kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

ব্যাংকার মোর্শেদের আত্মহনন

কার অবৈধ টাকা এই মৃত্যু ডেকে আনল

এস এম রানা, চট্টগ্রাম    

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কার অবৈধ টাকা এই মৃত্যু ডেকে আনল

বেসরকারি ব্যাংক আল-ফালাহর চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক আবদুল মোর্শেদ চৌধুরীর ‘আত্মহনন’ মামলার তদন্তে নেমে অবৈধ অর্থের উেস পৌঁছতে চাইছে পুলিশ। এই লক্ষ্যে মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা শুরু হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রধান আসামি পারভেজ ইকবালকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই নেপথ্যের অন্যদের নাম বেরিয়ে আসবে।

ব্যাংকার মোর্শেদ চৌধুরীর আত্মহনন ঘটনায় তাঁর স্ত্রী ইশরাত জাহান চৌধুরী জুলির করা মামলাটি তদন্ত করছেন চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মঈনুর রহমান। গতকাল শনিবারও তিনি মামলার বাদীর সঙ্গে খুঁটিনাটি বিষয়ে কথা বলেছেন।

ইশরাত জাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমি তাঁকে সার্বিক বিষয়ে জানিয়েছি।’ তদন্ত কর্মকর্তা কালের কণ্ঠ’র প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘তদন্ত শুরু করেছি। আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।’ 

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করার লক্ষ্যে পুলিশ কাজ করছে। এর আগে প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করতে হচ্ছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘মামলার এজাহার অনুযায়ী, মোর্শেদ চৌধুরীর সঙ্গে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এসব টাকার উৎস বের করতে চায় পুলিশ। যাঁরা সরাসরি আসামি হয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে নেপথ্যে জড়িতদের চিহ্নিত করতে পারলে জানা যাবে প্রকৃতপক্ষে কারা জড়িত। আর জড়িত হিসেবে যাঁদের নাম এরই মধ্যে গণমাধ্যমে এসেছে, তাঁদের সংশ্লিষ্টতাও খোঁজা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ নেই।’

পুলিশ এরই মধ্যে জানতে পেরেছে, মহানগরীর আবাহনী ক্লাবে জুয়া চলে। সেই জুয়া বা ক্যাসিনোর টাকার একটি অংশ ক্লাব কর্তৃপক্ষের পকেটে যায়। আবাহনী ক্লাব ব্যবস্থাপনায় আছেন পটিয়া আসনের সংসদ সদস্য হুইপ শামশুল হক চৌধুরী। বাবার ক্ষমতার হাত ধরে ক্লাবের আয়ের টাকা তাঁর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের হাতে যায় বলেও তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে। দেশে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর বিরূপ মন্তব্য করে দলীয় নেতাদের কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন হুইপ শামশুল হক চৌধুরী। এরপর তাঁর পরিচালিত আবাহনী ক্লাবের ক্যাসিনো নিয়েও চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে আলোচনা ছিল।

জুয়ার অবৈধ টাকার সঙ্গে পটিয়ায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কৌশলে নয়ছয় করে আদায় করা টাকার একটি অংশও রয়েছে বলে শুনেছে পুলিশ। এ ছাড়া শারুনের সঙ্গে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সুসম্পর্ক এবং তাঁদের ঐক্যবদ্ধ বিনিয়োগের তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। সব তথ্য বিশ্লেষণের পরই বোঝা যাবে ব্যাংকার মোর্শেদ চৌধুরীর মাধ্যমে বিনিয়োগের টাকার উৎস কী? কোথা থেকে কিভাবে এসেছে এই বিপুল অর্থ। তার পরই এই মামলায় যাঁদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাবে, পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে।

মহানগর পুলিশের এই কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, পুলিশ এরই মধ্যে বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছে। রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থাও এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। এরই মধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও তাদের নিজস্ব সোর্স থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং সরকারি দলের নেতা আরশেদুল আলম বাচ্চু ও শারুনের বন্ধুত্ব এবং তাঁদের বিনিয়োগের বিষয়েও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রামজুড়ে প্রচারিত হচ্ছে যে রাজনৈতিক শক্তিধর একটি চক্র তাদের টাকা ব্যাংকার মোর্শেদের মাধ্যমে বিনিয়োগ করেছে। সেই বিনিয়োগের টাকা ও লাভের টাকা ফেরত নিতেই ‘রাজনৈতিকভাবে অতিরিক্ত চাপ’ দেওয়া হয়। আর এই চাপ সহ্য করতে না পেরেই আত্মহননের পথ বেছে নেন মোর্শেদ।

মোর্শেদ চৌধুরী আত্মহত্যা করার পরদিন ৮ এপ্রিল থানায় মামলা হয়; কিন্তু এখনো কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করেনি পুলিশ। এই মামলায় আরশেদুল আলম বাচ্চু বা শারুনের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।

মামলার বাদীর দাবি, আসামিরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় এবং তাঁদের সঙ্গে সরাসরি আর্থিক লেনদেন না থাকায় আসামি করা হয়নি। তবে যুবলীগ নেতা সোহেলকে আসামি করা হয়েছে। কারণ তিনি মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়েছিলেন। এই মামলায় মোর্শেদ চৌধুরীর সঙ্গে টাকা লেনদেন হওয়ায় পারভেজ ইকবাল, তাঁর ভাই জাবেদ ইকবাল, সাকিব ও যুবলীগ নেতা রাসেলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনার নেপথ্যে শারুন জড়িত বলে বাদী মনে করেন। কারণ ২০১৯ সালের ২৯ মে রাতে মোর্শেদ চৌধুরীর বাসায় সদলবলে সন্ত্রাসীরা হানা দিয়েছিল। আর সেদিন একটি নম্বরবিহীন গাড়িতে শারুন ও বাচ্চু বসা ছিলেন বলে তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। ওই দিন হামলাকারীরা ওই ভবনের প্রহরী রাসেলকেও মারধর করে।

অবশ্য পরে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে বাচ্চু ও শারুন মোর্শেদের বাসায় যাওয়ার তথ্য অস্বীকার করেন। তবে শারুন স্বীকার করেছিলেন, পাঁচলাইশ এলাকায় আজম সাহেবের বাসায় মোর্শেদ চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। ১০ মিনিটের ওই বৈঠকের পর তিনি ও বাচ্চু চলে আসেন। তবে পরবর্তী সময়ে শারুন ব্যাংকার মোর্শেদকে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচতারা মানের র‌্যাডিসন ব্লু হোটেলে ডেকেছিলেন বলে বাদী দাবি করেন।

মোর্শেদ চৌধুরীর স্বজন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং অন্য একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মামলার ১ নম্বর আসামি পারভেজ ইকবালের দৃশ্যমান ব্যবসা নেই। তিনি গার্মেন্ট-সংশ্লিষ্ট স্টকলটের ব্যবসা করেন বলে প্রচার আছে। পারভেজের হাতে নানাভাবে বেশ কিছু নগদ টাকা চলে আসে। এর সঙ্গে পারভেজের বন্ধু শারুনের টাকাও যুক্ত বলে প্রকাশ পাচ্ছে।

পারভেজ রাজনৈতিক দলের পদে না থাকলেও তাঁর বন্ধু বাচ্চু ও শারুন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। এই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের টাকা কৌশলে বিনিয়োগ করেন পারভেজ ইকবাল। আর টাকা বিনিয়োগের মাধ্যম হয়ে ওঠেন ব্যাংকার মোর্শেদ চৌধুরী। তিনি টাকা বিনিয়োগ করেন শেয়ারবাজার, কলমানি বা খাতুনগঞ্জের ডিও ব্যবসার মতো ব্যবসায়। সেখানে বিনিয়োগের টাকা ফেরতও দিয়েছেন আসামিকে। মোর্শেদ ২৫ কোটি টাকা নিয়ে ৩৮ কোটি টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন। কিন্তু আসামিদের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এই চাহিদা পূরণ করা মোর্শেদের সাধ্যের বাইরে ছিল। অসহনীয় মানসিক চাপে পড়ে এক পর্যায়ে তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেন।