kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

জীবিকার কঠিন সংগ্রামে কোটি মানুষ

মাসুদ রুমী   

২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



জীবিকার কঠিন সংগ্রামে কোটি মানুষ

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দিতে সরকার গত ১৪ এপ্রিল থেকে সারা দেশে সর্বাত্মক ‘লকডাউন’ ঘোষণা করে মানুষকে ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। এতে একদিকে সংক্রমণ কমার আশা জাগছে; কিন্তু অন্যদিকে শ্রমিক-কর্মচারী, দিনমজুর, কারিগর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ সাধারণ খেটে খাওয়া কোটি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। করোনার প্রথম ধাক্কার সময় গত বছর সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার দ্বিতীয় ঢেউ আরো ভয়াবহভাবে আঘাত হানলেও সমাজের বিত্তশালীদের ত্রাণ তৎপরতায় দেখা যাচ্ছে না। সরকারও ত্রাণ বিতরণসহ খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম সেভাবে শুরু করেনি। এমন পরিস্থিতিতে কোটি মানুষ জীবিকা নিয়ে কঠিন সংকটে পড়েছে। জীবিকা বাঁচাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু করার দাবি উঠেছে।

যেসব এলাকায় করোনার প্রকোপ কম সেসব এলাকায় লকডাউন শিথিল করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরাও। তাঁরা বলছেন, করোনার অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলায় স্মার্ট লকডাউন অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষের আয়ের পথ খোলা রেখে করোনার বিস্তার রোধের ব্যবস্থা করতে হবে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য চলমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পাশাপাশি সহায়তার বিশেষায়িত কর্মসূচি নিতে হবে।

করোনায় দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে দুই কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ উদ্যোগে জরিপে দেখা গেছে, ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে এই ‘নতুন দরিদ্র’ শ্রেণির সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১৪.৭৫ শতাংশ হয়েছে, ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত যা ছিল ২১.২৪ শতাংশ। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান আশঙ্কা করেছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরো প্রকট করে তুলতে পারে।

গবেষণায় করোনার প্রভাবে স্বল্প আয় ও বেকারত্বের পাশাপাশি কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারের প্রকৃতি বদলে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। কভিডের কারণে অনেককেই পেশা পরিবর্তন করতে হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে নতুন পেশায় যুক্ত হয়েছে। অনেকে দক্ষ শ্রমিক থেকে বেতনভুক্ত কর্মী এবং কারখানার কর্মীরা দিনমজুর হিসেবে কাজ শুরু করেছেন।

করোনার প্রথম ধাক্কায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ হারিয়েছিল। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) গবেষণা মতে, কর্ম হারানো মানুষের সংখ্যা দেড় কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। দারিদ্র্যের হার ১৫ শতাংশ বেড়েছিল।

পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর গতকাল কালের কণ্ঠকে বলছিলেন, ‘উন্নত দেশের অনেক অর্থ আছে, তারা দিনের পর দিন লকডাউন চালাতে পারে। আমাদের প্রয়োজন ও সামর্থ্য বুঝে সীমিত আকারে লকডাউন দিতে হবে। সমস্যা মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামে। সারা দেশে লকডাউন দিয়ে লাভ নেই। ঢাকা ও চট্টগ্রামকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে করোনা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে বস্তিবাসী, রিকশাওয়ালাসহ দরিদ্রদের জন্য খাদ্য সহায়তা দিতে হবে।’ তিনি বলেন, সতর্কতা, কিছুটা বাধ্যবাধকতা ও সামাজিক চেতনা ঠিক থাকলে এবং টিকা কার্যক্রম জোরদার করলে করোনা নিয়ন্ত্রণে আসবে। এ জন্য বেসরকারি খাত তথা অর্থনীতির যাতে অযথা রক্তক্ষরণ না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। না হলে দারিদ্র্য বাড়বে, সমাজে অস্থিরতা তৈরি হবে। 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, করোনায় দেশে এক কোটি ৬৮ লাখ মানুষ গরিব হয়ে পড়েছে। ২০১৭ সালে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ দরিদ্র ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে ৩৩ শতাংশ হয়েছে। করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ম্যানুফ্যাকচারিং, নির্মাণ, ট্রান্সপোর্ট, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা এবং খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। মাঝামাঝি ঝুঁকিতে রয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, অভ্যন্তরীণ সেবা ও শিক্ষা প্রদানকারী সংস্থাগুলো। কম ঝুঁকিতে রয়েছে কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও তথ্য যোগাযোগ খাত।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম দেখান, সারা দেশে শ্রমজীবী মানুষের বেতন কমেছে ৩৭ শতাংশ। ঢাকায় বেতন হ্রাস পেয়েছে ৪২ ও চট্টগ্রামে ৩৩ শতাংশ। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ৬৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। দেশের ২০ শতাংশ পরিবারের আয় কমে গেছে। ৬৯ শতাংশ চাকরিজীবী চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন, যাঁরা দেশের অর্থনীতিতে ৪৯ শতাংশ অবদান রাখেন।

সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, করোনায় সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছেন দিনমজুর, পরিবহন কর্মচারী, রাস্তার দোকানদার, হকার, চা বিক্রেতা ও ইনফরমাল সেক্টরে কর্মরতরা। তাঁদের ৬৩ শতাংশ ঘর ভাড়া দিতে পারেনি, ৩৯ শতাংশ ইউটিলিটি বিল, ৩৬ শতাংশ স্কুল ফি দিতে পারেনি। ৫৭ শতাংশ গরিব মানুষ গ্রামে টাকা পাঠাতে পারেনি। ৪৭ শতাংশ শহুরে মানুষ তাদের খাবার গ্রহণ কমিয়েছে এবং  দেশের ৩২ শতাংশ মানুষ সার্বিকভাবে তাদের খাবার গ্রহণ কমিয়েছে। ৬৭ শতাংশ শহুরে মানুষ আর গ্রামের ৩২ শতাংশ মানুষ তাদের সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে।

বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনায় দিনমজুর, রিকশাওয়ালা, রাস্তার ধারের হকারসহ নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যা দরিদ্র মানুষের জন্য বাড়তি ও অসহনীয় চাপ তৈরি করেছে। ৬৫.৭১ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। ৩৭.১৪ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে খাদ্যসহ দৈনন্দিন চাহিদা মেটাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এই অর্থনীতি লকডাউনের চাপ কতটা নিতে পারবে তা ভাবা দরকার। লকডাউনে রপ্তানি শিল্পসহ বেশ কিছু জরুরি শিল্পপ্রতিষ্ঠান খোলা আছে। ফলে তাদের ক্ষতি কম। কিন্তু নানা পণ্য উৎপাদনকারী অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র পণ্যের উদ্যোক্তা, যাঁরা ঈদসহ নানা উৎসব ঘিরে তাঁদের পণ্য বিক্রয়ের পসরা সাজান, তাঁরা পড়েছেন মারাত্মক বিপাকে। সেই সঙ্গে আছে পর্যটন, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, পার্লার, নানা রকম আইসিটি সম্পৃক্ত সেবা, যারা তাদের কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারছে না। এসব উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন লাখো কারিগর, শ্রমিক-কর্মচারী। এসব খাতের উদ্যোক্তাদের পক্ষে তাঁদের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন কত দিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব? অনেক উদ্যোক্তা সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা পাননি।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের উজ্জ্বল চিত্রের পাশাপাশি দুর্বল দিক হচ্ছে আয়বৈষম্য। সেই আয়বৈষম্য আরো বাড়বে যদি আমরা বড় বড় উদ্যোগকে শুধু লকডাউনের আওতার বাইরে রাখি আর ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো হিমশিম খেতে থাকে বেঁচে থাকার জন্য। তাই আগামীর প্রণোদনা হতে হবে শুধু এই অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য।’ 

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে, ঈদুল আজহার সময় ১২ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার প্রথম ঢেউয়ে গত ঈদ, পহেলা বৈশাখে ব্যবসা করতে না পেরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়েছেন। ধার-দেনা করে কিছু পুঁজি বিনিয়োগ করে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলাম। এর মধ্যেই আবার এসে গেল লকডাউন। এবারও বৈশাখ, রমজান, ঈদের ব্যবসা নিয়ে আশাভঙ্গ হলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আকুল আবেদন, আমাদের ঋণ-প্রণোদনা যেভাবেই হোক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাতে নগদ অর্থ পৌঁছাতে হবে। না হলে আমাদের ৫৪ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর অর্ধেকই ব্যবসা থেকে ছিটকে পড়বে।’

দুই দফায় বৈশাখ ও ঈদের মতো বড় মৌসুমে ব্যবসার সুযোগ হারিয়ে পথে বসার জোগাড় হয়েছে বলে জানালেন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সভাপতি দিলীপ কুমার আগরওয়াল। তিনি কালের কণ্ঠকে বলছিলেন, ‘দ্বিতীয়বারের মতো দেশের কোথাও কোনো জুয়েলারিতে হালখাতার অনুষ্ঠান হয়নি। আমাদের ভ্যাট রেজিস্ট্রেশনভুক্ত ২০ হাজার জুয়েলারি দোকান আছে। এক লাখ ৬০ হাজার মানুষ চাকরি করে এবং তাদের পরিবারসহ আট লাখ মানুষ সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জুয়েলারিশিল্পের সঙ্গে ২০ লাখ মানুষ জড়িত, যারা করোনায় ভয়াবহ সংকটে আছে। এবারের ঈদের বাজারও ধরতে পারব কি না, জানি না। টিকে থাকতে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ চাই।’ তিনি বলেন, ‘বৈশাখ বা হালখাতা করতে না পারায় আমাদের পুঁজির ৫০ শতাংশ ক্ষতির সম্মুখীন হবে বা অনিশ্চয়তার মধ্যে চলে যাবে। আমাদের মোট ব্যবসার ২৫ শতাংশ আসে বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে, ২৫ শতাংশ আসে বৈশাখে, ২৫ শতাংশ আসে ঈদে এবং সারা বছর আসে ২৫ শতাংশ। গত বছর আমাদের ৭০ শতাংশ ব্যবসার ক্ষতি হয়েছে। ১২০০ থেকে ১৩০০ ব্যবসায়ীর ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে।’

ট্যুর অপারেটস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) বলছে, ২০২০ সালে তাদের ক্ষতির পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। নতুন করে শুরু হওয়া লকডাউনকে ‘কফিনের শেষ পেরেক’ উল্লেখ করে টোয়াবের সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান বলেন, ‘প্রথম ঢেউ থেকে অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাত কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছিল। কিন্তু বহির্গামী পর্যটন বন্ধ থাকায় মূলধারার ট্যুর অপারেটররা চরম সংকটে দিন পার করছে। সরকারের সহায়তা না পেলে কর্ম হারাবে কোটি মানুষ।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান স্মার্ট লকডাউনসহ সরকারকে পাঁচটি করণীয় কার্যকর করার প্রস্তাব করেছেন। সারা দেশকে এককভাবে বিবেচনা না করে সংক্রমণের হার ও মাত্রাভেদে সারা দেশকে হটস্পটের দিক থেকে বিবেচনা করা জরুরি। তখন লকডাউন কাজে দেবে।

 



সাতদিনের সেরা