kalerkantho

সোমবার । ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৪ জুন ২০২১। ২ জিলকদ ১৪৪২

এবার চ্যালেঞ্জ ভীতিজয়ের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এবার চ্যালেঞ্জ ভীতিজয়ের

দুর্গম ঈদ যাত্রার পর এবার জনস্রোত ঢাকামুখী। করোনাকালে স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই কারো। গতকাল শিমুলিয়া ঘাট থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঈদ ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে চলে কেনাকাটার ধুম। বড় বড় শপিং মল, বিপণিবিতান কিংবা কাঁচাবাজারে গিজগিজ করছিল মানুষ। শুধু উড়োজাহাজ ছাড়া যোগাযোগের সব মাধ্যম—দূরপাল্লার বাস, ট্রেন, লঞ্চ বন্ধ রাখা হলেও ঘরমুখী মানুষের গাদাগাদি ঈদ যাত্রা ঠেকানো যায়নি। গ্রামমুখী মানুষের বেপারোয়া ঢলে ভেঙে পড়ে সরকারের প্রতিবন্ধকতা, উবে যায় সব নির্দেশনা।

মার্কেটে মার্কেটে, সড়কে সড়কে এমন মানবস্রোত দেখে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা দুই সপ্তাহের মধ্যে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পারদ ফের ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার শঙ্কা করছেন। এখন এই ভীতি জয় করা সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে ঢাকাসহ সারা দেশের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতি, অন্যদিকে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ—এ দুটি দিক নিয়েও সরকারকে ভাবতে হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে সরকারকে গ্রাম থেকে ঢাকামুখী মানুষের ঢল ঠেকানোর পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে মানুষের ঢাকায় ফেরা বিলম্বিত করা যায়, তেমন কৌশল প্রয়োগের ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো কোনো মহল থেকে পোশাক, বেসরকারি শিল্প-কারখানা ও মার্কেটগুলো এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখারও পরামর্শ দেওয়া হয়। কেউ কেউ অবশ্য ধাপে ধাপে খুলে দেওয়ার কথাও বলেন। যদিও সব কিছু পর্যালোচনা করে গতকাল রবিবার সরকার নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে চলমান বিধি-নিষেধ ২৩ মে পর্যন্ত বাড়িয়েছে। যদিও সেখানে বাড়তি কঠোর কোনো নির্দেশনা নেই। ঈদের আগে যে যেভাবে ঢাকা ছেড়েছে, তাদের সেভাবেই রাজধানীতে ফিরতে হবে। দূরপাল্লার বাস, লঞ্চ ও ট্রেন যথারীতি বন্ধই থাকছে। তবে জেলা ও সিটির মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চলবে। খোলা থাকবে শপিং মল, দোকানপাটও।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সামনে যে শঙ্কা রয়েছে, সেটা জয় করাই এখন চ্যালেঞ্জ। সেটা তো এমনি এমনি হবে না। এ জন্য কৌশলী হতে হবে। সেটা কতটা হচ্ছে তা-ই প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে ঢাকা ফেরার ব্যাপারে সরকারের কৌশলটি আরো সুপরিকল্পিত হওয়া উচিত ছিল। গার্মেন্ট, শিল্প-কলকারখানা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি সময়সীমা ধরে এক সপ্তাহ বন্ধ রাখা উচিত ছিল। নয়তো সব খোলা রেখে যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে লাভ হবে না। কর্মস্থল খোলা থাকলে কর্মীরা যেভাবেই পারবে চাকরি বাঁচানোর জন্য ছুটে আসবেই। ফলে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়ার জরুরি।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব রেজাউল ইসলাম স্বাক্ষরিত নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, করোনা সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আগের সব বিধি-নিষেধ ও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ২৩ মে মধ্যরাত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। গতকালের প্রজ্ঞাপনে দুটি নতুন বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমত, সরকারের রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব দপ্তর ও সংস্থাও জরুরি পরিষেবার আওতাভুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুধু খাদ্য বিক্রি করা যাবে, অর্থাৎ কেউ রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খেতে পারবে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাজেট সামনে রেখে রাজস্ব আদায়ের সব অফিস নিয়মিত খোলা রাখা দরকার, এ কারণে রাজস্ব অফিস সংক্রান্ত বিষয়টি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে রেস্তোরাঁয় বসে  খাওয়া যাবে না—এটা আগের প্রজ্ঞাপনে থাকলেও নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, ঈদ ঘিরে সরকারের বিধি-নিষেধের পরও মানুষ যেভাবে চলাচল করেছে, তাতে সংক্রমণ কতটা বাড়বে সেটা বুঝতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় দরকার। সেই চিন্তা থেকেই আপাতত ২৩ মে পর্যন্ত বিধি-নিষেধ বাড়ানো হয়েছে। সংক্রমণ পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি না হলে শুধু পর্যবেক্ষণের জন্য সেটা ২৯ মে পর্যন্ত বাড়তে পারে।

জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, মানুষের চলাচল সংক্রমণ বাড়ার নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে। তাই বিধি-নিষেধ বাড়ানো হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরবর্তী সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি বুঝে নেওয়া হবে।

করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা সামলাতে গত ১৪ এপ্রিল থেকে আট দিনের কঠোর ‘লকডাউন’ ঘোষণা করেছিল সরকার। এরপর পর্যায়ক্রমে লকডাউনের কঠোরতা কমে আসে। সর্বশেষ গত ২৫ এপ্রিল থেকে দোকানপাট ও শপিং মল খুলে দেওয়া হয়। খোলা আছে অভ্যন্তরীণ গণপরিবহন। তবে লেনদেনের সময় কমিয়ে দিয়ে সব ব্যাংকের সব শাখা খোলা আছে এবারের লকডাউনে। এখন লকডাউন চলছে মূলত দূরপাল্লার পরিবহনের ওপর। তাই অনেকে এই অবস্থাকে ঢিলেঢালা লকডাউন হিসেবে অবহিত করছেন।

জরুরি প্রয়োজনের কাজ ছাড়া সরকারি বেশি ভাগ অফিস এখন বন্ধ। ঈদের ছুটি শেষে জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত অফিস খুললেও গতকাল প্রথম কার্যদিবসে কোনো সরকারি অফিসেই তেমন উপস্থিতি ছিল না। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন, অর্থ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কিছু মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন করে কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন।

সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে ঈদের ছুটিতে রাজধানী ছাড়তে পারেননি বেশির ভাগ পোশাককর্মী। তবে কেউ কেউ গ্রামের বাড়ি গেলেও এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো পরিসংখ্যান নেই। পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ এবং এ খাতের শ্রমিক নেতারা জানান, গতকাল খুব কমসংখ্যক কারখানা খুলেছে। তবে এই সপ্তাহের মধ্যে ধাপে ধাপে পুরোপুরি কারখানা চালু হবে বলে তাঁদের আশা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান জানান, গতকাল কিছু কারখানা খুলেছে। তবে সংখ্যায় খুব কম। তিনি আশা করছেন, এই সপ্তাহের মধ্যে ধাপে ধাপে পোশাক কারখানাগুলো চালু হবে। কতসংখ্যক পোশাক শ্রমিক রাজধানীর বাইরে গেছে, এমন কোনো পরিসংখ্যান তাঁর কাছে নেই।

এ ব্যাপারে শ্রমিক নেতা সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, এখনো উল্লেখ করার মতো তেমন কারখানা খোলেনি। এই সপ্তাহের শেষে এবং আগামী সপ্তাহের শুরুতে বেশির ভাগ কারখানা খুলে যাবে। তিনি বলেন, বেশির ভাগ শ্রমিক ছুটিতে তাঁদের কর্মস্থল ছাড়েননি। তবে যেসব শ্রমিক অগ্রিম কাজ করেছেন, তাঁদের কেউ কেউ পাওনা ছুটি ভোগ করতে পারেন।

গাজীপুর অঞ্চলের গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মো. সোহেল রানা বলেন, গতকাল কাশিমপুর অঞ্চলের কোনো পোশাক কারখানা খোলা না থাকলেও একটি জুতার কারখানা খোলা ছিল। তবে আগামী বুধবার থেকে বেশির ভাগ পোশাক কারখানা খোলা থাকবে বলে তিনি জানান।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা হাসপাতালগুলোকে আগের চেয়ে আরো বেশি গতিশীল করে গড়ে তুলতে কাজ করছি। গেল কয়েক দিনে আইসিইউ বাড়ানো হয়েছে আরো কিছু হাসপাতালে, অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব কাজ চলমান রয়েছে। টিকাসংকট কাটানোর কাজও চলছে। করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। পাশের দেশ থেকে যারা আসছে, তাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কোয়ারেন্টিনে রাখা হচ্ছে।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, মানুষের সচেতনতা না বাড়লে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা আসলেই কঠিন।