালের আড়ত বিসমিল্লাহ রাইস এজেন্সির সামনে কথা হয় আব্দুস সালাম নামের একজন ক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সরু চাল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি বছরখানেক আগেই। এখন মোটা চালের দামও বেড়ে যাওয়ায় কিনতে হচ্ছে কম পরিমাণে। কারণ আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের মিল হচ্ছে না কোনোমতেই।’



সাতদিনের সেরা