kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

আশ্রয়ণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়

স্থায়ী ঠিকানা পেয়ে উচ্ছ্বাস কৃতজ্ঞতা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্থায়ী ঠিকানা পেয়ে উচ্ছ্বাস কৃতজ্ঞতা

প্রস্তুত ‘নিজেদের বাড়ি’। ভূমিহীনরা আজ উঠবেন এসব ঘরে। গতকাল শ্রীমঙ্গলের মাহাজিরাবাদ এলাকা থেকে তোলা। ছবি : শেখ হাসান

সারা দেশে ভূমি-গৃহহীন পরিবার এবং ১ থেকে ১০ শতাংশ জমি আছে কিন্তু ঘর নেই বা জরাজীর্ণ ঘর রয়েছে—আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর দ্বিতীয় পর্যায়ে এমন ৫৩ হাজার ৩৪০টি পরিবার স্থায়ী ঠিকানা পাচ্ছে আজ রবিবার। দেশের কয়েকটি উপজেলায় এই ঘর উদ্বোধনে ভার্চুয়ালি ঢাকার গণভবন থেকে প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত হবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আনুষ্ঠানিকভাবে ঘর হস্তান্তরকালে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আজ প্রত্যেক উপকারভোগীর হাতে জমিসহ ঘর, কবুলিয়ত, দলিল, নামজারি ও গৃহসনদ হস্তান্তর করা হবে। স্থায়ী আশ্রয়স্থল পেতে যাওয়া মানুষগুলো এরই মধ্যে মেতেছে উচ্ছ্বাস-উল্লাসে। সরেজমিনে ঘুরে গতকাল শনিবার সেই আনন্দের চিত্র তুলে ধরেছেন কালের কণ্ঠ’র স্থানীয় প্রতিনিধিরা।

ময়মনসিংহ : ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রথম পর্যায়ে ঘর পায় সহায়-সম্বলহীন ৫০টি পরিবার। আজ পাচ্ছে আরো ৯০টি পরিবার। গত শুক্রবার উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে রাজিবপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চল লাটিয়ামারি চরের ওই প্রকল্পের একটি স্থান ঘুরে দেখতে গেলে কথা হয় নতুন ঠিকানা পাওয়া মানুষের সঙ্গে। এখানে ১৫টি পরিবার পাচ্ছে নতুন ঠিকানা। ঘর বরাদ্দপ্রাপ্তদের একজন বেলী রানী রবিদাস (৫৫)। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বললেন, আমরার ঠিকানা ছিল না মানে কিছুই ছিল না। অহন একটা স্থায়ী ঠিকানা হইছে। এইডা করছুইন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ঠিকানা পাইয়্যা অহন আমরার পুরা পরিবারের ভবিষ্যৎ শুরু হইছে।’

কুলসুম বেগম, জিতেন্দ্র, সুনীল, গীতা রানী, দিপালী রানী, যতন রবীদাস—ঘর বরাদ্দপ্রাপ্ত এসব হতদরিদ্র মানুষও তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বাঁধভাঙা আনন্দ প্রকাশ করেন।

শেরপুর : ‘আমার তো কোনো জমি-জিরাত নাই, ঘরদোর নাই। ৩৩ বছর কষ্ট কইরা মানুষের বাসায় বাসায় কাম কইরা চলছি। এহন শেখ হাসিনা আমাদের জমিডা দান করল, ঘর কইরা দিল। আশা করি, এহন এহানে বসবাস করতে পারব।’

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার হলদিগ্রামে নবনির্মিত গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব নির্মলা রায় এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। গৃহহীন জমিলা বেগম বলেন, ‘আমাগো তো কিছুই আছিল না। প্রধানমন্ত্রী আমাগো নিজে ঘর ও জমি তুলে দিতাছে, আমরা খুশি অইছি। আমরা দোয়া করি, প্রধানমন্ত্রী মেলা দিন বাইছা থাহুক।’ ঘর বরাদ্দপ্রাপ্ত আরেকজন নিশা রানী হাজং বলেন, ‘বাপু রে, মেলা কষ্ট করে ঝুপড়ি-টুপড়ি বাইন্ধা পাহাড়ের ঢালুতে থাকতাম। মেলা জায়গায় ঘুরছি। কেউ থাহার জাগা দেয় নাই। প্রধানমন্ত্রী ঘর দিতাছে, জাগাও দিল। আমরা খুব খুশিতে আছি।’

হলদিগ্রাম গুচ্ছগ্রামে ২৫টিসহ শেরপুরে মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে এবার জমিসহ ঘর পাচ্ছে ১৬৭টি ভূমি-গৃহহীন পরিবার।

কুড়িগ্রাম : ‘নদী ভাঙার পর মানুষের কাইচা, ছইনচার মধ্যে ঝাটা বান্ন্যের ডাং খায়া ১২ বচ্চর কাটাইছি। এত দিন পর নিজের একটা ঘর পামো। খাই না খাই নিজের ঘরোত নিন্দ পাইরব্যার পামো।’ ভূমিহীন ছিন্নমূল রঞ্জিনা দীর্ঘ ১২ বছর পর নিজের ঠিকানা পেয়ে উচ্ছ্বাসমাখা কণ্ঠে বলছিলেন কথাগুলো।

সদর উপজেলার ধরলা নদীর তীরবর্তী ধরলা আবাসনে আজ আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে রঞ্জিনার পরিবারের মতো প্রায় এক হাজার ১০০ পরিবার। গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে ধরলা আবাসন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বরাদ্দ পাওয়া প্রতিটি পরিবারে বইছে আনন্দের বন্যা।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় দফায় সদরে ১০০, ফুলবাড়ীতে ১০৫, উলিপুরে ১৫০, চিলমারীতে ৩০০, রৌমারীতে ২০১টিসহ এক হাজার ৭০টি ঘরের বেশির ভাগই নির্মাণ শেষে হস্তান্তরের অপেক্ষায় রয়েছে।

গাইবান্ধা : চারদিকে সবুজ প্রকৃতি ও ঘরবাড়ি, মাঝখানে নতুন একটি ছোট্ট বাড়ি। বাড়িটি সবার দৃষ্টি কাড়ছে। বাড়ির শোবার ঘর, রান্নাঘর—সব কিছুই নতুন। স্ত্রী ও মেয়েদের হাত ধরে আজ এই নতুন বাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন মোফাজ্জল হোসেন। সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের খামার রঘুনাথপুর গ্রামের এই হতদরিদ্রের মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় তিনি পেতে যাচ্ছেন স্থায়ী ঠিকানা।

গতকাল বিকেলে সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে কথা হয় মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘কোনো দিন নিজের বলিয়্যা কোনো ভিটা আছিল না। এত দিনে বঙ্গবন্ধুর বেটি ভালোবাসিয়া একান বাড়ি দিল। আল্লাহ তাঁর ভালো করুক।’

প্রশাসন সূত্র জানায়, গাইবান্ধা জেলায় আজ এক হাজার ৪৩০টি পরিবারের মধ্যে ঘর ও জমির দলিল হস্তান্তর করা হবে। এর মধ্যে সদরে ২০০, সুন্দরগঞ্জে ২০০, গোবিন্দগঞ্জে ৩৫০, সাদুল্যাপুরে ২০০, ফুলছড়িতে ৩৬০, সাঘাটায় ৮০ ও পলাশবাড়ী উপজেলায় ৪০টি।

ঝালকাঠি : শিশু বয়সেই বাবাকে হারান শামিম মোল্লা (৩০)। একটা সময়ে এসে মা-ও মারা যান। অনিশ্চিত এক জীবনের মুখোমুখি হন শ্রবণপ্রতিবন্ধী শামিম। শামিমের সেই নিদারুণ দুঃখের জীবনে এখন আনন্দের বন্যা বইছে। উপজেলার বড় কৈবর্তখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পে তিনি ২ শতাংশ জমিসহ একটি ঘরের মালিক হচ্ছেন আজ।

একই আশ্রয়ণ প্রকল্পে জমিসহ ঘর পাচ্ছেন বৃদ্ধ ভ্যানচালক শাহজাহান মিয়া (৬০)। প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আবেগে তিনি কেঁদে ফেলেন। বলেন, ‘মুই দলানে থাকমু! এয়া কোনো দিন স্বপ্নেও দেহি নাই। মাইয়া-পোলা লইয়্যা এহোন ইট্টু শান্তিতে ঘুমাইতে পারমু। মুই দোয়া হরি, শেখ হাসিনারে যেন আল্লা নেক হায়াত দেয়।’

জেলায় আজ ৩১৯ পরিবার পাচ্ছে জমিসহ ঘর। এর মধ্যে সদরে ১২, নলছিটিতে ৭০, রাজাপুরে ৩৭ এবং কাঁঠালিয়ার ২০০টি পরিবার রয়েছে।

সুনামগঞ্জ : ‘আগে মাইনসের দাইরো ছেইছো থাখছি, অনে পাকা ঘরে তাকি। শেখ হাসিনায় একখান পাকা ঘর দিছইন। আমার লাখান আরো অনেক মানুষরে শেখ হাসিনায় পাকা ঘর দিছইন। এখন আমরা বাইচ্চাকাইচ্চা লইয়া আরামো আছি। হাসিনারে আল্লায় বালা রাখউক্কা।’

ভূমিসহ পাকা ঘর পেয়ে এভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন হাওরাঞ্চলের নারীরা। শুধু পুরুষ নয়, তাঁদের স্ত্রীদের নামেও সরকার যৌথ কাগজে জমি ও ঘরের মালিকানা লিখে দিচ্ছে। সে কারণে পুরুষের তুলনায় নারীরা আরো বেশি খুশি।

সরেজমিন বৃহস্পতিবার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার খাইক্কারপাড় ও একই উপজেলার নবীনগর গ্রামে গিয়ে উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে কবুলিয়ত দলিল পাওয়ার আগেই তারা ঘরে উঠে গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ২৬১টি ঘরের মধ্যে আজ আরো ১০টি ঘরের কাগজপত্র হস্তান্তর করবেন।

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) : কুলাউড়া উপজেলার ১০০ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার ঘর পাচ্ছে আজ। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাদের জন্য তৈরি হয়েছে স্বপ্নের বাড়ি। গতকাল দুপুরে কর্মধা ইউনিয়নের টাট্টিউলী এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ১০টি নতুন ঘরে ব্যবহার করা হয়েছে সবুজ রঙের টিন। দুই কক্ষবিশিষ্ট বাড়িতে রয়েছে একটি রান্নাঘর, টয়লেট ও স্টোররুম। নির্মাণকাজ শেষে ঘরগুলো হস্তান্তরের অপেক্ষায়।

ঘর বরাদ্দপ্রাপ্তদের একজন ফয়জুন বেগম (৪৬)। এই বিধবার জীবন চলে অন্যের বাড়িতে কাজ করে। আরেক গৃহপরিচারিকা আজিরুন বেগমেরও (৪৫) স্বামী বেঁচে নেই। দুজনেরই বাড়ি কুলাউড়ার কর্মধা এলাকায়। গৃহহীন হয়ে এত দিন বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে আশ্রিত ছিলেন। এখন সরকারি ঘর পেয়ে তাঁরা বেজায় খুশি। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁরা বলেন—শেখের বেটির কারণে আমরা নতুন ঘর পাচ্ছি। কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি একটি পাকা ঘর পাব। এখনো এটাকে স্বপ্ন মনে হচ্ছে।

 



সাতদিনের সেরা