kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

আশঙ্কার চেয়েও কঠিন প্রয়োগ হচ্ছে

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের দাবি সম্পাদক পরিষদের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আশঙ্কার চেয়েও কঠিন প্রয়োগ হচ্ছে

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছে দেশের সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ। সংগঠনটি মনে করে, এই আইন প্রয়োগে সংবাদকর্মী ও মুক্তমত প্রকাশকারী ব্যক্তিরা ক্রমাগতভাবে নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

সম্পাদক পরিষদ আইনটি তৈরির সময় এমন আশঙ্কা প্রকাশ করার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে, ‘এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের আশঙ্কার চেয়েও আরো কঠিনভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। একজন মুক্তমনা লেখক মুশতাক আহমেদকে জীবন দিয়ে তা প্রমাণ করে যেতে হলো।’

গতকাল শনিবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ মন্তব্য করেছে সম্পাদক পরিষদ।

পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘১০ মাস কারাবন্দি থাকার পর কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে জামিন দেওয়ায় আমরা আদালতকে ধন্যবাদ জানাই। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সংবাদকর্মী ও লেখকদের গ্রেপ্তার করে তাঁদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে নির্দয় আচরণ করছে, তা অত্যন্ত অনভিপ্রেত।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি লেখা শেয়ার দেওয়ার কারণে সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে দীর্ঘদিন নিখোঁজ ও কারাগারে থাকতে হয়েছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জামিন পেলেও আর্থিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কাজলকে এখন মামলা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়া কিশোর জামিন পেলেও তাঁর মামলাটি চলমান আছে।

সম্পাদক পরিষদ যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি মিডিয়া ওয়াচডগ বডি আর্টিকল ১৯-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলেছে, ২০২০ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৯৮টি মামলায় ৪৫৭ জনকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ৪৫৭ জনের মধ্যে ৭৫ জন সাংবাদিক। তাঁদের মধ্যে ৩২ জনকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ঘটনাক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আইনটি পর্যালোচনা করা হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হলে তদন্তের আগেই যেন গ্রেপ্তার করা না হয়, এমন ব্যবস্থা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে সম্পাদক পরিষদ স্বাগত জানায়। আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনতিবিলম্বে আইনগতভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানায়। এ জন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশ বা আইনি উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানায় পরিষদ।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া তৈরি, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, সংসদে বিল উত্থাপন ও রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে ও পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সম্পাদক পরিষদ এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থার আপত্তি তোলার বিষয়টি উল্লেখ করেছে সম্পাদক পরিষদ। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির সদস্যরা আমাদের সঙ্গে বৈঠক করে আপত্তিগুলো শুনেছিলেন। শেষে দেখা যায়, আমাদের দাবিগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এমনকি এই আইন প্রণয়নকালে সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর বক্তব্য এবং সংসদীয় কমিটির পেশকৃত প্রতিবেদন সম্পর্কে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আলোচনায় অংশগ্রহণকারী গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মতামতও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।’ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আপত্তিকর ধারাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা সেগুলো সংশোধনের সুপারিশ করেছিলেন জানিয়ে সম্পাদক পরিষদ বলেছে, সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া হলে আজকের এ পরিস্থিতির হয়তো উদ্ভব হতো না।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সম্পাদক পরিষদ কেন উদ্বিগ্ন, তা ২০১৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছিল। ব্যাখ্যায় আইনটির ৯টি ধারা বিশ্লেষণ করে সম্পাদক পরিষদ যেসব মৌলিক ত্রুটি চিহ্নিত করেছিল, সেগুলো তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, এ আইনের অপরাধ ও শাস্তি সংক্রান্ত প্রায় ২০টি ধারার মধ্যে ১৪টি জামিন অযোগ্য, পাঁচটি জামিনযোগ্য এবং একটি সমঝোতাসাপেক্ষ। এর ফলে অনিবার্যভাবে একটা ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অনুশীলন আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করবে তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু কৌশলে তা যেন গণমাধ্যম ও মুক্তমনের লেখকদের ওপর প্রয়োগ করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে অনতিবিলম্বে আইনটির সংশোধন করতে হবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সংবাদকর্মীদের নামে যতগুলো মামলা করা হয়েছে, যতজন সংবাদকর্মী ও মুক্তমনা লেখক গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, তাঁদের সবাইকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। সেই সঙ্গে মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবি জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, ‘আমরা সরকারের সুবিবেচনা প্রত্যাশা করছি।’

মন্তব্য