kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার কামনা ব্যাংকারকন্যার

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

২০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার কামনা ব্যাংকারকন্যার

মোবাশ্বিরা জাহান চৌধুরী জুম। বয়স ১২। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবার ছবি এঁকে সেই ছবির নিচে স্লোগান লিখেছে, ‘জাস্টিস ফর মাই ড্যাডি’। সে ছবিটি প্রধানমন্ত্রীকে দেখাতে চায়। তার বাবা মোর্শেদ চৌধুরী যাঁদের কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন তাঁদের বিচার চায় জুম।

জুমের মা ইশরাত জাহান চৌধুরী বলেন, ‘জুমের সঙ্গে তার বাবা কখনো একটু জোরে কথা বলত না। কখনো শাসাত না। স্কুলের পরীক্ষায় নম্বর কিছুটা কম পেলে আমার কাছ থেকে বকুনি খেলেও বাবার কাছে পেত উপহার। মেয়ের স্কুলের পুরো বছরের টিউশন ফি আগাম দিয়ে রাখত ওর বাবা। সেই কলিজার টুকরা মেয়েটির কথা ভুলে তার বাবা হঠাৎ আত্মহত্যা করল গলায় দড়ি দিয়ে! কতটুকু মানসিক চাপ পেয়ে সে এমনটা করেছে ভেবে দেখুন।’

উল্লেখ্য, প্রভাবশালী একটি চক্রের গোপন ব্যবসার বলি হতে হয় তরুণ ব্যাংক কর্মকর্তা মোর্শেদ চৌধুরীকে। ২৫ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেও নিষ্কৃতি মেলেনি তাঁর। তাঁকে বেছে নিতে হয়েছে আত্মহননের পথ। ঘটনাটি বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এখন প্রধান আলোচনার বিষয়।

অনেকের ধারণা, রাজনৈতিক শক্তিধর একটি চক্র তাদের আয়ের টাকা ব্যাংকার মোর্শেদ চৌধুরীর মাধ্যমে শেয়ারবাজার, কলমানি, খাতুনগঞ্জভিত্তিক ডিও ব্যবসা এবং গার্মেন্টের স্টক লট ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। সেই বিনিয়োগের টাকা এবং লাভের টাকা ফেরত নিতেই ‘রাজনৈতিকভাবে অতিরিক্ত চাপ’ দেওয়া হয়। আর অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরেই মোর্শেদ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন।

গত ৭ এপ্রিল আত্মহননের আগে সুইসাইড নোটে মোর্শেদ উল্লেখ করেন, ‘আর পারছি না। সত্যি আর নিতে পারছি না। প্রতিদিন একবার করে মরছি। কিছু লোকের অমানুষিক প্রেসার আমি আর নিতে পারছি না। প্লিজ, সবাই আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমার জুমকে (মেয়ে) সবাই দেখে রেখো। আল্লাহ হাফেজ।’

এ ব্যাপারে মোর্শেদের স্ত্রী ইশরাত জাহান চৌধুরী বাদী হয়ে পাঁচলাইশ মডেল থানায় একটি মামলা করেন। মামলার এজাহারে মো. পারভেজ ইকবাল, জাভেদ ইকবাল, সৈয়দ সাকিব নাঈম উদ্দীন, রাসেলসহ অচেনা আরো ৮-১০ জনকে আসামি করেন। গোয়েন্দা (উত্তর) বিভাগের পরিদর্শক মইনুর রহমানকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

হুইপপুত্র নাজমুল হক চৌধুরী ওরফে শারুনের নাম মামলায় উল্লেখ কেন করেননি এ প্রসঙ্গে ইশরাত জাহান চৌধুরী আগেই জানিয়েছিলেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কয়েকজন এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নেপথ্যের ওই ব্যক্তিদের নির্দেশেই সব কিছু হয়েছে। পুলিশ আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে এজাহারভুক্ত আসামি পারভেজের কাছ থেকে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ সহজেই পেয়ে যাবে। নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁর নাম এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি।

চট্টগ্রামের বিশিষ্ট নাগরিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে হুইপপুত্র শারুনের সংশ্লিষ্টতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। মামলার বাদী তাঁদের ফ্ল্যাটে হামলা চালানোর সময় শারুনের উপস্থিতির কথা বলেছেন। র‌্যাডিসন হোটেলে শারুন ব্যাংক কর্মকর্তা মোর্শেদকে দেখা করতে চাপ সৃষ্টি করেন এবং টাকা আদায় নিয়ে এক বৈঠকেও তিনি উপস্থিত ছিলেন বলে শোনা যাচ্ছে। এত প্রভাশালী ও ক্ষমতাঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা গ্রেপ্তার এড়িয়ে থাকতে পারছেন কি না, সে প্রশ্ন এখন অনেকের। এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মোর্শেদ চৌধুরীকে আত্মহত্যায় বাধ্য করার মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিরা গাঢাকা দিয়েছেন। তাঁরা চট্টগ্রাম ছেড়েছেন গত ৮ এপ্রিল। ওই দিন রাতে পুলিশ তাঁদের কয়েকজনের বাসায় অভিযান চালায়। পুলিশ আসবে—এ খবর পেয়েই তাঁরা পালিয়ে যান। রাত ১১টার দিকে পারভেজ ইকবালের বাসায় পৌঁছে পুলিশ দেখতে পায় টেবিলে প্লেটে খাবার পড়ে আছে। মগের কফিও শেষ হয়নি। পুলিশের ধারণা, রাতের খাবার খাওয়ার সময়ই পারভেজ ইকবাল পুলিশ আসার খবর পেয়ে বাসা ছাড়েন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়. ওই রাতেই পারভেজ ইকবালের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলমত সংগ্রহ করে। এসব আলামত ডিবির তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তার স্ত্রী ইশরাত জাহান চৌধুরী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার তদন্তের অগ্রগতি, আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা—এসব বিষয়ে কিছুই জানতে পারছি না। গণমাধ্যমেই যা কিছু লেখা হচ্ছে, প্রচার হচ্ছে। এর বাইরে সব কিছু একেবারেই চুপচাপ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গত শনিবার ফোনে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। কিছু তথ্য চেয়েছিলেন, সেগুলো জানিয়েছি। তারপর আর কোনো সাড়া নেই। এ অবস্থায় বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় বাড়ছে।’