kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

সাক্ষাৎকার : হাসানুল হক ইনু সভাপতি, জাসদ

ডিজিটাল আইন চূড়ান্ত করার সময় আমাকে ডাকা হয়নি

১২ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডিজিটাল আইন চূড়ান্ত করার সময় আমাকে ডাকা হয়নি

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের আগে এর অপপ্রয়োগ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল দেশের জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ। সে সময় তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেছিলেন, ‘ভূতের ভয়ে অহেতুক কাতর হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।’ কিন্তু এখন তিনি বলছেন, ‘আশা করেছিলাম, প্রস্তাবিত আইনটি পাস হওয়ার আগে সংস্কার করা হবে। কিন্তু আইনমন্ত্রী ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী এটা চূড়ান্ত করার সময় আমাকে ডাকেননি।’ আইনটি পর্যালোচনা করে সংস্কারের কথা বলেছেন তিনি। কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি কাজী হাফিজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাত্কারে তিনি এসব কথা বলেন।

 

কালের কণ্ঠ : সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলের দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা, দীর্ঘদিন কারাবাস, কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু, কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে নির্যাতনের অভিযোগ—এসব ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?

হাসানুল হক ইনু : এ আইনের অপপ্রয়োগের পথ বন্ধ করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিচের স্তরের যেসব কর্মকর্তা এই আইন প্রয়োগে গাফিলতি করছেন, আমরা তাঁদের দায়িত্বহীনতার সমালোচনা করতে পারি। আইনে অপপ্রয়োগের সুযোগ থাকলে তা সংশোধন করা যেতে পারে। কিন্তু আইন বাতিল করার কথা যাঁরা বলছেন তাঁরা সঠিক কথা বলছেন না। ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য এই আইনের প্রয়োজন আছে। ডিজিটাল যন্ত্রপাতি দিয়ে কোনো অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অন্য কোনো আইন নেই। ডিজিটালজগতের অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এ ধরনের আইন প্রয়োজন। এ আইনের বাইরেও আমাদের দণ্ডবিধিতে ৫৪ ধারাসহ যতগুলো ধারা রয়েছে সেসব ধারার যে অপ্রয়োগ হচ্ছে না, তা বলা যায় না। খুন, নারী নির্যাতন, চুরি-ডাকাতিসহ অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের অপপ্রয়োগ হলে আদালতে তার প্রতিকার পাওয়া যায়। এ ধরনের বেশ কিছু দৃষ্টান্ত রয়েছে। অপপ্রয়োগকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমস্যাটি আসলে প্রয়োগে। প্রশাসনের ক্ষমতাবাজির কারণে এ আইনের অপপ্রয়োগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। গত দুই বছরে এই আইনে ৫০০ মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫ জন গণমাধ্যমকর্মী। এই ৭৫টি মামলার মধ্যে ৪৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। আর জামিনে মুক্ত হয়েছেন ৩৩ জন। এ বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ যাঁরা এই আইনের অপপ্রয়োগে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাঁদের বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা হওয়া দরকার। এই আইনের অপপ্রয়োগে সরকারও সমালোচনার মুখে।

 

কালের কণ্ঠ : এর প্রতিকার কী? অপপ্রয়োগের পথ কিভাবে বন্ধ করা সম্ভব?

হাসানুল হক ইনু : এ আইনে ত্রুটি থাকলে, ছিদ্র থাকলে তা বন্ধ করতে হবে। আর কিভাবে এর অপপ্রয়োগ হচ্ছে সেসব ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে হবে। আইনের ২৫ ও ২৯ ধারাটি অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য। কিন্তু এর সঙ্গে ৩১ ও ৩২ ধারা যোগ করে অনেককে হয়রানি, নির্যাতন করা হচ্ছে। এসব কারণে আইনটি পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এ আইনের বিধিমালা এখনো তৈরি হয়নি। বিধিমালা ছাড়াই এর প্রয়োগ চলছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের গাফিলতির কারণেই এই অবস্থা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সঙ্গে ডিজিটাল কোর্ট, ফরেন্সিক ল্যাব, ডিজিটাল কাউন্সিল—এসব থাকতে হবে। আইনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। কিন্তু সার্বিক অবকাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। ডিজিটাল নিরাপত্তার মূল উদ্দেশ্য ছেড়ে ব্যক্তি আক্রোশেও এ আইন প্রয়োগ হচ্ছে। এ বাস্তবতায় আইনটি পর্যালোচনা করে সংশোধন করা দরকার। এ ছাড়া এই আইনের মামলায় গণমাধ্যমকর্মীরা যাতে জামিন পেতে পারেন সে ব্যবস্থাও রাখা দরকার। তাঁরা তো দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবেন না। এ আইনে বলা আছে, ৬০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে হবে। না পারলে আরো ১৫ দিন। অর্থাৎ মোট ৭৫ দিন। বিচারক এরপর সময় বাড়ানোর আবেদন নামঞ্জুর করতে পারেন। কিন্তু কেন কাজল, কিশোর ও মুশতাককে ওই সময়ের বেশি কারাগারে রাখা হলো? আইনে আছে, ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে; কিন্তু তা হচ্ছে না। নিষ্পত্তির সময় পার হওয়ার পরও ভুক্তভোগীদের জামিন দেওয়া হচ্ছে না। এসব অসংগতি দূর করতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ :  বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে কি মনে করেন?

হাসানুল হক ইনু : আগামী ২৪ মার্চ সংসদে তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠক আছে। ওই বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে।

 

কালের কণ্ঠ : ২০১৮ সালে আলোচিত আইনটি প্রণয়নের আগে আপনি তথ্যমন্ত্রী ছিলেন। সে সময় সাংবাদিক নেতারা আইনটির অপপ্রয়োগ হতে পারে বলে আপনাকে জানিয়েছিলেন। সম্পাদক পরিষদ এই আইনের ৯টি ধারা সংশোধনের দাবি জানালে আপনি বলেছিলেন, ভূতের ভয়ে অহেতুক কাতর হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। কেন?

হাসানুল হক ইনু : তাঁরা আইনটি বাতিলের প্রস্তাবও করেছিলেন। আর তখনো ডিজিটাল আইন নিয়ে আলোচনা চলমান ছিল। আমি আশা করেছিলাম, প্রস্তাবিত আইনটি পাস হওয়ার আগে সংস্কার করা হবে। কিন্তু আইনমন্ত্রী ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী এটি চূড়ান্ত করার সময় আমাকে ডাকেননি। এখন এই আইনের অসংগতি কেন, এর জবাব আইনমন্ত্রী ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর কাছে চাইতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ : সাংবাদিক কাজল ৫৩ দিন নিখোঁজ ছিলেন। দীর্ঘদিন কারাবন্দিও থাকতে হয় তাঁকে। এ কারণে প্রায় এক বছর তাঁর আয়-উপার্জন বন্ধ। এখনো তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা চলমান। এই সাংবাদিকের এমন দুরবস্থার বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?

হাসানুল হক ইনু : ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কাউকে নিখোঁজ রাখার কোনো বিধান নেই। আমরা কাজলকে পরামর্শ দেব এই বিষয়টি নিয়ে মামলা করতে। তাঁর প্রতি যে আচরণ হয়েছে বলে আমরা জেনেছি, তা দুঃখজনক।

 

মন্তব্য