kalerkantho

শনিবার । ২৫ বৈশাখ ১৪২৮। ৮ মে ২০২১। ২৫ রমজান ১৪৪২

তিমি মৃত্যুর তিন কারণ

হিমছড়ি সৈকতে আরেকটি মরদেহ

তোফায়েল আহমদ ও শরীফুল আলম সুমন    

১১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তিমি মৃত্যুর তিন কারণ

গতকাল কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতে ভেসে আসে আরেকটি মৃত তিমি। ছবি : কালের কণ্ঠ

কক্সবাজারে সাগরসৈকতে আরেকটি বিশালকায় তিমির মরদেহ ভেসে এসেছে। পর পর দুই দিনে সৈকতের একই এলাকায় দুটি তিমির মরদেহ ভেসে আসার ঘটনায় শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা। ব্রাইডস হোয়েল প্রজাতির এই তিমি দুটির মৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করতে কাজ শুরু করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞরা ময়নাতদন্তের জন্য তিমি দুটির মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা জানান, সাধারণত তিন কারণে তিমি মারা যেতে পারে। প্রথমত, বার্ধক্য। দ্বিতীয়ত, আঘাত বা ধাক্কা। গভীর সমুদ্রে বড় ফিশিং জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে। সাগরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মাছ ধরার সময় হার্ট অ্যাটাক বা আঘাতেও তিমি মারা যেতে পারে। তৃতীয়ত, প্লাস্টিক কন্ট্রামিনেশন; পলিথিন বা প্লাস্টিকজাতীয় বর্জ্য, যা তিমির খাদ্য নয়, তা খাদ্যনালিতে আটকে গেলে তিমি মারা যেতে পারে।

হিমছড়ি সৈকতে গত শুক্রবার সকালে ১০ টন ওজনের একটি তিমির মরদেহ ভেসে আসে। ঠিক তার দক্ষিণে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে দরিয়ানগর সৈকতে গতকাল আরেকটি তিমির মরদেহ ভেসে এসেছে। এটির ওজনও আগেরটির মতোই। লম্বায় ৪৬ ফুট ও প্রস্থে ১৮ ফুট। দুটি তিমির বয়সই ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্থানীয়রা জানায়, গতকাল ভেসে আসা তিমিটির শরীরে আগের দিন ভেসে আসাটির চেয়েও একটু বেশি পচন ধরেছিল। এগুলো মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। পরে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে সৈকতের বালিয়াড়িতেই মৃত তিমি দুটি পুঁতে ফেলা হয়।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এফআরআই) কক্সবাজার অফিসের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই দিনে ভেসে আসা দুটি মৃত তিমিই ব্রাইডস হোয়েল প্রজাতির। আমরা সরেজমিন পরিদর্শন করে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি। দুটি তিমিই পুরুষ ও পূর্ণবয়স্ক। সম্ভবত ওরা একসঙ্গেই ছিল। এগুলো সমুদ্রের গভীরে আঘাত লেগে অথবা প্রাকৃতিক কোনো কারণে মারা গিয়ে থাকতে পারে।’ তিনি জানান, গত ৩১ বছরে বাংলাদেশের উপকূলে ১০টি তিমির মরদেহ ভেসে আসার তথ্য তাঁদের কাছে রয়েছে।

গত শুক্রবারে ভেসে আসা তিমিটির মরদেহ থেকে ময়নাতদন্তের জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু সাঈদ মুহাম্মদ শরীফ। তিনি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিমিরা সাধারণত জোড়ায় জোড়ায় থাকে। তাই ধারণা করছি, মৃত্যুর সময় ওরা কাছাকাছিই ছিল। তবে মরদেহে যে পরিমাণ পচন ধরেছে তাতে ধারণা করা যায় যে দুই সপ্তাহ আগে এগুলো মারা গেছে। এতে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অঞ্চলে ওদের মারা যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’

তিমি দুটির মৃত্যুর কারণের ব্যাপারে এই বিজ্ঞানী বলেন, ‘প্রথমে বার্ধক্যের কথা চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু দুটিই তো বার্ধ্যকের কারণে মারা যেতে পারে না। আঘাত বা হার্ট অ্যাটাক একটি কারণ হতে পারে। আবার প্লাস্টিক কন্ট্রামিনেশনও মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে এগুলো সবই ধারণা। ময়নাতদন্ত শেষ হতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় লাগবে। এরপর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বলা যাবে।’

আশরাফুল হক নামের একজন জ্যেষ্ঠ সামুদ্রিক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জানান, ভেসে আসা তিমি দুটির মধ্যে প্রথমটির পেটের দিকে আঘাত ছিল। আর পরেরটিতে পিঠে বড় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

তিমিরা সাধারণত খাবার ধরার সময় সমুদ্রের উপরিভাগে চলে আসে। এ সময় তারা বিশালাকার মুখ হাঁ করে থাকে। মুখের ভেতর পানির সঙ্গে ছোট ছোট জলজ প্রাণী ঢুকে যায়, যা তারা খেয়ে থাকে। এ সময় তিমির মুখে পলিথিন বা প্লাস্টিকজাতীয় বর্জ্যও আটকে যেতে পারে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেজের অধ্যাপক সাইদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘তিমি স্তন্যপায়ী প্রাণী। এর সঙ্গে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মিল আছে। তাই ময়নাতদন্ত কঠিন কোনো ব্যাপার না। মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, তিমি দুটির মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। তিন মাস পর মাংস সম্পূর্ণ পচে গেলে এর হাড় সংগ্রহ করে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের মিউজিয়ামে একটি এবং ওশানোগ্রাফিক সেন্টারের মিউজিয়ামে একটি সংরক্ষণ করা হবে। তা শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার পাশাপাশি গবেষণার কাজে লাগবে।

সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, সুন্দরবন থেকে ১৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলেই দেখা মেলে নীল জলরাশির বিস্তীর্ণ রাজ্য ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’, একটি সামুদ্রিক অভয়ারণ্য। সেখানে নানা জাতের সামুদ্রিক মাছের পাশাপাশি তিমি ও ডলফিনেরও বিচরণ রয়েছে।



সাতদিনের সেরা