kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

সাত জেলায় লকডাউনের প্রথম দিন

গণপরিবহনেই যত কড়াকড়ি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গণপরিবহনেই যত কড়াকড়ি

দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ। বিকল্প হিসেবে অনেকেই বেছে নিয়েছেন ছোট যানবাহন। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের শালনা এলাকা থেকে গতকাল তোলা। ছবি : শরীফ আহমেদ শামীম

গাবতলী, সায়েদাবাদ আর আব্দুল্লাহপুর—এই তিন প্রবেশমুখ দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি কোনো বাস। ঢাকার বড় তিনটি আন্ত জেলা বাস টার্মিনাল থেকেও ছাড়েনি কোনো দূরযাত্রার গণপরিবহন। বন্ধ ছিল লঞ্চ চলাচলও। সাত জেলায় লকডাউন শুরুর দিনে গণপরিবহনেই দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি কড়াকড়ি। এসব জেলার রাস্তাঘাটে লোকজনের ভিড় ছিল আগের মতোই। রাজধানীর আশপাশে গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে লকডাউন থাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সতর্ক চোখ ছিল ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে।

গতকাল লকডাউনের প্রথম দিন সাত জেলায় সরাসরি ট্রেন চলেনি এবং আন্ত নগর ট্রেনগুলোও ওই সব জেলায় বিরতি দেয়নি। তবে গতকাল রাত থেকেই ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। ফলে ঢাকা থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত কোনো ট্রেন ছেড়ে যাবে না, ঢাকায়ও ট্রেন ঢোকার সুযোগ থাকবে না।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিচালন) সরদার শাহাদাত আলী গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বুধবার রাত ১২টার পর থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। বিধি-নিষেধের সাত জেলায়ও রেল চলাচল করবে না। তবে যেসব জেলায় বিধি-নিষেধ নেই, সেখান থেকে অন্য জেলায় রেল চলাচল করতে পারবে।’ 

এদিকে গতকাল সকাল থেকেই ছিল বিরামহীন বৃষ্টি। এর সঙ্গে রাজধানীতে গণপরিবহন ঢুকতে না দেওয়ায় অফিসগামী যাত্রীরা পড়েন ভোগান্তিতে। কারণ সাভার, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের মানুষ রাজধানীর বিভিন্ন অফিসে চাকরি ও ব্যবসা করেন। তাঁরা বৃষ্টিতে ভিজে দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার কর্দমাক্ত পথ মাড়িয়ে রাজধানীর কর্মস্থলে ঢুকেছেন। কেউ কেউ কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে রিকশা, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন বাহনে এসেছেন। হঠাৎ করে দূরপাল্লার বাস বন্ধ করায় ঢাকায় অবস্থানকারী মানুষও পড়ে বিপাকে।

রাজধানীর প্রবেশমুখ গাবতলী দিয়ে গতকাল কোনো গণপরিবহন ঢুকতে বা বের হতে দেওয়া হয়নি। আমিনবাজার ব্রিজের সামনে দিয়েই এসব গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। অনেক মানুষকে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। আবার কাউকে কাউকে আমিনবাজার ব্রিজ পার হয়ে রিকশা-ভ্যানে যেতে দেখা যায়। সড়কে গণপরিবহন না থাকলেও ছিল জনস্রোত। ঢাকায় ঢোকার লেনে ছিল বিভিন্ন গাড়ির জট।

আব্দুল্লাহপুরে দেখা যায়, গন্তব্যে পৌঁছার জন্য কয়েক শ যাত্রী জড়ো হয়ে যানবাহন খুঁজছে, তবে পুলিশের কড়া প্রহরা থাকায় আগের মতো ট্রাক বা পিকআপ ভ্যানে কেউ যাতায়াত করতে পারছে না।

ময়মনসিংহের মামুন মোল্লা মেয়ের চিকিৎসার জন্য পরিবার নিয়ে চার দিন আগে ঢাকা এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘লকডাউনের কথা আমি জানি না, জানতে পারলে রাতে চলে যেতাম, এখন তো মহাবিপদ।’ গাইবান্ধা থেকে ঢাকায় ফেরা মনিরুল হক বলেন, ‘আমাদের বাস ভোরে এসে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ত্রিমোড়ে পৌঁছলে পুলিশ আটকে দেয়। আমি বাস থেকে নেমে ৩০০ টাকায় একটি মোটরসাইকেল ভাড়া করে এসেছি।’

গাজীপুরের শ্রীপুরে পোশাক কারখানায় কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য আব্দুল্লাহপুরে মোটরসাইকেল খুঁজছিলেন শফিকুল আলম। ৮০০ টাকা ভাড়া চাইলে তিনি রেগে বলেন, ‘এমন লকডাউনের কি কোনো মানে আছে? এক দিন অফিসে যেতেই আমার সারা মাসের যাতায়াত খরচ চলে যাবে।’

রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, সৌখিন, শ্যামলী বাংলা, আলম এশিয়া, নেত্র পরিবহনসহ আরো বেশ কয়েকটি পরিবহন কাউন্টারে যাত্রীর ভিড়। কেউ এসেছে অগ্রিম টিকিটের টাকা ফেরত নিতে, কেউ এসেছে নিজ গন্তব্যে যেতে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, শত শত যাত্রী অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। যাত্রীরা জানায়, তারা জানত না লকডাউনের বিষয়টি। গন্তব্যে পৌঁছার জন্য অনেককে মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল খুঁজতে দেখা যায় ।

নোয়াখালী থেকে ইয়াসমিন আক্তার তাঁর মেয়ের বাড়িতে এসেছিলেন দুই দিন আগে। তিনি বলেন, ‘আমি যে এখন কী করুম বুঝতে পারছি না।’ জালাল উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘এক অসুস্থ আত্মীয়কে দেখার জন্য সিলেট থেকে এসেছিলেন। এখন আর ফিরতে পারছেন না।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্লাহ বলেন, ‘আমরা মালিক সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছি দূরপাল্লার বাস বন্ধ রাখার। সরকার লকডাউন ঘোষণা করলে আমাদের তো বিকল্প কিছু থাকে না। দেশের স্বার্থে বহু শ্রমিক আবার বেকার হয়ে পড়বে, দুর্দশায় পড়বে মালিকরা।’

গতকাল সদরঘাট থেকে কোনো লঞ্চ ছেড়ে যায়নি বা আসেনি। ঢাকা নৌবন্দর কর্মকর্তা ও বিআইডাব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক গুলজার হোসেন বলেন, ‘সদরঘাট থেকে কোনো লঞ্চ ছেড়ে যায়নি। লঞ্চ টার্মিনালের প্রবেশপথও বন্ধ রাখা হয়েছে।’

গাজীপুরে গতকাল ছিল ঢিলেঢালা লকডাউন। যাত্রীবাহী বাস ও ট্রেন ছাড়া সড়ক-মহাসড়কে অন্যান্য যানবাহন চলেছে আগের মতোই। বেশির ভাগ সরকারি অফিসে কাজ চলতে দেখা গেছে। দু-একটি ছাড়া প্রায় সব হোটেল-রেস্টুরেন্ট, বাজারের দোকানপাট খোলা ছিল। নগরীতে তেমন তৎপরতা দেখা না গেলেও জেলার সীমান্তে কড়াকড়ি অবস্থানে ছিল পুলিশ। সকালে গাজীপুর চৌরাস্তায় দেখা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বাস ছাড়া সব ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। যাত্রীদের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজি বাইক, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ইত্যাদিতে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। চালু ছিল শ্রমিকবাহী গার্মেন্ট, শিল্প-কারখানার নিজস্ব পরিবহন। শহরের শিল্প অধ্যুষিত বাংলাবাজার, বাঘের বাজার, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, ভোগড়া, বোর্ডবাজার, পুবাইল, টঙ্গীতেও দেখা গেছে একই ছবি। বড় শপিং মল বন্ধ থাকলেও খোলা ছিল ছোটগুলো। নগরীতে স্বাভাবিক সময়ের মতোই মানুষকে চলাচল করতে দেখা গেছে।

মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে সব ধরনের বাস, লঞ্চ ও স্পিডবোট চলাচল বন্ধ ছিল। তবে এ রুটে ফেরি চলাচল করেছে। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ঘাটে মানুষের চাপ ছিল না। পণ্যবাহী গাড়ির ঘাটে কিছুটা চাপ ছিল। হাট-বাজারগুলো ছিল খোলা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়ায় ঢাকামুখী গাড়ি আটকে দেওয়ায় সেখানে বিশাল যানজটের সৃষ্টি হয়। শ্রীনগর উপজেলার মহসড়কের পাশেও বিভিন্ন স্থানে পুলিশ পাহারা ছিল। পুলিশ দূরপাল্লার কোনো গাড়ি চলতে দেয়নি। তবে জেলার বিভিন্ন স্থানে ১০টি চেকপোস্ট থাকলেও ঢাকা থেকে ভেঙে ভেঙে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও পিকআপ ভ্যানে করে লোকজন শিমুলিয়া ঘাটে এসে ফেরিতে নদী পার হয়েছে।

সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ রুটে গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উভয় ঘাট থেকে পণ্যবাহী ট্রাকের সঙ্গে দু-তিনটি করে যাত্রীবাহী বাস পার হতে দেখা যায়। তবে লঞ্চ পারাপার বন্ধ ছিল। এ ছাড়া ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের যাত্রীবাহী বাস তেমন লক্ষ করা যায়নি। বিআইডাব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের ডিজিএম মো. জিল্লুর রহমান বাস পারের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘দৌলতদিয়া প্রান্তে আটকে থাকা দূরপাল্লার কয়েকটি বাস পার করা হয়েছে।’

মানিকগঞ্জ শহরে দোকানপাট বন্ধ থাকলেও রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল ছিল। হঠাৎ লকডাউনের ঘোষণায় বিপাকে পড়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের গণপরিবহনের যাত্রীরা। চাকরি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন কাজে প্রতিদিন মানিকগঞ্জসহ সারা জেলা থেকে কমপক্ষে ৫০ হাজার মানুষ ঢাকায় যাতায়াত করে। বেশির ভাগ যাত্রী বাড়ি ফিরে গেলেও অনেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, হ্যালো বাইক, রিকশা, মোটরসাইকেলে ভেঙে ভেঙে ঢাকায় পৌঁছার চেষ্টা করে।

গোপালগঞ্জে নিষেধাজ্ঞা না মেনে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সড়কে চলাচলকারী থ্রি-হুইলার, অটোরিকশা, রিকশা-ভ্যানে যাত্রী পরিবহনে বিধি-নিষেধ আরোপ করেলেও মানা হচ্ছে না। তবে দূরপাল্লার ও লোকাল বাস চলছে না। মানুষকে সচেতন করতে এবং অপ্রয়োজনে বাইরে না আসতে জেলা শহরের মোড়ে মোড়ে ছিল পুলিশি টহল।

রাজবাড়ী শহরে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বেশির ভাগ দোকান বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। সড়কে গণপরিবহন চলেনি। যদিও যাত্রীদের ছোট ছোট যানবাহনে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে চলাচল করতে হয়েছে।

আরো নতুন এলাকায় লকডাউন : করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশের আরো কয়েকটি এলাকায় সাত দিনের লকডাউন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঝিনাইদহ, যশোরের কেশবপুর ও চৌগাছা, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এবং টাঙ্গাইল ও এলেঙ্গা পৌর এলাকা।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা]