kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

বেশির ভাগ এমপিই ঈদ করছেন এলাকায়

করোনা প্রতিরোধে লড়ছেন তাঁরাও

আবদুল্লাহ আল মামুন   

২০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বেশির ভাগ এমপিই ঈদ করছেন এলাকায়

করোনা মহামারি প্রতিরোধে এলাকায় কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্য। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন দলটির কেন্দ্রীয় নেতাও ছিলেন। এই মহামারির প্রথম ঢেউ কাটে এভাবেই। দুর্যোগের দ্বিতীয় ঢেউয়ে এখন সারা দেশ পর্যুদস্ত। এই পরিস্থিতিতে জীবন বাজি রেখে নিজ সংসদীয় এলাকায় নিরলসভাবে কাজ করে প্রশংসিত হয়েছেন বেশ কয়েকজন এমপি। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন তাঁদের নাম। এসব এমপির বেশির ভাগই এবার ঈদে নির্বাচনী এলাকায় থাকছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেকোনো দুর্যোগে মানুষের পাশে থেকেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা মহামারির শুরু থেকে শক্ত হাতে এই সংকট মোকাবেলায় কাজ করে যাচ্ছেন। নেতাকর্মীদের প্রতি তাঁর নির্দেশ—এই মহামারিতে জনগণের পাশে থাকতে হবে। আমরা তাঁর সে নির্দেশ পালন করছি।’

মির্জা আজম : করোনা সংক্রমণ রোধে এবং করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়া দরিদ্র অসহায় মানুষের পাশে থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন জামালপুরের মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ আসন থেকে টানা ছয়বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সাবেক বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম।

মহামারির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মির্জা আজম তাঁর নির্বাচনী এলাকা মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ উপজেলায় করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশে রয়েছেন। তিনি একাধিক মতবিনিময়সভা করেছেন। নিজে উপস্থিত থেকে সরকারি ত্রাণ বিতরণসহ ব্যক্তিগতভাবে ত্রাণ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

শরীফ আহমেদ : গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ জুন মাসে নিজ নির্বাচনী এলাকা ফুলপুর-তারাকান্দা স্থানীয় প্রশাসন এবং নিজ দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। করোনা মোকাবেলায় বেশ কিছু পদক্ষেপের জন্য প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। গত ৪ জুন ফুলপুর পৌরসভার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে করোনাকালের সংকট মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর নানা কার্যক্রম তুলে ধরেন। মাস্ক ব্যবহার, করোনার টিকা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে করোনা প্রতিরোধ কমিটি গঠনসহ নানা দিকনির্দেশনা দেন। প্রতিমন্ত্রী প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের এই মহামারি ভাইরাস মোকাবেলায় করোনা প্রতিরোধ কমিটি গঠন এবং টিকা প্রদানে উৎসাহিত করে চলেছেন। তাঁর উদ্যোগে ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টিকাদানে নিবন্ধন করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সামিল উদ্দিন আহম্মেদ শিমুল : করোনায় বিধ্বস্ত উত্তর-পশ্চিমের ছোট জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এখানে কিছুদিন আগে ভয়ার্ত অনেক মানুষ এই জেলা ছেড়ে চলে যায়। এই পরিস্থিতিতে গোটা চাঁপাইনবাবগঞ্জে একাই অসম লড়াই শুরু করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহম্মেদ শিমুল। তিনি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষকে সচেতন করছেন। সড়ক-মহাসড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে নিজেই পথচারী যাত্রীদের মাস্ক পরিয়ে দিয়েছেন। হ্যান্ড মাইক হাতে নিয়ে গ্রামে গ্রামে এলাকাবাসীকে সতর্ক করে আসছেন। চালু করেছেন হটলাইন ও ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্প। দিচ্ছেন চিকিৎসাসেবা, পরামর্শ ও বিনা মূল্যে ওষুধ।

ইকবাল হোসেন সবুজ : গত বছর করোনা মহামারি শুরুর পর কর্মহীন ৩৫ হাজার দরিদ্র মানুষের দায়িত্ব নিয়ে ঘরে ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছিলেন গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন সবুজ। শ্রীপুর উপজেলাসহ সদর উপজেলার মির্জাপুর, ভাওয়ালগড় ও পিরুজালী ইউনিয়নে কেউ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন জানলেই সরাসরি যোগাযোগ করছেন এমপি ইকবাল হোসেন সবুজ। একই সঙ্গে নিজে উদ্যোগী হয়ে সংক্রমিতদের হাসপাতালে নেওয়া থেকে শুরু করে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন।

বীর বাহাদুর উশৈসিং : সমগ্র বান্দরবান জেলা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ৩০০ নম্বর আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এলাকায় থেকে জনগণকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। জানা গেছে, ৩০ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের পরপরই তিনি এলাকায় ফিরে আসেন। সেই থেকে তিনি একটানা এলাকায় অবস্থান করে জনগণের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া সহায়তা সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম সমন্বয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঘরে ঘরে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন। গত বছরের মার্চ মাসের শেষ দিকে দেশে করোনা সংক্রমণ দেখা দিলে ঢাকায় মন্ত্রণালয়ের কাজের জন্য অবস্থান ছাড়া প্রায় পুরো সময় তিনি এলাকায় অবস্থান করেন। গত বছরের জুলাই মাসে তিনি সপরিবারে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়ে ঢাকায় সিএমএইচে চিকিৎসা নেওয়ার পর আবার এলাকায় ফিরে এসে সেবা কার্যক্রমে নিয়োজিত হন।

উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ : মৌলভীবাজার-৪ আসনের এমপি উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ ৭৪ বয়সেও এই মহামারিতে প্রথম থেকেই মাঠঘাট চষে বেড়াচ্ছেন। ৯ মাস ধরে টানা এলাকায় আসা-যাওয়া করছেন। গত ৬ জুলাই থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত নিজ নির্বাচনী এলাকা কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় প্রশাসন আয়োজিত বিভিন্ন বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। জনগণের পাশে থেকেই তিনি গত বছর করোনায় আক্রান্ত হন। কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-৪ আসনে ইউএনও এবং উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে নিয়ে সব কাজ করছেন। নিজে কখনো হ্যান্ড মাইক হাতে, আবার কখনো প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে আবার কখনো দলীয় নেতাদের নিয়ে এসব কাজ করছেন।

ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল : ময়মনসিংহ-১০ গফরগাঁও আসনের সংসদ সদস্য ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে এলাকায় অবস্থান করে দলীয় নেতাদের নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা ছাড়াও পৌর শহরসহ তৃণমূল পর্যায়ে হাজার হাজার কর্মহীন ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপহার ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন। সংসদীয় প্রয়োজনে ঢাকায় গেলেও কাজ শেষে তিনি দ্রুত এলাকায় ফিরে আসেন।

আবদুল মজিদ খান : হবিগঞ্জের বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে হবিগঞ্জ-২ সংসদীয় আসন। এই আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মজিদ খান সংসদ অধিবেশনের সময় ছাড়া বেশির ভাগ সময় নিজ এলাকায় থাকছেন। মহামারির শুরুতেই তিনি এলাকাবাসীকে সচেতন করতে ছুটে গেছেন গ্রামে গ্রামে। মাস্ক বিতরণ ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য জনগণকে সচেতন করে চলেছেন। এর ফলাফল জেলার বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় সংক্রমণ ও আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কম আছে।

আনিসুল হক, উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী ও এ বি তাজুল ইসলাম : গত কয়েক দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় করোনা পরিস্থিতি অবনতির দিকে। পরিস্থিতি জানতে ভার্চুয়াল আলোচনায় অংশ নেন কসবা-আখাউড়া আসনের সংসদ সদস্য, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। গত শনি ও বৃহস্পতিবার তিনি নিজ সংসদীয় এলাকা কসবা ও আখাউড়ার ইমামদের নিয়ে সভা করে সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানান। করোনকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর-বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য র. আ. ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী সবচেয়ে বেশি এলাকায় অবস্থান করেছেন। বাঞ্ছারামপুরের সংসদ সদস্য ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলাম মানুষের পাশে আছেন।

শেখ সারহান নাসের তন্ময় : করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও বাগেরহাটে জনগণের পাশে রয়েছেন এমপি শেখ সারহান নাসের তন্ময়। সংক্রমণ রোধ, চিকিৎসাসেবা, জীবন বাঁচাতে অক্সিজেন ব্যাংক, খাদ্য সহায়তাসহ ব্যক্তি উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন শেখ তন্ময়। তিনি জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে নানা পরামর্শ দিচ্ছেন। বাগেরহাট জেলার গণ্ডি পেরিয়ে যশোর, সাতক্ষীরাসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় তিনি সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন।

আমিরুল আলম মিলন : করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও বাগেরহাট-৪ (শরণখোলা-মোড়েলগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমিরুল আলম মিলন ছুটে বেড়াচ্ছেন নিজ সংসদীয় এলাকার শহর-গ্রাম। স্বাস্থ্য সচেতনতার পাশাপাশি মাস্ক বিতরণসহ মানুষের জীবন রক্ষার জন্য মাঠ পর্যায়ে অক্সিজেন ব্যাংকও চালু করেছেন। হাসপাতালে দিয়েছেন চিকিৎসাসামগ্রী। গত ৯ জুলাই থেকে এলাকায় অবস্থান করে করোনা প্রতিরোধে এভাবেই কাজ করছেন তিনি।

সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি ও মৃণাল কান্তি দাস : মুন্সীগঞ্জের করোনা রোগীদের সহযোগিতা করতে গিয়ে নিজেই করোনায় আক্রান্ত হন এমপি মৃণাল কান্তি দাস। তিনি মুন্সীগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসনের এমপি। অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গিবাড়ী) আসনের এমপি অধ্যাপক সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি সপ্তাহের প্রায় সাত দিন এলাকায় থেকে মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করছেন। উপজেলা আওয়ামী লীগ অফিসে বসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমেও করোনা প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন। গত ৪ জুলাই তিনি করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো মানবিক উপহারের নগদ অর্থ দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। 

রুহুল আমীন মাদানী : ময়মনসিংহ-৭ ত্রিশাল আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ হাফেজ রুহুল আমীন মাদানী। তিনি নিজের এলাকার মানুষকে সচেতন করার জন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন। রুহুল আমীন মাদানী করোনার এই সময়ে এক সপ্তাহের জন্যও নিজ এলাকা ছেড়ে বাইরে অবস্থান করেননি। সংসদ অধিবেশন ও অন্যান্য কাজে ঢাকা গেলেও ফিরে আসেন সেদিনই। নিয়মিত খাদ্য সহায়তা প্রদান, সরকারি অনুদান সুষ্ঠুভাবে বিতরণের জন্য মতবিনিময় অব্যাহত রেখেছেন।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা)



সাতদিনের সেরা