kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

উপকূলে বাঁধ তৈরি ও রক্ষায় যথেষ্ট কাজ হচ্ছে না

ড. আতিক রহমান, বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদ

২৮ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উপকূলে বাঁধ তৈরি ও রক্ষায় যথেষ্ট কাজ হচ্ছে না

ঘূর্ণিঝড় ইয়াস আমাদের দেশে সরাসরি আঘাত না হানলেও এখানে প্রভাব পড়েছে। বিপুল জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চল। অনেক এলাকায়ই বাঁধ ভেঙে গেছে। প্রতিবছরই সরকারকে এমন ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। এর পরও বাঁধগুলো টেকসই হচ্ছে না কেন, এতে সরকারের কোনো দপ্তরের গাফিলতি আছে কি না, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আগামী দিনে আমরা কী ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারি, করণীয়ই বা কী—এসব বিষয় নিয়ে কালের কণ্ঠ’র মুখোমুখি হয়েছিলেন বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদ এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. আতিক রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শরীফুল আলম সুমন।

 

কালের কণ্ঠ : শুরুতেই আপনার কাছ থেকে আমরা ঘূর্ণিঝড় ইয়াস সম্পর্কে জানতে চাইব।

আতিক রহমান : ইয়াস ছিল একটি সুতীব্র সাইক্লোন। এই সাইক্লোনের একটি পাগলামি আছে। এটি হঠাৎ করেই পথ বদলাতে পারে। ইয়াসের আঘাতটা পড়েছে ভারতের ওড়িশার দিকে। প্রভাব পড়েছে পশ্চিমবঙ্গেও। বাংলাদেশে এই ঘূর্ণিঝড়ের লেজটা ছোঁয়া দিয়ে গেছে। আর তখন ছিল অমাবস্যা। এর ফলে জোয়ারটা স্বাভাবিকের চেয়ে দুই ফুট উচ্চতায় বেড়ে গেছে। এতে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুরো সুন্দরবন ডুবে গেছে। বাদ যায়নি কুয়াকাটা, সেন্ট মার্টিনও। জোয়ারের পানিতে তলিয়ে জীববৈচিত্র্য, মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলসহ নানা সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : আমরা দেখেছি, ইয়াসের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকার অনেক বাঁধ ভেঙে গেছে। অনেক মানুষ এখনো পানিবন্দি। বাঁধগুলো কেন ভাঙছে?

আতিক রহমান : উপকূলে বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষায় যথেষ্ট কাজ হচ্ছে না। যে দায়িত্বটি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দেওয়া হয়েছিল সেটি তাদের দ্বারা হচ্ছে না। কবে বাঁধ ভাঙবে, এরপর সেটা মেরামত—তাদের এমন চিন্তা-ভাবনা ফলদায়ক নয়। বাঁধ মেরামত করতে হবে শুষ্ক সময়ে ও শক্তভাবে। কোথায় কোথায় ক্র্যাক আছে তা খুঁজে বের করতে হবে। বলা হয়ে থাকে, ইঁদুর গর্ত করে বাঁধগুলো দুর্বল করে দেয়। কোথায় ইঁদুর আছে তা গ্রামগঞ্জে সবাই জানে। শুষ্ক অবস্থায় সেগুলো বন্ধ করে বাঁধ আরো উঁচু করতে হবে। কিন্তু সেটা একদমই হচ্ছে না। বাঁধের ক্ষতি হয়ে গেলে তা সংস্কার খুব কঠিন। একবার ভাঙলে সেটা অনেক বড় হয়ে যায়। ফলে সেই বাঁধ আর ঠিক হয় না। পানি উন্নয়ন বোর্ড এই কাজগুলো না পারলে নতুন কাউকে দায়িত্ব দিতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ : উপকূলীয় জনপদে বাঁধ উপচে পানি ঢুকে পড়ছে কেন?

আতিক রহমান : বাঁধগুলো আমাদের গ্রামাঞ্চলকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। ষাটের দশকে বন্যা রক্ষা বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। এরপর বহু রাস্তাঘাট হয়েছে। সেগুলোও বাঁধের কাজ করছে। আমরা দেখছি, সাইক্লোনের ফলে এবং পানি চলাচলের অসুবিধার ফলে নদী ভরে যাচ্ছে। এরপর চর সৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের দেশে বছরে প্রায় ২.৪ বিলিয়ন টন পলি নদী হয়ে সাগরে পড়ছে। ফলে অল্প বাতাস বা সাইক্লোন হলেও বাঁধগুলো উপচে পানি গড়িয়ে পড়ছে। এতে বাঁধগুলো ভেঙে যাচ্ছে। কৃষকের ফসল নষ্ট হচ্ছে।

 

কালের কণ্ঠ : জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সাইক্লোনের সম্পর্ক কতটা?

আতিক রহমান : বায়ুমণ্ডলের যে চরিত্র আছে সেটা এবং মৌসুমি বায়ুর প্রাধান্য ও জলীয়বাষ্পের সমন্বয়ে তৈরি হয় সাইক্লোন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উষ্ণতা বেড়ে যায়। তাতে সমুদ্রের ওপরের তাপমাত্রাটাও বেড়ে যায়। গত ৩০ বছরে এটা সামগ্রিকভাবে ১.২ ডিগ্রির মতো বেড়েছে। আর বর্তমান সময়ে তা বাড়ছে দ্রুততার সঙ্গে। এর ফলে বেশি বাষ্প তৈরি হয়। আর বেশি বাষ্প হলে সাইক্লোনটার বেশি ওজন হয়ে যায়। ফলে এটা ধাক্কা মারে জোরে, শক্তিও বেড়ে যায়। এতে মেগা সাইক্লোন তৈরি হয়। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘন ঘন সাইক্লোন হচ্ছে। আগে যেখানে ১০-১২ বছর পর পর সাইক্লোন আসত, এখন তা প্রতিবছরই আসছে।

 

কালের কণ্ঠ : সাইক্লোন থেকে রক্ষায় করণীয় কী?

আতিক রহমান : প্রথমেই নদীগুলোতে দুই ধরনের ড্রেজিং করতে হবে। একটা হবে রেগুলার ড্রেজিং, অন্যটা প্রিন্সিপাল ড্রেজিং। এরপর নদী ও খালগুলো খুলে দিতে হবে। পরিকল্পিতভাবে যুগোপযোগী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। তা নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও করতে হবে। আর তাহলেই আমরা সাইক্লোন-জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগ ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পারব। উপকূলীয় এলাকার পাবলিক স্ট্রাকচারগুলোকে শেল্টার বানাতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ : জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সরকারের করণীয় কী?

আতিক রহমান : সরকারের বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয় আছে। জলবায়ু অনেক বড় ব্যাপার, অনেকটাই ভিন্ন ও দুর্যোগসম্পন্ন ব্যাপার। পরিবেশ মানে জলবায়ু নয়, আর জলবায়ু মানে পরিবেশ নয়। এ জন্য এ তিনটি বিষয় নিয়ে একটি মন্ত্রণালয় করার পক্ষপাতী আমি নই। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে স্বতন্ত্র একটি মন্ত্রণালয় হওয়া উচিত।

 

কালের কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ।

আতিক রহমান : আপনাকেও ধন্যবাদ।