kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

মাদকের ছোবল ছুটির অবসরে

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৬ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাদকের ছোবল ছুটির অবসরে

ছেলেটি গোপনে বাসার জিনিস বিক্রি করে বা বন্ধক রাখে, এর-ওর কাছে নানা অজুহাতে টাকা ধার নেয়, পরিবার টাকা না দিলে কখনো কখনো আত্মহত্যা করবে বলে হুমকি দেয়। নবম শ্রেণিতে পড়া এই কিশোরের টাকার এমন চাহিদার পাশাপাশি দিন দিন আচরণেও অস্বাভাবিকতা বেড়ে যায়। মোবাইল ফোনসেট, বাসনকোসন—হাতের কাছে যা পায় তা-ই ভাঙে। একপর্যায়ে ধারালো কিছু দিয়ে নিজেই নিজের হাতে পোঁচাতে শুরু করে। ছেলের এমন অবস্থার জন্য যে মাদক দায়ী সেটা যখন পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পেরেছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে ছেলেকে নিয়ে মা এসেছেন রাজধানীর তেজগাঁওয়ের জাতীয় মাদক নিরাময় কেন্দ্রে।

সম্প্রতি তেজগাঁও জাতীয় মাদক নিরাময় কেন্দ্রে গিয়ে জানা যায়, এই শিক্ষার্থী এখন সেখানে ভর্তি। কিশোরটি পুরোপুরি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রের এক চিকিৎসক।

বর্তমানে ওই নিরাময় কেন্দ্রে ৫০ জন চিকিৎসাধীন, যাদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী বলে জানিয়েছেন জাতীয় মাদক নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালট্যান্ট সৈয়দ ইমামুল হোসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুতে এত রোগী ছিল না। এখন বাড়ছে।’

দেশে গত ৮ মার্চ করোনা রোগী শনাক্তের খবর দেয় সরকার। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে গত ১৭ মার্চ সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হয়। কয়েক দফায় ছুটি বাড়িয়ে তা আগামী ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

গত ২ নভেম্বর রাতে ছেলেকে বকাঝকা করেছিল পরিবারের লোকজন। এরপর সে রাতেই রাজধানীর মগবাজার গাবতলা এলাকার বাসার একটি কক্ষে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। পুলিশের সহযোগিতায় হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই পরিবারের লোকজন জানায়, ছেলেটি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ভারতশ্বরী হোমসের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিল।

এই কিশোর সম্পর্কে খোঁজ নিতে সম্প্রতি মগবাজার এলাকায় গিয়ে তার পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ওই পরিবারের সদস্যরা জানায়, স্কুল বন্ধ থাকায় বাসায় ছিল সে। এলাকার বখাটে ও মাদকসেবীদের সঙ্গে সম্পর্ক হয় তার। আস্তে আস্তে সে মাদক সেবন শুরু করে। বিষয়টি টের পেয়ে পরিবার তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। এ কারণেই বকাঝকা করা হয়েছিল।

পুলিশ ও র‌্যাবসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, করোনাকালে দেশের প্রতিটি এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানেও এর সত্যতা পাওয়া গেছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অন্তত ৩০ শিক্ষার্থীর ইয়াবা আসক্তির তথ্য পাওয়া গেছে, যারা ছুটিতে বাসাবাড়িতে আছে। তাদের অনেকের বাবা কৃষক, মা গৃহিণী। কয়েকজন অভিভাবক বলছিলেন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছেলেদের সব সময় চোখে চোখে রাখা যায় না। এ সুযোগে তারা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে।

এক অভিভাবক কান্নাকাটি করে বলছিলেন, করোনা সব শেষ করে দিয়েছে তাঁর। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ছেলেকে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। সেই ছেলে এখন ইয়াবায় আসক্ত। এই ছেলে কি আর পরিবারকে কিছু দিতে পারবে?

তাঁর মতোই সন্তানদের নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন কুষ্টিয়ার খোকসা, শিলাইদহ, কুমারখালী এলাকার ২০ জন অভিভাবক। এলাকার অনেক শিক্ষার্থী এখন মাদক সেবন ও কারবারে জড়িত জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ছাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁর ছোট ভাই ঢাকায় একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। করোনাকালে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় সে এখন বাড়িতে। কিন্তু কখন এলাকার মাদক কারবারিদের ফাঁদে পড়ে সে মাদকসেবী হয়ে পড়েছে বুঝতেই পারেননি তাঁরা। এ নিয়ে তাঁদের পুরো পরিবার দুশ্চিন্তায় আছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এক শিক্ষার্থী কালের কণ্ঠকে বলছিলেন, দীর্ঘ ছুটি পেয়ে তিনি ঢাকা থেকে চলে যান ফরিদপুরের গ্রামের বাড়িতে। প্রথমদিকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ফেসবুকে ব্যস্ত থাকলেও পরে আর সময় কাটছিল না। গ্রামের বাজার, নদীর ধারে ঘোরাঘুরি করতেন নিয়মিত। একসময় কয়েকজন মাদক কারবারির সঙ্গে পরিচয় হয়। একদিন দুষ্টুমির ছলে তাদের কাছ থেকে এক বোতল ফেনসিডিল কিনে কয়েক বন্ধু মিলে খেয়েছিলেন। আরেক দিন গাঁজা, কয়েক দিন পর ইয়াবাও সেবন করেন। এভাবেই মাদকের নেশা তাঁকে গ্রাস করে ফেলে।

সংশ্লিষ্ট এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনাকালে মাদক কারবারিরা শিক্ষার্থীদের নিশানা করেছে। সারা দেশে এখন মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলো ভর্তি হওয়াদের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। তাদের বেশির ভাগই ইয়াবায় আসক্ত।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে দেরি হওয়ার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ অন্যদিকে যাওয়ার সমস্যাগুলোও বাড়তে পারে। চিকিৎসকরা বলছেন, মাদকের কারণে সমাজে বাড়তে পারে প্রতিবন্ধী শিশু। বাড়তে পারে আত্মহত্যার প্রবণতাও।

এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার, সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে জানিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম এম এ সালাউদ্দীন কাউসার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ সময়ে শিক্ষার্থীরা যদি মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে তাহলে সেটা আমাদের সবার জন্য অবশ্যই বিপজ্জনক।’

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হতে পারে। ছাপ পড়তে পারে একাকিত্বের। এর সুযোগ নিয়ে মাদক কারবারিরা শিক্ষার্থীদের ইয়াবার মতো মরণ নেশায় আসক্ত করে ফেলতে পারে। তাই ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারে পরিবারকে সতর্ক হতে হবে।’

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, “মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তবায়ন চলছে।”

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশনস) ডিআইজি ড. মাসুম রাব্বানী বলেন, তাঁরা মাদক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা