kalerkantho

শনিবার। ২ মাঘ ১৪২৭। ১৬ জানুয়ারি ২০২১। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতে ১/১১ ঘটনায় জড়াই

মেজর (অব.) হাফিজ, ভাইস চেয়ারম্যান, বিএনপি   

২৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতে ১/১১ ঘটনায় জড়াই

দলের কারণ দর্শাও নোটিশের কারণে সাম্প্রতিককালে আলোচিত হয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ। নোটিশের জবাবে তিনি যা বলেছেন তাতে তাঁর দল সন্তুষ্ট হয়েছে। ফলে আপাতত তাঁর বিরুদ্ধে আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিএনপি। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে এসব বিষয়ের পাশাপাশি সমকালীন রাজনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কালের কণ্ঠ’র উপসম্পাদক এনাম আবেদীন।

 

কালের কণ্ঠ : দেশে তৃতীয় শক্তির গুজব হলেই আপনার নাম আসে কেন?

হাফিজ : বাংলাদেশের লোক গুজব পছন্দ করেন। তা ছাড়া সামরিক বাহিনীর কেউ না থাকলে এই গুজব ঠিক জমে না। তাই আমাকে জড়িয়ে কেউ কেউ মজা পায়। আবার ইউটিউবের বদৌলতে কিছু কিছু ঘটনা বেশ ছড়িয়েছে। কিছু লোক তৃতীয় শক্তির জন্য চেষ্টাও করে থাকতে পারে। শওকত মাহমুদ আছে কি না জানি না। কারণ সেও আমার ফোন ধরে না। তবে বিএনপির অন্য কেউ নেই। গণ-অভ্যুত্থান ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে সরকার পতনে আমি বিশ্বাসী নই। 

 

কালের কণ্ঠ : তাহলে আপনাকে কারণ দর্শানোর কারণ কী?

হাফিজ : আমি সেদিন মুক্তাঙ্গনে ছিলাম না। হয়তো কেউ বড় নেতাদের কান ভারী করেছে। আমি ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানি না। বাসা থেকেই বের হই না বহু দিন। ১০০, ২০০, ৫০০ লোক জড়ো হয়ে কিছু করল, আর ওখানে গিয়ে আমি যোগদান করলাম; আমি তো সে রকম নই। গোপনে নয়, যা কিছু করি প্রকাশ্যে। আমি মনে করি, দুই লাখ লোক নিয়ে বিএনপি মাঠে নামলে গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি হবে। কারণ দুই লাখ নামলে এর সঙ্গে আরো মানুষ আসবে। এ রকম কোনো ঘটনা হলে আমি আছি। কিন্তু ওই দিন তো সে রকম লোকসমাগম হয়নি।

 

কালের কণ্ঠ : ও রকম পরিস্থিতি কি সম্ভব বাংলাদেশে?

হাফিজ : সম্ভব। আর এটা না পারলে বিএনপির এত বড় দল হয়ে লাভ কি! তবে এ ধরনের ঘটনা সংগঠিত করার জন্য বড় ধরনের একজন নেতার দরকার। যাঁর কথায় লোকজন ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামবে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার এই যোগ্যতা রয়েছে। কিন্তু এখন অসুস্থ হওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়েছে।

 

কালের কণ্ঠ : তাহলে বিএনপিতে ওই ধরনের নেতৃত্বের এখন অভাব?

হাফিজ : তার পরও আমি বলব, কোনোক্রমে ঘর থেকে সবাই বের হতে পারলে এটা সম্ভব। তবে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি লাগবে। যাঁরা নামবেন তাঁদের বিশ্বাস থাকতে হবে যে বিজয় অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু যদি মনে করেন যে শুধু পুলিশের গুলি খেয়ে ফিরতে হবে তাহলে কেউ নামবেন না।

 

কালের কণ্ঠ : কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির আন্দোলন তো গত এক যুগে সফলতা পায়নি...

হাফিজ : সরকার প্রচণ্ড অজনপ্রিয়। কিন্তু অনুপ্রাণিত করার অভাবের কারণে মানুষ রাজপথে নামছে না। তা ছাড়া কর্মীরা মনে করেন, বিএনপির কিছু নেতা অনেক টাকা-পয়সা বানিয়ে ফেলেছেন। ছাত্রনেতাদেরও বড় বড় গাড়ি। ফলে আন্দোলনে যাঁর জীবন দেওয়ার কথা তিনি মনে করেন আমার জীবন দিয়ে লাভ কি! তা ছাড়া আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি ভালো কিছু দিতে পারবে বলে সমাজের অনেকে এখনো কনভিন্স নয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের মতো ডেডিকেশন জাগিয়ে তুলতে পারিনি। এই না পারাটা আমিসহ সবার নেতৃত্বের ব্যর্থতা।

 

কালের কণ্ঠ : এক যুগেরও বেশি সময় বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। এই পরিস্থিতির জন্য কারা দায়ী?

হাফিজ : এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া কঠিন। গণতন্ত্র ও নির্বাচনীব্যবস্থা সরকার ধ্বংস করেছে এটাও যেমন ঠিক, পাশাপাশি ক্ষমতায় থাকার সময় আমাদের সরকারেরও কিছু ঘাটতি ও ব্যর্থতা ছিল।

 

কালের কণ্ঠ : দলের ওপরে আপনার ক্ষোভ আছে বলে মনে হয়...

হাফিজ : কিছুটা থাকতেই পারে। ২২ বছর ধরে একই পদে আছি। আমি ভাইস চেয়ারম্যান থাকার সময় মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ অনেকেই যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। এখনকার স্থায়ী কমিটির দুই-একজন তখন দলেই আসেননি। তখনকার ১৫ জন ভাইস চেয়ারম্যানের মধ্যে এম শামসুল ইসলাম, এম কে আনোয়ার, তরিকুল ইসলাম, কামাল ইবনে ইউসুফসহ ১৩ জনই মারা গেছেন। জীবিতদের মধ্যে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা দলের বাইরে আছেন। প্রমোশন ছাড়া একমাত্র আমিসহ দুই-একজন দলে পড়ে আছি।

 

কালের কণ্ঠ : আপনার প্রতি এই অবিচারের কারণ কী?

হাফিজ : কারণ আমি তোষামোদ করতে পারি না। এটা আমার ব্যর্থতা। তা ছাড়া দুই-এক সময় সত্য কথা মুখ থেকে বেরিয়ে যায়।

 

কালের কণ্ঠ : কিন্তু বিএনপি নেতারা মনে করেন, এক-এগারোর সঙ্গে না থাকলে আপনিও স্থায়ী কমিটিতে থাকতেন...

হাফিজ : এটা তারা ঠিক বলেন। তবে স্বীকার করতেই হয়, সেনাবাহিনীর প্রতি আমার একটা দুর্বলতা রয়েছে। কারণ এই সেনাবাহিনী আমরাই তৈরি করেছি। ফলে এক-এগারোর সময় সেনাবাহিনীর অফিসাররা যখন বাসায় এসেছেন সেটাকে এড়িয়ে যেতে পারিনি। তার আগ পর্যন্ত আমি কখনো মান্নান ভূঁইয়ার বাসায়ও যাইনি। সংস্কারের পক্ষে স্বাক্ষর করা ১০৫ জন এমপির মধ্যেও আমি ছিলাম না। তবে সংস্কার প্রস্তাব ঘোষণার সময় আমিসহ দুই-একজন মান্নান ভূঁইয়ার বাসার ওপরে ছিলাম।

জড়িত হওয়ার কাহিনী বলি। মান্নান ভূঁইয়ার সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপনের আগে ব্রিগেডিয়ার বারী, আমিনসহ কয়েক জেনারেল আমার বাসায় এসে বলেন, স্যার আপনারা এই সেনাবাহিনী তৈরির সঙ্গে জড়িত। আমরা একটা ভালো কাজে নেমেছি। দুর্নীতি রোধ করে দেশটাকে ঠিক করতে চাই। আপনি আমাদের সঙ্গে থাকেন। এরপর তাঁরাই ফোন করে মান্নান ভূঁইয়াকে আমার বাসায় নিয়ে আসেন। আমিও এম কে আনোয়ার, কামাল ইবনে ইউসুফ এবং ওসমান ফারুককে ফোন করে ডেকে নিয়ে আসি। সংস্কার প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে চাইলে মান্নান ভূঁইয়া দেখান। আমরা চারজন তখন মতামত দিই যে, ‘একই ব্যক্তি দুই টার্মের পরে চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না’, এই জায়গাটা পরিবর্তন করতে হবে। এখানে বলতে হবে যে দুই টার্মের পরে বিষয়টা কাউন্সিল ঠিক করবে। অর্থাৎ যাতে খালেদা জিয়াকে মাইনাস না করা হয় এবং তিনি নেতৃত্বে থাকতে পারেন এমন ব্যবস্থার প্রতি জোর দিই আমরা।

আমাদের চাপে মান্নান ভূঁইয়া রাজি হলেন। কিন্তু প্রস্তাবের ড্রাফট তো সেনাবাহিনী করে দিয়েছিল। ওসমান ফারুককে ওই ড্রাফট সংশোধন করার দায়িত্ব দেওয়া হলো। কিন্তু ঘুম থেকে দেরি করে ওঠায় তিনি মান্নান ভূঁয়ার বাসায় গেলেন ১টার পর। ততক্ষণে ওই ড্রাফট চূড়ান্ত হয়ে গেছে। মান্নান ভূঁইয়া তখন বললেন, দুই টার্মের ওই জায়গাটা তিনি মুখে বলার সময় সংশোধন করে দেবেন। সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপনের দিন এম কে আনোয়ার আমার বাসায় এসে জানতে চাইলেন প্রস্তাবে দুই টার্মের জায়গাটা সংশোধন হয়েছে কি না। আমি বললাম যে ওসমান ফারুক যেতে দেরি করেছে। তবে মান্নান ভূঁইয়া বলেছেন, প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় তিনি মুখে ওটি ঠিক করে দেবেন। ঝানু রাজনীতিক এম কে আনোয়ার এই ঘটনার পর আর মান্নান ভূঁইয়ার বাসায় গেলেন না। তবে সেনাবাহিনীকে কথা দেওয়ার কারণে আমাকে যেতে হলো।

গুলশানের বাসার নিচে মান্নান ভূঁইয়া সংস্কার প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। আমি সেখানে না গিয়ে বাসার ওপরে ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মান্নান ভূঁইয়া সেটি সংশোধন ছাড়াই উপস্থাপন করলেন। ওই দিনই একটি টক শোতে আমি এর প্রতিবাদ জানিয়ে বললাম, দুই টার্মের বিষয়ের সঙ্গে আমি একমত নই। খালেদা জিয়াকে মাইনাস করার পক্ষে আমি নই। যাই হোক, সেনাবাহিনীর চাপে ওই ঘটনায় জড়াতে হয়েছিল।

 

কালের কণ্ঠ : তাহলে ওই ঘটনায় জড়িত হওয়া রাজনৈতিক ভুল ছিল?

হাফিজ : এটাকে কেউ ভুল মনে করলে ভুল, শুদ্ধ মনে করলে শুদ্ধ। তবে আমি গেছি বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার জন্য। কিন্তু এক-এগারোওয়ালারা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। বিএনপির ১০০ জন এমপির কপাল পুড়েছে এটি সত্যি। 

হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ সাক্ষাৎকারে আরো অনেক কথা বলেছেন। পুরো সাক্ষাৎকারটি পড়ুন কালের কণ্ঠ’র অনলাইন সংস্করণে।

 

মন্তব্য