kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

‘আমার মাকে খুঁজে দ্যান’

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘আমার মাকে খুঁজে দ্যান’

‘মায়ের সঙ্গে চার তলায় কাজ করতাম। ঘটনার আগে আমি ব্যক্তিগত কাজে নিচে নামি। এর কিছুক্ষণের মধ্যে আগুন আগুন চিৎকার শুনি। দ্রুত মাকে খুঁজতে ওপরে উঠতে গেলে নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দেন। আর ওপরে উঠতে পারিনি। মাকেও খুঁজে পাইনি। আমার মা আর নাই। আপনেরা আমার মাকে খুঁজে দ্যান।’ গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে কাঁদতে কাঁদতে চরম অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন মা হারানো চম্পা আক্তার। তাঁর গগনবিদারী কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে মর্গের পরিবেশ।

চম্পা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘রাত ৮টায় কারখানার কাজ শেষে মায়ের সঙ্গে বাসায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিকেলে আগুনের পর আর মাকে খুঁজে পাচ্ছি না। পরে শুনলাম ঢাকা মেডিক্যালে অনেকের লাশ এসেছে। তবে এখানে এসেও মায়ের দেখা পাইনি। আমার মা কোথায় আছে, কেমন আছে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।’

চম্পার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের সদরে। কারখানার পাশে চম্পার বাবার একটি চায়ের দোকান আছে। তাঁরা ছয় ভাই-বোন। চার ভাই রূপগঞ্জের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কাজ করেন।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের হাসেম ফুডস কারখানার আগুনে চম্পার মতো অনেকেই হারিয়েছেন প্রিয়জনকে। কেউ কেউ হারিয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫২ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য আনা হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে। এর মধ্যে ৪৯ মরদেহের একটিও শনাক্ত করা যায়নি বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুভাষ চন্দ্র সাহা। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে যে কয়টি মরদেহ ঢাকা মেডিক্যালে আনা হয়েছে, তাদের পরিচয় মেলেনি। আমাদের প্রথম কাজটি হবে মরদেহগুলোর যথাযথ প্রক্রিয়ায় ডিএনএ টেস্ট করে শনাক্ত করা। প্রয়োজনে মরদেহগুলো ফ্রিজিং করা হবে। আত্মীয়দের সঙ্গে ডিএনএ স্যাম্পল মিলিয়ে পরে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।’

এদিকে নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের ১০ হাজার টাকা করে অনুদানের ঘোষণা করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ। গতকাল শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে লাশবাহী পাঁচটি অ্যাম্বুল্যান্স ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পৌঁছার পর এই ঘোষণা দেওয়া হয়। মর্গে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, পাঁচটি অ্যাম্বুল্যান্সে ৪৮টি ব্যাগে ৪৯টি মরদেহ আনা হয়েছে।

লাশের সার্বিক পর্যবেক্ষণ করার জন্য মর্গে রয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। শাহবাগ থানার ওসি মওদুত হাওলাদার বলেন, এই মরদেহগুলোর সুরতহাল করবে জেলা পুলিশ। এরপর ময়নাতদন্ত হবে।

স্বজনের খোঁজে ভিড় মর্গে : ঘটনার পর চার তলায় উঠলেও মাকে বাঁচাতে পারেনি মোহা. শামীম। মায়ের খোঁজ করতে মর্গে এসে শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে আগুন লাগার পর ওই কারখানার সামনে গিয়ে চিৎকার করে তিনি মাকে ডেকেছিলেন। তখন কারখানার দারোয়ান তাঁকে ওপরে উঠতে বাধা দিলে ঝগড়া করে ওপরে ওঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুন বেড়ে যাওয়ায় আবার নিচে নেমে আসেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শামীম বলেন, ‘আমার মা এখন কোথায় জানি না। বেঁচে আছেন কি না, মাকে খুঁজছি।’

তিনি বলেন, তাঁদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ সদরে। তাঁদের পুরো পরিবার রূপগঞ্জের নতুন বাজার এলাকায় থাকত। তাঁর মা অমৃতা বেগম (৩৮) মাসখানেক ধরে কারখানায় কাজ করতেন।

শামীমের মতোই মায়ের লাশের খোঁজে মর্গে এসেছেন দেলোয়ার। বুধবার রাতে মায়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল জানিয়ে দেলোয়ার বলেন, বৃহস্পতিবার খুব সকালে মা যখন কাজে বেরিয়েছেন, তখনো ঘুমিয়েই ছিলেন তিনিসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। ঘটনার পর কারখানায় গিয়ে মাকে না পেয়ে ধরেই নিয়েছেন তাঁর মা আর বেঁচে নেই। লাশের খোঁজ করতে ঢাকা মেডিক্যালে এসে মায়ের লাশের জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। দেলোয়ারের বাবা ভুলতা এলাকায় চায়ের দোকান চালান।

দেলোয়ারের মতো আরো এমন অনেকেই মর্গে এসে স্বজনের লাশ খুঁজে ফিরছিলেন। এর মধ্যে ওই অগ্নিকাণ্ডে দোতলা থেকে লাফ দিয়ে মা ফিরোজা বেগম হালিমা প্রাণে বাঁচলেও আটকে পড়ে তাঁর মেয়ে তাসলিমা (১৬)। মা-মেয়ে দুজনই কাজ করতেন হাসেম ফুডসে। গতকাল মর্গের সামনে এসে মেয়ের লাশের অপেক্ষায় ছিলেন মা। মেয়ের শোকে কাতর হালিমা এর আগে কারখানাটির ফটকের সামনে মেয়ের অপেক্ষায় ছিলেন অন্তত ২০ ঘণ্টা। এরপর নিখোঁজ মেয়েকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছেন তিনি। যেকোনো উপায়ে অন্তত সন্তানের লাশটা ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে ঢামেক মর্গের সামনে এসে বারবার চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমার মেয়েকে খুঁইজা দেন অপনেরা। মেয়ের হাড্ডিগুলা অন্তত আমারে দেন অপনেরা।’

এ সময় তাঁর পাশে থাকা স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হালিমার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলায়। বাবা বাচ্চু মিয়া দিনমজুর। সংসারের অভাব ঘোচাতে বছর পাঁচেক আগে মাত্র ১১ বছর বয়সে হাসেম ফুডসে শ্রমিকের কাজ নেয় হালিমার মেয়ে তাসলিমা। আগুন লাগার সময় মা ও মেয়ে কারখানার আলাদা দুটি তলায় কাজ করছিলেন। মর্গে বিলাপ করতে করতে হালিমা জানান, কারখানায় আগুন লাগার পর জীবন বাঁচাতে দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ার পরপরই মেয়ের কথা মনে পড়ে তাঁর। তখন ছুটে যেতে চাইলে কারখানার নিচের ফটক বন্ধ পেয়ে আর ভেতরে যেতে পারেননি তিনি।

একইভাবে নিখোঁজ বোন ইসরাত জাহান ফুলির খোঁজ করতে ঢামেক মর্গে আসেন বড় বোন লিমা। ঝরনা বেগম নামের এক নারী হারিয়েছেন তাঁর প্রিয় সন্তানকে। তিনিও মরদেহের খোঁজে মেয়ের ছবি হাতে নিয়ে মর্গের সামনে ঘোরাফেরা করছিলেন। আর মায়ের খোঁজে কিশোরগঞ্জ সদর থেকে মর্গে এসেছেন দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, তাঁর মা মিনা আক্তার (৪০) ওই কারখানায় কাজ করতেন। আগুন লাগার পর থেকে মায়ের খোঁজ মিলছে না।

একই ঘটনায় নিখোঁজ আছেন শান্তা মনি আক্তার নামের এক নারী। বাবাহারা শান্তা অভাবের সংসারের হাল ধরতে কাজ নিয়েছিলেন কারখানাটিতে। ঢামেক মর্গে শান্তার খোঁজে আসা তাঁর মামা বলেন, ‘আমার ভাগ্নি কারখানাটি তৃতীয় তলায় কাজ করত। আগুন লাগার পর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।’

দুই ভাইয়ের ছবি হাতে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে খুঁজতে এসেছেন তানিয়া বেগম। আর বাবা বেলাল হোসেন খুঁজছেন মেয়ে মিতুকে। মেয়ের শেষ কথাগুলোগুলো যে তাড়া করছে তাঁকে। অগ্নিকাণ্ডে আটকে পড়া মিতু ফোনে বাবাকে বলেছিলেন, ‘আব্বা আমারে বাঁচাও, আর এক মিনিট এহানে থাকলে আমি মইরা যামু, লগের তারা অনেকেই মইরা গেছে। কয়েকজন বাইচ্চা আছি আমরা। আমাগো উদ্ধার করো, আব্বা আমাগো বাইর করো।’

প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে হাসেম ফুডসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই কারখানার পাঁচতলা ভবনে তখন প্রায় ৪০০-এর বেশি কর্মী কাজ করছিলেন। কারখানায় প্লাস্টিক, কাগজসহ মোড়কীকরণের প্রচুর সরঞ্জাম থাকায় আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। প্রচুর পরিমাণ দাহ্য পদার্থ থাকায় কয়েকটা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিটের সময় লাগে ২০ ঘণ্টারও বেশি।