kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

বিএনপির সমাবেশ মানে ‘অচল ফর্মুলা’

রাজনৈতিক কর্মসূচির গ্যাঁড়াকলে বলির পাঁঠা সাধারণ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও রাজশাহী   

৩ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিএনপির সমাবেশ মানে ‘অচল ফর্মুলা’

রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। দলটি যেখানেই সমাবেশ ডাকে, সেখানেই রহস্যময় কারণে অচল হয়ে যায় চারদিক। কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সমাবেশস্থলের সঙ্গে অন্য জেলা। চলে না গাড়ির চাকা, বাজে না নৌযানের ভেঁপু। একসঙ্গে চার-পাঁচজন হাঁটতেও মানা। পথে পথে চলে পুলিশের তল্লাশি। কোথাও কোথাও ধরপাকড়। এমন সীমিত ফর্মুলায় একের পর এক সমাবেশ পার করে বিএনপি। বিএনপির সমাবেশ ঘিরে এ রকম ‘অচল ফর্মুলা’র আবিষ্কার অনেক আগেই। এখনো চলছে একই কায়দায়। তবে মাঝখানে সাধারণ মানুষ হচ্ছে ‘বলির পাঁঠা’। রাজনীতির ‘র’ এর আশপাশে না থাকলেও হঠাৎ অঘোষিত হরতালের গ্যাঁড়াকলে পড়ে ভোগান্তির অর্থ হাড়ে হাড়ে টের পান আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা।

তবে সড়ক পরিবহন সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, তাঁরা বিএনপির সমাবেশের দিনে পরিবহন ধর্মঘট ডাকেন না। অন্যদিকে বাস মালিকদের বিভাগীয় পর্যায়ের নেতারা বলেন, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও হামলা হতে পারে—এমন শঙ্কায় তাঁরা সমাবেশের দিন বাস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন।

এদিকে বিএনপি নেতারা বলছেন, সমাবেশে যাতে লোকসমাগম কম হয় সে কারণে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা প্রভাব খাটিয়ে পুলিশ দিয়ে বাস বন্ধ করে দেন, যদিও আওয়ামী লীগ নেতারা এ রকম অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যেসব স্থানে বিএনপির সমাবেশের দিন পরিবহন বন্ধ রাখা হয়, ওই সব স্থানে বাস মালিক ও পরিবহন শ্রমিকদের নেতৃত্বে রয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। তাঁদের অনেকে আবার সরাসরি আওয়ামী লীগের মূল দলের সঙ্গেও জড়িত।

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং জিয়াউর রহমানের বীর-উত্তম খেতাব প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ছয় সিটিতে ডাক দেওয়া সমাবেশের মধ্যে বিএনপি এরই মধ্যে বরিশাল, খুলনা ও রাজশাহীতে সমাবেশ করেছে। তবে প্রতিটি সমাবেশেই বিএনপির নেতাকর্মীরা পথে পথে বাধার মুখে পড়েন। বরিশাল ও খুলনার সমাবেশের দিন রহস্যময় পরিবহন ধর্মঘট চলেছে। সে সময় নৌপথেও বাধা এসেছিল। একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয় গতকাল মঙ্গলবার রাজশাহীর সমাবেশেও।

শুধু বিএনপির সমাবেশের দিন টার্গেট করে কেন পরিবহন ধর্মঘট—এই প্রশ্ন করা হলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘ধর্মঘটের সঙ্গে বিএনপির সমাবেশের কোনো সম্পর্ক রয়েছে বলে আমার মনে হয় না। এ ছাড়া পরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করার কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের নেই। এখন রাজশাহী বা খুলনায় স্থানীয়ভাবে তারা কেন ধর্মঘট ডেকেছে, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবে।’

খুলনায় বিএনপির সমাবেশের দিন কী কারণে পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়েছিল সে ব্যাপারে খুলনা জেলা বাস-মিনিবাস ও কোচ মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সোনা মিয়া বলেন, ‘বিএনপির সমাবেশ ঘিরে শহরে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হতে পারে—এমন শঙ্কা থেকে বাস বন্ধ রাখা হয়েছিল।’

এদিকে রাজশাহী বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহাতাব চৌধুরী। তিনি সদ্য ঘোষিত মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিতে ঠাঁই পাননি। তবে পুরনো কমিটিতে ছিলেন শ্রমবিষয়ক সম্পাদক। মাহাতাব চৌধুরী নগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর। সেই হিসেবে ওই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণও অনেকটা তাঁর হাতেই। ফলে রাজশাহীর রাজনীতিতে তিনি বড় ভূমিকা রাখেন। আর সেই ভূমিকা রাখতে গিয়ে তিনি দলীয় প্রয়োজনে বা দলের রাজনীতির ডাকে সাড়া দিতে মাঝেমধ্যেই বাস ধর্মঘট ডেকে বসেন বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে সমাবেশ ঘিরে গতকাল রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশও চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালায়। বাইরের কাউকেই কোনো ধরনের যানবাহনে চড়ে শহরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। শহরের বাইরে থেকে আসা মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস তল্লাশি করে সেগুলো আবার ফেরত পাঠানো হয়। ফলে তেমন কোনো যানবাহন শহরে ঢুকতে পারেনি। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকে।

অন্যদিকে নদীপথে নৌকাযোগে আসা বিএনপির নেতাকর্মীদের ঠেকাতেও পদ্মায় পাহারা বসায় পুলিশ। পদ্মা নদী দিয়ে গতকাল ছোট ছোট শ্যালো মেশিনচালিত নৌকাগুলোকেও শহরের আশপাশে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। ফলে নৌকায় আসা নেতাকর্মীদেরও সমাবেশে আসতে বাধা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন চারঘাটের বিএনপিকর্মী মনিরুল ইসলাম। তিনি জানান, তাঁদের ১৫ জনের একটি দল নৌকাযোগে চারঘাট থেকে রাজশাহী শহরে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেই নৌকা ফিরিয়ে দেয় পুলিশ। এভাবে কয়েক শ নৌকা ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

বাস বন্ধ প্রসঙ্গে রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহাতাব হোসেন চৌধুরী বলেন, বগুড়ায় পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটির একটি প্রতিবাদসভা ছিল গত ১৪ ফেব্রুয়ারি। সেখানে সন্ত্রাসী বাহিনী হামলা চালায়। চারটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়, গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। এর প্রতিবাদে সেদিনই ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু মাঝে পৌর নির্বাচনের জন্য ধর্মঘট শুরু করা হয়নি। নির্বাচন শেষ হওয়া মাত্র ধর্মঘট শুরু হয়েছে। হামলাকারী সন্ত্রাসীরা গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত বাস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

জানতে চাইলে রাজশাহী বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মতিউল হক টিটো বলেন, বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ ঘিরে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও গাড়ি ভাঙচুরের শঙ্কা ছিল। তাই শ্রমিকের জীবন ও যানবাহনের নিরাপত্তার জন্য বাস চলাচল বন্ধ করে দেন।

তবে জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘বিএনপির সমাবেশ ঠেকাতে পুলিশ পাহারা বসায়নি। রাস্তা বা পদ্মা নদী হয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা সমাবেশে আসার নামে যেন কোনো ধরনের নাশকতায় না জড়ায় সে জন্য পুলিশ টহল দিয়েছে। যানবাহন ফিরিয়ে দেওয়া বা হয়রানির বিষয়টিও ঠিক নয়।’

এ ব্যাপারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, লোকসমাগম যাতে কম হয়, সে ব্যবস্থা করতেই বিএনপির সমাবেশ ঘিরে পরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়। তিনি বলেন, এটি পুলিশ ও আওয়ামী লীগের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হয়ে গেছে। তারা প্রমাণ করতে চাইছে বিএনপি এখন আর বড় দল নয়।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপির সমাবেশের দিনে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কোনো হস্তক্ষেপ নেই, এ জন্য বিএনপিই দায়ী। অতীতে বিএনপি আন্দোলনের নামে বারবার বাস ভাঙচুর করেছে, বাসে অগ্নিসংযোগ করেছে। এ জন্য মালিকরা ভয়ে বাস বন্ধ রাখেন।’

 

 

মন্তব্য