kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

বিশেষজ্ঞ মত

সু চির তথাকথিত গণতন্ত্রেই ব্যাপক রোহিঙ্গা নিপীড়ন

মো. তৌহিদ হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সু চির তথাকথিত গণতন্ত্রেই ব্যাপক রোহিঙ্গা নিপীড়ন

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চিন্তা আর আমাদের সমস্যা এক নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে দেবী, গণতন্ত্র মানবাধিকারের প্রতীক বানিয়ে রেখে দিয়েছে। সু চি যখন দেশ চালিয়েছেন, তখনই কিন্তু রোহিঙ্গাদের ওপর চরম নির্যাতন হয়েছে। আর এর বিরুদ্ধে একটি কথাও তিনি উচ্চারণ করেননি। কাজেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সু চি যা-ই হোক না কেন, আমাদের অবস্থানটা কিন্তু তা নয়। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী যে জেনোসাইড, গণহত্যা চালিয়েছে, সু চিকে আমরা তার একজন দোসর হিসেবেই দেখি।

আমার মনে হয়, মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানে আমাদের বাংলাদেশের লাভ বা ক্ষতি হয়নি। তবে তারা কোনদিকে যায়, সেটি বুঝতে কিছুটা সময় লাগবে। এখন আগের অবস্থাটাই বজায় থাকল। তারা বিরাট একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করবে। সংখ্যাটা কত? এক হাজার, দুই হাজার, তিন হাজার, চার হাজার? তাতে কি আমাদের লাভ হতো, না কি মিয়ানমারের? আমার হিসাবে তাতে মিয়ানমারের লাভ হতো। আমাদের কোনো লাভ হতো না। কারণ মিয়ানমার একে একটি প্রপাগান্ডা হিসেবে ব্যবহার করত। তারা বলত, বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা সমস্যার সমাধান করেছি। অথচ এই দেশে আশ্রিত ১১ লাখ রোহিঙ্গা থেকে চার হাজার ফেরত গেলেও কিছু আসে যায় না। খুব অল্প দিনেই শিশু জন্ম নিয়ে সে সংখ্যা আবারও পূরণ হয়ে যায়।

আমাদের দরকার, প্রত্যাবাসনের রোডম্যাপ—এই ১১ লাখ লোককে তারা কিভাবে ফেরত নেবে। সেই রোডম্যাপের দিকে একটুও অগ্রসর হচ্ছিল না মিয়ানমার। দু-চার হাজার লোক নিয়ে আবার তারা গড়িমসি শুরু করত। আমি মনে করি না, মিয়ানমারের সঙ্গে এ ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন হচ্ছে। সু চির সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে যেসব আলোচনা করেছে সেগুলো সামরিক বাহিনীর অনুমোদন বা সমর্থনের ভিত্তিতেই করেছে। সামরিক বাহিনীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে সু চির সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে কিছু করেছে, তা আমি মনে করি না।

আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে), আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) মিয়ানমারের অপরাধের যে জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে তা পুরোপুরি আইনি বিষয়। মিয়ানমারে সরকার পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা তাদের বিবেচনায় আসবে না। মিয়ানমারে জেনোসাইড হয়েছে কি না, সেটিই আদালতের বিবেচ্য একমাত্র ইস্যু। আদালতের বিচারকদের এখানে পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই। সরকার পরিবর্তনের তিন বছর আগে জেনোসাইড হয়েছে, এটি বলে পার পাওয়া যাবে না। সু চির চেহারা দেখানোর কারণে পশ্চিমাদের সহানুভূতি পাওয়ার সুযোগ যদি কিছুটা থাকত তা-ও এখন আর থাকবে না। কারণ এখন সামরিক কর্তৃপক্ষ দেশ চালাবে।

মিয়ানমারে সামরিক বা বেসামরিক যে সরকারই থাকুক না কেন, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খুব পরিবর্তন হবে বলে আমি মনে করি না। এই যে গত কয়েক বছর মিয়ানমারে আধাবেসামরিক সরকার ছিল, তাতে কি আমাদের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে? তা তো হয়নি। বরং সবচেয়ে বড় অবনতি সু চির সময়েই হয়েছে। এর আগেও যখন রোহিঙ্গারা এসেছে, তখন তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ফেরত পাঠানো গেছে। এবার সেটিও পারা যায়নি। সু চির সরকার গণতান্ত্রিক ছিল না। আমি কী করে বলি যে আগের মিয়ানমারের সামরিক সরকারের চেয়ে সু চির তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার আমাদের জন্য ভালো ছিল?

মিয়ানমারের ওপর চীনের যে প্রভাব আছে তা এখন আরো বাড়বে কি না, তা দেখার বিষয়। কেউ কেউ বলেছেন, চীনের সঙ্গে অং সান সু চি খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছিল। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তা পছন্দ করছিল না। আমি এর সঙ্গে একমত নই। আমি মনে করি, চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সম্পর্ক যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ। মিয়ানমারে এই পরিবর্তনের কোনো প্রভাব চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পড়বে না। তা ছাড়া চীন তার নিজের স্বার্থে কাজ করে। কোন দেশে কী ধরনের সরকার থাকল না থাকল, সেটি নিয়ে চীন মাথা ঘামায় কম।

তবে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্কের একটু অবনতি হতে পারে। মিয়ানমারে প্রকৃত গণতন্ত্র ছিল না, রোহিঙ্গা জেনোসাইডের বিরুদ্ধে সু চি একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। প্রথম দিকে তো পশ্চিমারা অং সান সু চির প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। তার পরও তো সু চির সরকারের প্রতি পশ্চিমাদের একধরনের শুভেচ্ছা ছিল। মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনা সু চির একটু পক্ষে যাবে, সামরিক বাহিনীর একটু বিপক্ষে যেতে পারে, কিন্তু তাতে খুব বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। আমাদের দেখতে হবে, পশ্চিমারা মিয়ানমারের ওপর কোনো ধরনের অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কি না। যেমনটি তারা করেছিল অতীতে সু চির গৃহবন্দিত্বের দিনগুলোতে। আর এখন অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই যে সব উল্টে-পাল্টে যাবে, তা তো নয়।

(শ্রুতিলিখন : মেহেদী হাসান)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা