kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

বিশেষ লেখা

কবরীর প্রতিভার কোনো শেষ ছিল না

গাজী মাজহারুল আনোয়ার

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কবরীর প্রতিভার কোনো শেষ ছিল না

কবরী নিঃসন্দেহে আমাদের দেশের একজন উচ্চমার্গের শিল্পী। সুঅভিনেত্রী। সাবলীল অভিনয়ের জন্য তিনি এ দেশের মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। কিন্তু তিনি কেবল অভিনেত্রীই ছিলেন না, বহুবিধ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। আমরা কবরীকে পেয়েছি একজন বিশাল মাপের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। আমরা তাঁকে পেয়েছি কেবল চলচ্চিত্র নয়, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন উপদেষ্টা হিসেবে। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে পেয়েছি, প্রযোজক হিসেবে পেয়েছি।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানটা বিশেষভাবে বলতে হবে। প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দেশ ছেড়ে কলকাতায় গেলেন। যোগ দিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের চলচ্চিত্রের মানুষদের সম্পৃক্ত করার জন্য কেবল কলকাতায়ই নয়, মুম্বাইতেও গিয়ে কাজ করেছেন।

রাজনৈতিকভাবেও তিনি সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। সেখানেও তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসন নয়, এ দেশের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করা। সে জন্য নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, যা থেকে আমরা উপকৃত হয়েছি।

কবরীর সঙ্গে আমার পরিচয়টা দীর্ঘদিনের। তখনো আমাদের চলচ্চিত্র অঙ্গন পরিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠেনি। ‘সমাধি’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করব। ইচ্ছে ছিল নায়িকা হিসেবে কবরীকেই কাস্ট করব। আর নায়ক হিসেবে রাজ্জাককে। কিন্তু কবরী প্রথমে আগ্রহ দেখালেও অনেক ব্যস্ততার কারণে পরে আর সময় দিতে পারেননি। বললেন, পরে কখনো সময় দেবেন। সেটা নিয়ে আমার মধ্যে একটা অভিমান কাজ করে। কারণ তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের যে সম্পর্ক, জানাশোনা, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের যৌথ প্রচেষ্টা তার পরিপ্রেক্ষিতে চলচ্চিত্রটি করতে না পারার জন্য আমার মধ্যে অভিমান কাজ করেছিল।

ঈরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়বস্তু নিয়ে আর্মিবেইজড একটি ছবি ‘অনুরোধ’ শুরু করলাম। কবরী বললেন, ‘ছবিটা আমি করব। আমার পছন্দ হয়েছে।’ নায়ক হিসেবে রাজ্জাককে কাস্ট করা হলো। আমার প্রডাকশন থেকেই ছবি করলাম। সেন্সরের সময় আর্মি থেকে কিছুটা আপত্তি জানানো হলো। বলা হলো, কিছু কিছু অংশ বাদ দিতে হবে। পরে যখন ছবিটি রিঅ্যাগজাম হলো, আর্মি থেকেই বলা হলো ছবিটি আপনি চালাতে পারেন কোনো অসুবিধা নেই। সেই সঙ্গে একজন আর্মির স্ত্রী হিসেবে কবরীর অভিনয়ের খুবই প্রশংসা করা হলো। কী চমৎকার অভিনয় করেছিলেন তিনি। আর্মির লোকেরাই বললেন, একজন আর্মির ঘরনি হিসেবে এরকম সুন্দর অভিনয় হতে পারে তা ভাবনায়ই ছিল না। চলচ্চিত্রটি সার্বিকভাবে সার্থক হয়েছিল। এই প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে আমি নিজেকে খুব সফল মনে করেছিলাম।

কবরী তাঁর সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘এই তুমি সেই তুমি’ নির্মাণ নিয়ে হঠাৎ করে আমাকে ডাকলেন। গুলশানে আমাদের একই এলাকায় বাসা। একদিন গেলাম। বললেন, আমি সিনেমা বানাচ্ছি। তার জন্য গান লিখতে হবে গাজী। অনেক গল্পগুজব হলো। ওই সিনেমার জন্য গান লিখলাম। তাঁর সিনেমার সংগীত পরিচালক আমাদের কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। সাবিনা ইয়াসমিন গানটা সুর করলেন। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হলো। কয়েক দিন আগে তিনি ফোন করে জানালেন, গানটা তৈরি করা হয়েছে। এখন শুনে চূড়ান্ত করতে হবে। আমি তখন স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যস্ত ছিলাম। বললাম কিছুদিন পরে সময় দেব। আমি ভাবতে পারি না, তিনি এত অসুস্থ হয়ে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন। এটা আমার জন্য খুবই দুঃখের, খুবই বেদনার। খুব সুন্দর একটি গান লিখেছিলাম। কিন্তু তাঁর সঙ্গে বসে আর শোনা হলো না।

তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি আরো বেশি বেদনার এ জন্য যে আমরা যে দেশটার জন্য লড়াই করেছিলাম, সেই দেশটার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন হচ্ছে। আমাদের অবদানগুলোর স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে—যেটা এ বছর আমাকে দেওয়া হয়েছে। এই সময়টাতে উনি বেঁচে থাকলে এগুলো উদযাপন করতে পারতেন, আনন্দ করতে পারতেন।

কবরী চলচ্চিত্রের একজন শিল্পী ছিলেন। চলচ্চিত্রের জন্যই তিনি জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর অঙ্গনটাকে নিয়েই কেবল ভাবেননি। সার্বিক দিক নিয়ে, সামগ্রিকভাবেই উন্নয়নের চিন্তা করেছেন। চেষ্টা করেছেন, সহযোগিতা করেছেন। সেই প্রচেষ্টার মূল্যায়ন হিসেবে আমার মনে হয় দেশে তাঁকেও সুন্দরভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।

উনার প্রশংসা করার কোনো অন্ত নেই, শেষ করা যাবে না। কিন্তু তার পরও বলতে হয়, দীর্ঘদিনের অপরিচর্যাহীনতায় অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। আমরা চাই কবরীর মতো শিল্পীরা যেন হারিয়ে না যান। যে স্মৃতিটুকু রেখে গেছেন, তার মর্যাদাটুকু যেন আমরা সার্বিকভাবে দিয়ে যেতে পারি। এর মাধ্যমে এ দেশকে আমরা সমৃদ্ধ করতে পারি। এ দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষগুলোকে মূল্যায়ন করতে পারি। কারো মধ্যে যেন কোনো হতাশা না থাকে সেটাই প্রত্যাশা করব।

লেখক : গীতিকার সুরকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা।