kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানেও ভাড়া নিয়ে অরাজকতা

মোবারক আজাদ   

২৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানেও ভাড়া নিয়ে অরাজকতা

‘এখন তো লকডাউন। বেশির ভাগ সময় লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানের ক্রাইসিস না থাকলেও ক্রাইসিসের কথা বলে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। মৃতের স্বজনরা নিরুপায় হয়ে বাধ্য হচ্ছেন বেশি ভাড়া দিয়ে ফ্রিজার ভ্যান নিতে। অনেকেই অ্যাম্বুল্যান্সচালক ও হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে অতিরিক্ত ভাড়া গুনছেন।’

লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানের ভাড়া নৈরাজ্যের এমন চিত্র কালের কণ্ঠ’র কাছে তুলে ধরেন বেওয়ারিশ লাশ দাফনকারী ও ইসলামী জনকল্যাণ সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের একজন কর্মী।

গতকাল রবিবার আঞ্জুমান মুফিদুলের লাশ বহনকারী এই কর্মী নাম প্রকাশ না করে বলছিলেন, লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানের মালিক ও চালকরা করোনাকে পুঁজি করে বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। তিনি মনে করছেন, কয়েক দিন ধরে প্রতিদিনই করোনায় যে হারে লোক মারা যাচ্ছে, তাতে এসব ফ্রিজার গাড়ির মালিক-চালকচক্র আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেসরকারিভাবে লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা নেই। তাদের নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারিরও কেউ নেই। মালিকদের সমিতি থাকলেও নির্দিষ্ট কোনো ভাড়ার তালিকা নেই। ২০১৮ সালে একটি নীতিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় না হওয়ায় এ বিষয়ে আর অগ্রগতি হয়নি।

বিভিন্ন হাসপাতাল ও চালকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব ফ্রিজার ভ্যান চুক্তিভিত্তিক ভাড়ায় চলে। এ সুযোগেই অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন চালক ও মালিকরা। ঢাকার মধ্যে লাশ নিতে দুই থেকে চার হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। আর ঢাকার বাইরে দূরত্ব অনুযায়ী ১০ থেকে ২০ হাজার টাকাও নেওয়া হয়। অপেক্ষা করার জন্য ঘণ্টায় ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা হারে ভাড়া নেওয়া হয়।

তবে ফ্রিজার ভ্যান মালিকরা বলছেন, রাজধানীর ভেতরে কিছুটা কম ভাড়া হলেও বাইরে যেতে জ্যাম, ফেরি ও সেতুর টোল থাকায় বেশি ভাড়া নিতে হচ্ছে। ফেরিভাড়া ও সেতুর টোল মওকুফ করে সরকারি নীতিমালা জারি করলে বাড়তি ভাড়া আদায় বন্ধ হবে।

গতকাল আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের রাজধানীর মুগদা কার্যালয়ে গিয়ে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির ডিউটি অফিসার মো. আল আমিনের সঙ্গে। লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানের ভাড়ার বিষয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের বর্তমানে ছয়টি লাশবাহী ফ্রিজার গাড়ি আছে। ঢাকার ভেতরে দুই হাজার টাকা অফিস খরচ। এরপর অপেক্ষার জন্য প্রতি ঘণ্টায় এক হাজার টাকা দিতে হয়। ঢাকার বাইরে গেলে প্রথমে চার হাজার টাকা অফিস খরচ জমা দিয়ে পরে আসা-যাওয়া প্রতি কিলোমিটার ২০ টাকা করে দিতে হয়। অপেক্ষার জন্য প্রতি ঘণ্টায় দিতে হয় এক হাজার টাকা করে।’

ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে আল আমিন বলেন, ‘ফ্রিজার গাড়ি একটু তো খরচ বেশি পড়বেই। এ ছাড়া আমাদের গাড়িগুলো অকটেনে (জ্বালানি) চলে, তাই খরচ বেশি।’

আঞ্জুমানের ভাড়ার হার নির্দিষ্ট করা থাকলেও অন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তা নেই।

জানতে চাইলে ‘টোয়েন্টিফোর আওয়ার অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিস’ নামের প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মো. এস এইচ শান্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের ১০টি লাশবাহী ফ্রিজার গাড়ি আছে। এগুলোর নির্দিষ্ট করে কোনো ভাড়ার চার্ট (তালিকা) নাই। যখন যেভাবে ট্রিপে যাওয়া যায় সেভাবে যায়।’ ভাড়ার হার নির্দিষ্ট করে দিয়ে তালিকা না থাকার বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি তিনি।

উত্তরা অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিস অ্যান্ড ফ্রিজার অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিসের স্বত্বাধিকারী মো. শাকিল বলেন, ‘আমাদের যে কয়টি লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান আছে, সেগুলোর দূরত্ব ও আবহাওয়ার ওপর ভিত্তি করে চুক্তিভিত্তিক ভাড়া হয়ে থাকে। প্রতি কিলোমিটার হারে ভাড়া দেওয়া হয় না। অপেক্ষা করার জন্য প্রতি ঘণ্টায় ৫০০ টাকা করে ভাড়া নিই আমরা।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে কুমিল্লা সদরে যেতে ফ্রিজার ভ্যান ভাড়া কত জানতে চাইলে আলিফ অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিসের স্বত্বাধিকারী মমিন আলী বলেন, ‘১০ হাজার টাকা রানিং ভাড়া। আর ওয়েটিংয়ের জন্য প্রতি ঘণ্টায় এক হাজার টাকা।’

মমিনের ভাষ্য মতে, আগে ভাড়া আরো বেশি ছিল। এখন একটু কমানো হয়েছে। কারণ এখন ঢাকা শহরে ভুয়া লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান বেড়ে গেছে।

ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুল্যান্স মালিক সমবায় সমিতির তথ্য মতে, তাদের অধীনে এক হাজার ৩৭ জন মালিকের দুই হাজার ৮০টি অ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে। লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান রয়েছে ১৭০টি।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুল্যান্স মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি আলমগীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানের ভাড়ার কোনো নীতিমালা না থাকায় অনেকেই ইচ্ছামতো ভাড়া নিচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাড়া পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে হাসপাতালগুলোর কর্মচারীদের ওপর। এ জন্য তাঁদের ভাড়ার অনন্ত ২০ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। এ ছাড়া তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ভাড়া হয়। এসব কমিশন বাণিজ্য না থাকলে ভাড়া অনেকটাই কমে যেত। সরকার যদি নীতিমালা করে ভাড়ার তালিকা করে দেয়, তাহলে সাধারণ মানুষের বেশি ভাড়া দেওয়া লাগত না। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেও এখনো লাশবাহী গাড়ি ও অ্যাম্বুল্যান্সের ক্ষেত্রে টোল মওকুফ করা হয়নি। এসব কারণে ভাড়া অনেক সময় বেড়ে যায়। তবে রাজধানীসহ সারা দেশ থেকে জরুরি সেবার ৯৯৯-এ কল দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স বা লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান নিলে কোনো ধরনের কমিশন বা দালালচক্র ছাড়াই ন্যায্য হারে ভাড়া নেওয়া যায় বলে জানান আলমগীর হোসেন।



সাতদিনের সেরা