kalerkantho

শনিবার । ২৭ চৈত্র ১৪২৭। ১০ এপ্রিল ২০২১। ২৬ শাবান ১৪৪২

প্রবাসে ১০ লাখ নারী কর্মী

দুর্দশায়ও টাকা পাঠান তাঁরা

ফাতিমা তুজ জোহরা   

৯ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুর্দশায়ও টাকা পাঠান তাঁরা

ছবি: ইন্টারনেট

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কিশোরী উম্মে কুলসুম (১৪) পাসপোর্টে বয়স ২৬ দেখিয়ে সৌদি আরবে যায় ২০১৯ সালের এপ্রিলে। সপ্তম শ্রেণির পাট চুকিয়ে দেয় সে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়, পরিবারের জন্য কিছু করার স্বপ্নে। গৃহকর্মী হিসেবে সৌদিতে যাওয়ার পর সাত মাস নিয়মিত টাকা পাঠায়। হঠাৎ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ছয় মাস পর কুলসুম ফোন করে জানায়, মালিক মেরে তার হাত-পা ও কোমর ভেঙে দিয়েছেন। ২০২০ সালের ১০ আগস্ট মেয়ের মৃত্যুর খবর পায় কুলসুমের পরিবার। এখন পর্যন্ত পরিবারটি কোনো আর্থিক সহায়তা পায়নি।

কুলসুমের মতো গত পাঁচ বছরে প্রবাস থেকে ৪৮৭ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে আত্মহত্যা করেন ৮৬ জন, স্ট্রোকে মারা গেছেন ১৬৭ জন এবং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৭১ জন। ১১৫ জনের স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। বেশির ভাগ মৃত্যুর ঘটনাই ঘটেছে সৌদি আরবে।

লাশ হয়ে ‘ফেরা’ ছাড়াও শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনসহ প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক নারীই দেশে ফিরে আসেন বলে জানায় বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির গত কয়েক বছরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ প্রতারণার শিকার হয়ে শূন্য হাতে দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক নারী। নির্যাতনের মাত্রা এত বেশি যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফিরছেন অনেকে। আবার বিদেশে অনেকে মারাও যাচ্ছেন। হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছেন কেউ কেউ।

এর পরও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের নারীরা যাচ্ছেন নিজেদের ভবিষ্যৎ বদলের আশায়, পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সে হাসছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। কিন্তু তাঁদের অনেকের মুখের হাসি মিলিয়ে যাচ্ছে। এমনকি প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে। সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো পড়ছে অথৈ সাগরে।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড তিন হাজার ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তথ্যমতে, কভিড-১৯-এর সময় নারী শ্রমিকরা বেশি হারে টাকা পাঠিয়েছেন। তাঁরা পাঠিয়েছেন ৬৯ শতাংশ, পুরুষ ৩০ শতাংশ। বিদেশ যেতে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, তা গড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে নারী কর্মীরা তুলে আনতে পারেন।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান জানান, পুরুষ শ্রমিকরা তাঁদের আয়ের ৭০-৮০ শতাংশ দেশে পাঠান। তবে নারী কর্মীরা পাঠান তাঁদের আয়ের প্রায় পুরোটাই। অবশ্য পুরুষদের আয় বেশি। নারীদের বেশির ভাগ গৃহকর্মী হওয়ায় তাঁদের আয় কম।

বর্তমানে প্রবাসে বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা এক কোটি ২০ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ নারী। এ হিসাবে প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে ১২ শতাংশ নারী।

বিদেশফেরত ৩৫ শতাংশ নারী নিপীড়নের শিকার

২০১৯ সালে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে নারী নিপীড়নের বিষয়টি উঠে এসেছে। সৌদি আরব থেকে ফেরত ১১০ নারী গৃহকর্মীর সঙ্গে কথা বলে কমিটি ২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট একটি প্রতিবেদন দেয়। তাতে বলা হয়, ৩৫ শতাংশ নারী শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন এবং ৪৪ শতাংশ নারীকে নিয়মিত বেতন দেওয়া হতো না। দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মন্ত্রণালয় তাদের ফিরে আসার ১১টি কারণ চিহ্নিত করে। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশফেরত নারী কর্মীদের মধ্যে ৩৮ জন শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, ৪৮ জন নিয়মিত বেতন-ভাতা পেতেন না। এ ছাড়া অন্তত ২৩ জনকে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না। সেখানে তাঁরা নিয়োগকর্তা এবং মকতবের (সৌদির রিক্রুটিং এজেন্সি) প্রতিনিধির দ্বারা বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

করোনা মহামারির বছরে ২০২০ সালে বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন মোট চার লাখ ২৫ হাজার ৬৯৭ জন কর্মী। এর মধ্যে ৫০ হাজার ৬১৯ জন নারী। আর তাঁদের ২২ হাজারই সৌদিফেরত। এসব নারীর বেশির ভাগই নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেন বলে জানায় ব্র্যাক। বিভিন্ন দূতাবাস ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চার বছরে সৌদি আরব থেকে ১৩ হাজারের বেশি নারী দেশে ফিরে আসেন।

নিপীড়নের সবচেয়ে বেশি ঘটনা সৌদি আরবে ঘটে বলে জানান ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান। গত রবিবার কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘গৃহকর্মীর পেশার পরিবর্তে যদি কেয়ার গিভার, গার্মেন্ট বা অন্য পেশায় পাঠানো যায় তাহলে ভালো হবে। আর গৃহকর্মী হিসেবে গেলে তাঁদের মোবাইল ফোন নিশ্চিত করতে হবে।’

প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্য পেশায় পাঠানো গেলে নিপীড়নের ঘটনা অনেক কমে যাবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতিতে পদে পদে ঘাটতি আছে। এ জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। তবে মূল দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।’  

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কাগজে-কলমে বিভিন্ন ক্ষতিপূরণ কিংবা সরকারি সহায়তার কথা থাকলেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন। বিদেশে গিয়ে কাজ পাননি কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়ে এক বছরের মধ্যে দেশে ফেরত নারীদের বিমানবন্দর থেকে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এমন পাঁচ থেকে ছয় হাজার নারী এই টাকা পেয়েছেন। এর বাইরে বিদেশে যাওয়া কোনো বৈধ কর্মী মারা গেলে সরকার তিন লাখ টাকা দেয়।

জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাফরিজা শায়মা গত শনিবার বলেন, “গত সপ্তাহে প্রবাসে নির্যাতনের শিকার শ্রমিকের জন্য ‘প্রবাস বন্ধু কল সেন্টার’ ই-সেবা চালু করেছি। এর মাধ্যমে অনলাইনে ভয়েজ মেসেজ, ছবি, ভিডিও, এসএমএস সব মাধ্যমে অভিযোগ দায়ের করতে পারবে।”

নারী কর্মীরা মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ না পেলে করণীয় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আত্মীয়-স্বজন এসে খবর দিলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করি। অ্যাম্বাসি তখনই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।’ 

নাফরিজা শায়মা আরো বলেন, ‘ফেরত আসা কর্মীদের অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট জায়গায় আর কর্মী দিচ্ছি না। যেসব দেশে নির্যাতনের ঘটনা বেশি হচ্ছে সেসব দেশের পুলিশের সঙ্গে আমরা প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছি। মামলা হচ্ছে, জরিমানা আদায় হচ্ছে। জরিমানা যা আদায় হচ্ছে, কর্মীর হাতে তুলে দিচ্ছি।’ এসব ঘটনার ফলোআপও করা হয় বলে জানান তিনি।

পাসপোর্টে বয়স বাড়িয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সঠিকভাবে দেখভাল করছেন না। আমাদের কাছে বিষয়টি ধরা পড়লে আমরা যেতে দিই না।’

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আবদুস সালাম বলেন, বিদেশ থেকে ফেরত আসা নারীদের নিয়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় অনেক কল্যাণমূলক কাজ করছে।

মন্তব্য