kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

সাক্ষাৎকার

চসিকের উন্নয়নে ডাকলেই আমি পাশে আছি

আ জ ম নাছির উদ্দীন, সাবেক মেয়র ও চট্টগ্রাম নগর আ. লীগের সাধারণ সম্পাদক

২৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



চসিকের উন্নয়নে ডাকলেই আমি পাশে আছি

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উন্নয়ন, নগরের জলাবদ্ধতা, করোনা পরিস্থিতি, দলীয় কর্মকাণ্ডসহ নানা বিষয়ে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে কথা বলেছেন সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁর নিজ বাসভবনে একান্ত সাক্ষাৎকার নেন কালের কণ্ঠ’র চট্টগ্রাম ব্যুরোর উপপ্রধান নূপুর দেব

 

কালের কণ্ঠ : মেয়র হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমান মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরীর দায়িত্ব গ্রহণেরও প্রায় এক বছর হতে চলেছে। এই সময়কালটা কেমন দেখছেন?

আ জ ম নাছির উদ্দীন : একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ওপর নগরবাসীর অগাধ আস্থা, বিশ্বাস ও অনেক প্রত্যাশা থাকে। আমি মেয়র হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকতার সঙ্গে আমার নেওয়া জলাবদ্ধতা নিরসনে চসিকের একটি প্রকল্প থেকে শুরু করে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ ও অর্থ ছাড় দিয়েছেন; যা চসিকের ইতিহাসে এর আগে অন্য কোনো মেয়রের আমলে এত উন্নয়ন প্রকল্প কেউ দেখেনি। আমার আগে বিএনপির মেয়র এম মনজুর আলম ২০০ কোটি টাকার মাত্র একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। আর আমার পাঁচ বছরে জননেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামবাসীর জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ বরাদ্দ দেন। ১৩টি প্রকল্প অনুমোদনের পর অনেকগুলো প্রকল্প আমি আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করেছি। এ ছাড়া যেগুলো চলমান ছিল সেগুলোরও সুফল এখন নগরবাসী পাচ্ছে। বর্তমান মেয়র রেজাউল করিম নির্বাচিত হওয়ার পর ১০০ দিনের কর্ম সম্পাদন করে তা এরই মধ্যে প্রকাশ করেছেন। তবে আমি প্রত্যাশা করব উনি নির্বাচনের আগে নগরবাসীর সামনে যে ইশতেহার প্রকাশ করেছেন তা বাস্তবায়নে কাজ করে যাবেন।

 

কালের কণ্ঠ : আপনার সময়কালে নেওয়া কোন উন্নয়ন কাজ নগরবাসী মনে রাখবে?

আ জ ম নাছির উদ্দীন : ‘ডোর টু ডোর’ অর্থাৎ বাসাবাড়ি থেকে গৃহস্থালি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ দোকানপাটের বর্জ্য সংগ্রহের জন্য যে প্রকল্পটি গ্রহণ করেছিলাম তা শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের অন্য কোনো সিটি করপোরেশনে এখনো দেখা যায়নি। এর সুফল এখন নগরবাসী পাচ্ছে। কিন্তু এ প্রকল্পের কাজ চলমান থাকলে নগরবাসী উপকৃত হবে। শুনেছি বর্তমান মেয়রও এই প্রকল্পের জন্য ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এ ছাড়া নগরজুড়ে এলইডি লাইটের মাধ্যমে আলোকায়ন, সৌন্দর্যবর্ধন, বিভিন্ন সড়কে কংক্রিট, বহদ্দারহাটে পশু জবাইয়ের আধুনিক ব্যবস্থা, কুলগাঁয়ে নতুন একটি বাস টার্মিনালসহ আরো বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের কথা নগরবাসী মনে রাখবে। তা ছাড়া আমি চট্টগ্রাম শহরকে বিলবোর্ডমুক্ত করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম।

 

কালের কণ্ঠ : জলাবদ্ধতা নিরসনে চসিকসহ তিনটি সংস্থাকে চারটি মেগা প্রকল্পে সরকার প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও এখনো এর কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাওয়ার কারণ কী?

আ জ ম নাছির উদ্দীন : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নগরের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার খাল খননের নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য আমার সময় প্রায় ১৩০০ কোটি টাকা সরকার বরাদ্দ দেয়। এর মধ্যে আমি মেয়র থাকাকালে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য সরকার থেকে পাওয়া প্রায় এক হাজার কোটি টাকা জেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমি মেয়র পদ থেকে আসার পর প্রায় এক বছর হতে চলেছে, কিন্তু সেই প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই। সিডিএকে দুটি মেগা প্রকল্প ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে আরেকটি প্রকল্প দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সিডিএর পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি টাকার প্রধান বড় প্রকল্পটি গ্রহণ করার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই না করার কারণে কাজ শুরু করতে দেরি হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, জলাবদ্ধতা নিরসনে যে প্রকল্পগুলোর কাজ চলমান আছে তা থেকে এখনো প্রত্যাশিত সুফল না আসায় নগরবাসীর দুর্ভোগ ও ভোগান্তি বেড়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ বিশেষ প্রয়োজন।

 

কালের কণ্ঠ : তাহলে সমন্বয়হীনতার কারণেই কি জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের সুফল আসছে না?

আ জ ম নাছির উদ্দীন : একেকটি প্রকল্প একেকটি সংস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু তা যখন নিজেরা বাস্তবায়ন করতে যায় তখন সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় না থাকলে কাজের সুফল পুরোপুরি আসে না। আমি মেয়র থাকাকালে সেবা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সাধনের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছি। সে ধারা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব নিয়ে সরকারের টানা তিন দফায় চট্টগ্রামে মেগা প্রকল্প থেকে শুরু করে একের পর এক যে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করে অনেক অর্থ বরাদ্দও ছাড় দিচ্ছেন তা দেশ স্বাধীনের পর অন্য কোনো সরকারের আমলে দেখা যায়নি। কিন্তু আমি মনে করছি সমন্বয়হীনতার কারণে পরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে না।

 

কালের কণ্ঠ : রাজনীতির বিষয়ে আসি। বর্ষীয়ান নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর অনেকেই বলেছেন, আপনার ওপরই চট্টগ্রামের রাজনীতি অনেকটা নির্ভর করছে। আপনি কতটুকু সফল হয়েছেন বলে মনে করছেন?

আ জ ম নাছির উদ্দীন : স্কুলে পড়া অবস্থায় আমি ছাত্রলীগের রাজনীতি শুরু করি। ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি হই। এরপর কলেজ, নগর ও কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলাম। তৃণমূল থেকে উঠে এসে বর্তমানে প্রায় ৫০ বছর আমার রাজনৈতিক জীবন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে নিজেকে সব সময় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রেখেছি। ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে সভাপতি ও আমাকে সাধারণ সম্পাদক করে নেত্রী ৭১ সদস্যবিশিষ্ট চট্টগ্রাম নগর কমিটি অনুমোদন দেন। আমাদের নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে নেতৃত্বের যে শূন্যতা দেখা দিয়েছিল তাতে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা বিরাজ করছিল। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীকে নিয়ে আমি ইউনিট থেকে শুরু করে নগর কমিটি পর্যন্ত সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে নিরলসভাবে কাজ করেছি। মহিউদ্দিন চৌধুরীর শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। আমরা এখনো দলকে সুসংগঠিত ও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের কারো মধ্যে কোনো ধরনের মতভেদ ও দূরত্ব নেই। নেত্রীর নির্দেশনা মতো আমরা সবাই এখন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছি।

 

কালের কণ্ঠ : দীর্ঘদিন ধরে নগরে দলের তৃণমূলের সম্মেলন হচ্ছে না। গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় নেতারা চট্টগ্রামে এসে মতবিনিময়সভার পর সম্মেলনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আপনার পরিকল্পনা কী?

আ জ ম নাছির উদ্দীন : আমাদের মহানগর কমিটি হয়েছে ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর। কিন্তু দেখা যাচ্ছে ১৯৯৭ সাল কিংবা তার আগে থেকেও তৃণমূলের অনেক কমিটির সম্মেলন হচ্ছে না। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর দফায় দফায় উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে আগে-পরে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াও, এর আগে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আন্দোলন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের বর্ষপূর্তি থেকে আবার বিএনপি-জামায়াতের তাণ্ডবসহ বিভিন্ন কারণে আমরা রাজপথে নানা কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তৃণমূলের সম্মেলন করতে পারিনি। দুই বছর ধরে আবার চেষ্টা করেছি কিন্তু আমরা শুরু করলে আবার কেন্দ্র থেকে সম্মেলন হঠাৎ স্থগিত করা হয়। এবার কেন্দ্রীয় নেতাদের আমি ধন্যবাদ জানাই তাঁরা বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সম্মেলনের সময়সূচি নির্ধারণ করেছেন। আমরা কেন্দ্রের নির্দেশনা মতো সবাইকে নিয়ে তৃণমূলের সম্মেলন আগামী নভেম্বরের মধ্যে শেষ করতে চাই। নগর কমিটির সম্মেলন নির্ভর করছে নেত্রীর নির্দেশনার ওপর। এ বিষয়ে আমাদের সম্পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : আপনার উত্তরসূরি মেয়র পদে মো. রেজাউল করিম চৌধুরী করপোরেশন কেমন পরিচালনা করছেন?

আ জ ম নাছির উদ্দীন : উনি নগর কমিটিরও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে রয়েছেন। একজন সজ্জন রাজনীতিবিদ হিসেবে উনারও প্রথম এবং প্রধান উদ্দেশ্য নগরবাসীর সেবা করা। আমি আমার সময়কালে হাতে নেওয়া অসম্পূর্ণ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ও সমাপ্তির খোঁজ-খবর রাখছি। মেয়র যখনই আমার সহযোগিতা চাইবেন তখনই আমাকে পাশে পাবেন। শুধু মেয়র নয়, বিভিন্ন সেবা সংস্থা নগর উন্নয়নে ও নগরবাসীর প্রয়োজনে যেকোনো উন্নয়নমূলক কাজে আমাকে ডাকলেই সব ধরনের সহযোগিতা পাবে। এটা আমার রাজনৈতিক কমিটমেন্ট। কারণ আমি রাজনীতি করছি মানুষের কল্যাণের জন্য। তাদের আপদে-বিপদে পাশে থাকার জন্য।

 

কালের কণ্ঠ : চট্টগ্রামে আবারও করোনার সংক্রমণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এই নগরে সরকারি দলের শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা ও সাবেক মেয়র হিসেবে আপনার উদ্যোগের বিষয় জানতে চাই।

আ জ ম নাছির উদ্দীন : আপনারা দেখেছেন গত বছর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রাম নগরে যখন প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় এবং লকডাউনের মধ্যে অনেককে যখন কাছে পাওয়া যায়নি, তখন আমি নগরের এমন কোনো সড়ক বা অলি-গলি নেই যেখানে যাইনি, খোঁজ-খবর নিইনি। আশপাশ জীবাণুমুক্ত করতে ব্লিচিং পাউডার আমি নিজেই ছিটিয়েছি। ব্যক্তিগত এবং সরকারি বিভিন্ন উপহার সহায়তা নিয়ে নগরবাসীর পাশে ছুটে গেছি। জনগণের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করার এক পর্যায়ে আমি নিজেও করোনা আক্রান্ত হয়ে পড়ি। অনেক চিকিৎসার পর শেষ পর্যন্ত আমি করোনা জয় করে আবার নগরবাসীর পাশে ছুটে যাচ্ছি। মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মানাতে দিন-রাত সচেতনতামূলক বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছি।

 



সাতদিনের সেরা